আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা থামছে না কেন?
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আক্কাস আলী। এটি তার ছদ্মনাম। পেশায় ফল বিক্রেতা মি. আলীর একমাত্র ছেলে বয়স প্রায় চার বছর। তিনি ভেবে রেখেছিলেন যে, বছরখানেক পরেই তাকে স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিবেন।
"যেহেতু একটাই পোলা, সেই কারণে ভাবছিলাম যে, হেরে হাফেজ বানামু," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. আলী।
কিন্তু সম্প্রতি মাদ্রাসাগুলোতে একের পর এক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসার পর আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন বলে জানান এই বাবা।
"প্রতিদিন যা দেখতাছি, আর যা শুনতাছি; তাতে মাদ্রাসায় পড়ানোর ইচ্ছাডাই চলে গেছে। কারণ আমি চাই না, আমার পোলার লগে এসব ঘুটক," বলেন মি. আলী।
বাংলাদেশের কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে এতদিন শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ বেশি সামনে আসতো। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেগুলো ছাপিয়ে নতুন আলোচনায় এখন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে প্রায় দেড় ডজনের মতো যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনায় ভুক্তভোগি হিসেবে সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে ছেলে শিশুদের নাম। এমনকি, গত এক সপ্তাহে গাজীপুর, পাবনা ও লক্ষ্মীপুরে যে তিনটি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে, সেখানেও দু'টি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছেলে শিশু বলে জানিয়েছে পুলিশ।
'মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পরিসংখ্যান বলছে, শুধুমাত্র গত অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ১৩টি ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
"যৌন নির্যাতনের শিকার এসব শিশুদের মধ্যে প্রায় সবাই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়," বলছিলেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনে'র নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান।
সরকারি হিসেবে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখের মতো।
"কিন্তু এসব মাদ্রাসা যে কীভাবে চলছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অধিকার কতটুকু রক্ষিত হচ্ছে, সেটার ওপর সরকারের যথেষ্ট নজরদারি নেই। ফলে যৌন নির্যাতনের মতো সমস্যা রয়ে গেছে," বলেন মি. রহমান।
কিছু ঘটনার পর অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা থামছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া অনেক মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত না করে সরাসরি অস্বীকার করার প্রবণতাও যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধে বন্ধ না হওয়ার পেছনে দায়ী বলে জানাচ্ছেন তারা।
যদিও নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাটা জরুরি বলে মনে করছেন ইসলামি পণ্ডিতদের অনেকে।
"ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত," রোববার ফেসবুকে নিজের ফেরিফায়েড পেইজে লিখেছেন ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি।
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন 'হেফাজতে ইসলাম'ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'নৈতিক স্খলনে'র ঘটনা তদন্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
'আগেও ছিল'
কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে সম্প্রতি একের পর এক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসতে দেখা গেলেও সমস্যাটি বেশ পুরনো বলে জানাচ্ছেন সাবেক শিক্ষার্থীরা।
"এগুলো নতুন কিছু নয়। এই সমস্যা আগেও ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন করে রাখা হত যে, সেটা নিয়ে কথা বলার সুযোগ সেভাবে ছিল না," বলছিলেন কওমি মাদ্রাসার সাবেক একজন শিক্ষার্থী সাজেদুল ইসলাম।
অতীতে যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তেমনই একজন ফিরোজ করিম (ছদ্মনাম)।
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, এখন থেকে প্রায় দুই যুগ আগে পরিবার যখন তাকে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।
"আম্মার একটা মানত ছিলো যে, আমাকে হিফজ করাবে; হাফেজ বানাবে," বলছিলেন মি. করিম।
কিন্তু মাদ্রাসায় ভর্তির কিছুদিন পরেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি।
"ছাদে একটা রুম ছিলো খাদেমদের। সেখানে খাট ছিলো। তিনজন ছাত্র আমার দুই হাত দু'দিকে বেঁধে ফেলে। ওরা তিনজনই আমাকে বেঁধে রেখে তাদের মনোবাসনা পূরণ করে," বলে বলছিলেন মি. করিম।
তিনি আরও জানান, ওই ঘটনার পর এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, পড়াশোনায় মন দিতে পারছিলেন না।
এ অবস্থায় তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য আরেকটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করে পরিবার। সেখানেও যৌন নির্যাতনের শিকার হন মি. করিম। এবার তার ওপর নির্যাতন চালান মাদ্রাসারই এক শিক্ষক।
"উনি (শিক্ষক) আমাকে সেভেনআপের সঙ্গে কিছু একটা মিশিয়ে খাইয়েছিলেন। হুজুরের রুমে এটা খাওয়ার পর আমার আর কিছু মনে নেই। পরবর্তীতে আমি যখন জেগে উঠি, তখন নিজেকে আবিস্কার করি আমার বিছানায়। এবং আমার পেছনে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত," বলেন ফিরোজ করিম।
এই ব্যক্তি পরপর দুটি মাদ্রাসায় এমন দু:সহ নির্যাতনের ট্রমা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। এমনকি তার পরিবারকেও কখনো বলতে পারেননি এসব কথা।
"আমরা মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই জানি যে, স্টুডেন্টদের মধ্যে এগুলো হয়। বড় ছাত্ররা ছোটদের এসব করে এবং শিক্ষকরাও করে। কিন্তু লজ্জা, ভয়, চাপ ইত্যাদির কারণে এগুলো আর বাইরে প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না," বলেন ফিরোজ করিম।
কতটা প্রকট?
