অরুণাচলে চীনের বাঁধের পাল্টা ভারতীয় প্রকল্পের বিরুদ্ধে মানুষ কেন রাস্তায় নেমেছে?

    • Author, দিলীপ কুমার শর্মা
    • Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"সিয়াং নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করা হলে আমরা সবকিছু হারাবো। সরকারের উচিত আমাদের আবেদনটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা", সিয়াং উপত্যকায় বসবাসকারী আদি উপজাতির ২৯ বছর বয়সী সদস্য গুপু (ছদ্মনাম) এ কথা বলেন।

শুক্রবার সিয়াং নদীর উপর একটি প্রস্তাবিত বাঁধের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের পর অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব সিয়াং, সিয়াং এবং উচ্চ সিয়াং জেলার মানুষ পুলিশি পদক্ষেপে ভীত হয়ে রয়েছেন।

স্থানীয় উপজাতিরা বেশ কয়েকদিন ধরে সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াটের "সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট"-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। তাদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের জলাধার তাদের গ্রামগুলিকে ডুবিয়ে দিতে পারে এবং নদীর সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে।

সহিংসতা এবং ভাঙচুর

প্রস্তাবিত বাঁধের বিরোধিতায় বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভে শুক্রবারের ১২ ঘণ্টার হরতাল চলাকালীন তাদের আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়।

হরতালের ডাক দিয়েছিল সিয়াং ড্যাম অ্যাফেক্টেড এরিয়া ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরামের যুব শাখা, আদি গালো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি এবং 'জেন-জি' নামক যুব গোষ্ঠী।

পুলিশের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি পাওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন করে।

তারা আরও অভিযোগ করেছে যে, বিক্ষোভকারীরা পাসিঘাটে ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (এনএইচপিসি)-এর একটি অফিসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এমনকি পাসিঘাট থানায় রাখা পুলিশের গাড়িগুলোও পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ভিড়ের মধ্যে থাকা কিছু বিক্ষোভকারী অরুণাচল প্রদেশ বিজেপি সভাপতি কালিং ময়ং, পাসিঘাট পশ্চিমের বিধায়ক নিনং এরিং এবং মারিয়াং-গেকুর বিধায়ক ওনি পানিয়াং-এর বাড়িতেও ভাঙচুর চালিয়েছে।

বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিরাপত্তাকর্মীসহ বহু লোক আহত হন।

বিক্ষোভকারীরা কী বলছেন?

কিন্তু সিয়াং নদীর ওপর বাঁধ বিরোধী সংগঠনগুলো বাঁধ-বিরোধী কর্মীদের মুক্তি এবং সিয়াং উপত্যকায় মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

আপার সিয়াং জেলার গেকু গ্রামের বাসিন্দা মিংকাং বলেন, "আমরা কৃষক। আমরা চাষাবাদ করি এবং বাগান করি। এই বাঁধ তৈরি হলে আমাদের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিশাল ক্ষতি হবে। আমাদের জমি ডুবে যাবে। আমরা কোথায় থাকব?"

প্রকল্পটির বিরোধিতায় আদি বানে কেবাং-ইউনাইটেড-এর একজন কর্মী বলেছেন যে, জলাধারটি নির্মাণের ফলে নদীর তীরবর্তী গ্রাম এবং উর্বর ধানক্ষেত ডুবে যেতে পারে।

এটি স্থানীয় উপজাতিদের জীবিকা এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, "নদীর বাঁধের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে ৩৫টি গ্রাম ডুবে যেতে পারে এবং দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।"

এ ছাড়াও, এত বড় একটি বাঁধ নির্মাণ নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, কারণ এই পুরো এলাকাটি পরিবেশগত ও ভূমিকম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে বিবেচিত হয়।

পুলিশ কী বলেছিল?

রবিবার পাসিঘাটে সহিংসতার বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (সেন্ট্রাল জোন) হিবু তামাং বলেন, "যারা সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অন্তত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা রয়েছে।"

আইজির মতে, "সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপর কথিত হামলার অভিযোগে পুলিশ ছয়টি মামলা দায়ের করেছে।"

তরুণ বিক্ষোভকারীদের উসকানি দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে এবং সহিংসতায় তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে একটি বিস্তারিত তদন্ত চলছে। যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে," বলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

সিয়াং জেলার জনসংযোগ কর্মকর্তা মিডিং মোড বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, "কিছু স্থানীয় লোক প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে অনুমতি চেয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রতিবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থেকে জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করে। মহাসড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হলে ম্যাজিস্ট্রেট ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেন।"

পাসিঘাটে কর্মরত আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কিছু অতিরিক্ত সেনাকেও তলব করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু কী বলেছেন?

শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুসিয়াং প্রকল্পটি এবং স্থানীয়দের বিক্ষোভ চলাকালে সৃষ্ট সহিংসতা নিয়ে কথা বলেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী খান্ডু বলেন, "শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। তবে, উচ্ছৃঙ্খল জনতা ব্যাপক সম্পত্তির ক্ষতি করেছে। থানা ও এনএইচপিসি কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বাড়িতেও ভাঙচুর করা হয়েছে।"

খান্ডু বলেন, "সহিংসতার আশ্রয় না নিয়ে, আমাদের প্রশ্ন করুন এবং আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসুন।"

প্রকৃতপক্ষে, চীন তিব্বতের এই নদীর উপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন একটি বিশাল ৬০,০০০ মেগাওয়াট বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

অরুণাচল প্রদেশ সরকার বলছে যে 'সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প' বন্যা নিয়ন্ত্রণে এবং চীনা বাঁধের প্রভাবকে 'প্রতিরোধ' করতে সাহায্য করবে।

মুখ্যমন্ত্রী খান্ডু বলেন যে, আগে থেকে একটি রিপোর্ট রয়েছে, যা একটি বাঁধ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক এবং সম্ভাব্য প্রভাবগুলির একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন। এটি নির্মাণকাজ শুরু করার অনুমতি নয়।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্ভব বলে প্রমাণিত হলে, একটি 'সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন' এবং একটি 'বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন' প্রস্তুত করে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হবে।

খান্ডু এর আগেও চীনের মেগা বাঁধ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খান্ডু জানান যে, সিয়াং প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। এর মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং চীন হঠাৎ জল ছাড়ার ক্ষেত্রে বন্যার ঝুঁকি কমানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

অনেক বিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ১১৪ জন বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ ২০২৫ সালে সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প সম্পর্কিত নির্মাণ, জরিপ এবং অনুমোদন কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন যে, অঞ্