লজ্জা বা পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে ভুক্তভোগীদের অনেকেই এতদিন যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খোলেননি বলে জানা যাচ্ছে।
ফলে কওমি মাদ্রাসায় সমস্যাটি ঠিক কতটা প্রকট, সে বিষয়েও খুব একটা ধারণা পাওয়া যায়নি।
কিন্তু সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসায় কিছু শিক্ষার্থীর যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর অন্য ভুক্তভোগীদেরও এ বিষয়ে মুখ খুলতে উৎসাহিত করছেন কওমি মাদ্রাসারই সাবেক দুই শিক্ষার্থী।
তারা সম্প্রতি 'আওয়াজডটবিডি' এমন একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন, যেখানে নাম-পরিচয় গোপন রেখেই যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে সেখানে কমপক্ষে ২২৭ জন ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
সেখানে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত এমন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন প্রায় ৯৩ জন।
এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ ব্যক্তিই কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে ওয়েবসাইটের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
" এগুলো (যৌন নির্যাতন) প্রায় প্রতিটি কওমি মাদ্রাসারই সমস্যা। কারণ মাদ্রাসাগুলোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন তো একই। যেখানেই এই স্ট্রাকচারে এই ধরনের আবাসন ব্যবস্থা থাকবে, এই ধরনের পরিবেশ থাকবে, সেখানে এই প্রবলেম তৈরি হবেই," বিবিসি বাংলাকে বলেন ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর।
তিনি নিজেও এক সময় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলেন।
তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে মি. জাহাঙ্গীর বলছিলেন যে, মাদ্রাসায় বয়সে তুলনামূলক বড় শিক্ষার্থীদের চেয়ে ছোটরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।
"শিশুদের নিপীড়নের বিষয়টা আসলে নিচের ক্লাসগুলোতে বেশি হয়। যেমন ধরেন- হেফজখানা। এর ফলে যেটা হয়, একসময় যারা নিপীড়িত হয়েছে, পরবর্তীকালে তারাই আবার নিপীড়ক হয়ে যায়। এবং এসব নির্যাতন এখন কিছুটা সামনে আসলেও এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো বহু আগে থেকেই ঘটছে," বলেন মি. জাহাঙ্গীর।
সমস্যার যত শিকড়
বছরের পর বছর ধরে কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন চলার যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেটি বন্ধ না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করছেন সাবেক শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকারকর্মীরা।
"এর মধ্যে প্রথম কারণটি হলো- যৌন নির্যাতনের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়া," বলছিলেন মানবাধিকারকর্মী সাইদুর রহমান।
আর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় একটি কারণ, ঘটনাগুলো সামনে না আসা। সাবেক শিক্ষার্থীরা বলছেন, 'প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে এবং অনুদান বন্ধ হবে'- এমন অজুহাতে বেশিরভাগ সময় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
"হয় ধামাচাপা দেওয়া হয়, নয়তো নামমাত্র শাস্তি দিয়ে ঐ শিক্ষক বা ছাত্রকে বের করে দেওয়া হয়। এটা তো বড় শাস্তি হলো না। যদি পুলিশে দেওয়ার প্রচলন থাকতো, তাহলে হয়তো এটা কমে আসতো," বলেন কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী সালাউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেও মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
"দেখা যায়, কওমি মাদ্রাসায় যারা বাচ্চাকে পাঠাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই গরিব মানুষ। তাদের সেভাবে শিক্ষা-দীক্ষা নেই। ফলে তারা এগুলো নিয়ে সেভাবে সচেতন না। অভিভাবকদের মধ্যে যারা কিছুটা সচেতন ও সাহসী- তারাই মূলত ইস্যুটা নিয়ে কথা বলছেন," বলেন মানবাধিকারকর্মী মি. রহমান।
নজরদারির ঘাটতি
উল্লেখিত কারণগুলোর গোড়া খুঁজতে গেলে যে বিষয়টি বড় আকারে সামনে চলে আসছে, সেটি হলো- সরকারের নজরদারির অভাব।
মূলত দেখা যাচ্ছে, অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই কম।
মাদ্রাসাগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে এবং যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে- এসব বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা তৈরি করে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
যদিও মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন ইসলামি পণ্ডিতরা।
"সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ বাস্তবতায় প্রভাবশালী আলিম, দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং মাদ্রাসা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা করা," ফেসবুকে লিখেছেন ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি।
"বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন," যোগ করেন মি. আজহারি।
কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক পদস্খলনের দায়ে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত- উভয় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
গত শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটির আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান এবং যারা কওমি মাদ্রাসাগুলোরও শীর্ষ নেতা, তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক পদস্খলনের ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা বা আপস করা চলবে না।
সারা দেশ সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাকে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
কওমি মাদ্রাসার সবেচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) অবশ্য দাবি করছে যে, তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
"আমাদের অধীনে যেসব মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো অভিযোগ পাওয়া গেছে আমরা সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। সেইসঙ্গে, শিশুদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন বন্ধে মাদ্রাসাগুলোয় ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠনেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর জন্য একক কোনো বোর্ড নেই। সেগুলো অন্তত ছয়টি বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখানে কারো একক কর্তৃত্ব নেই।
এছাড়া বোর্ডগুলো মূলত শিক্ষা কার্যক্রম, সিলেবাস, পরীক্ষা দেখভাল করে। এর বাইরে, অনিয়ম বা যৌন নির্যাতনের বিষয়গুলো সেভাবে নজরদারি করা হয় না। বোর্ডগুলোর সেরকম লোকবলও নেই।
ছয়টি মাদ্রাসা বোর্ডের মধ্যে কারো একক কর্তত্ব না থাকায় তাদের কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনের জন্য সরকার একটি কর্তৃপক্ষ তৈরি করে দিয়েছে, যার নাম 'আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ'।
এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে মূলত সারা দেশের কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলোর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদান করা হয়ে থাকে।
মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হওয়ার পর সম্প্রতি তারা শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছে।
সেইসঙ্গে, শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় একটি সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সেটিকে সক্রিয় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।
তবে এসব নির্দেশনা মানার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং যদি কোনো মাদ্রাসা না মানে, সেক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
নির্দেশনায় কেবল উল্লেখ করা হয়েছে যে, সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা শরীয়ত ও বিধি উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত থাকবেন।
সরকার কী বলছে?
কওমি মাদ্রাসাগুলো তৈরি ও পরিচালনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় সারা দেশে যত্রতত্র সেগুলো 'ব্যাঙের ছাতার মতো' গড়ে উঠছে।
"তাদের অনেকেই আবার বোর্ডের আওতায় নেই। মূলত সেগুলোতেই নানান অন্যায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে," বলছিলেন মাদরাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়া ঢাকার অধ্যক্ষ আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ওইসব মাদ্রাসাগুলোর বিষয়ে কথা বলার জন্য গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।
"সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সারা দেশে আল-হাইআতুলের যেসব কমিটি রয়েছে, তারা বোর্ডের বাইরে থাকা মাদ্রাসাগুলোর বিষয়ে খোঁজ-খবর নিবে এবং যেগুলো সদস্য হওয়ার যোগ্য, তাদেরকে সদস্য করা হবে। এটা করতে পারলে সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে," বলেন মি. ইসলামাবাদী।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা দেশে নজরদারি চালানোর মতো সক্ষমতা ও লোকবল আল-হাইআতুল উলয়ার নেই। এক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে 'অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাকর' বলে মন্তব্য করেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
"এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাকর এবং ভবিষ্যতে এ জিনিসটা ঘটবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সে ব্যাপারে যা করা প্রয়োজন, তাই করবো," গত শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন মি. কায়কোবাদ।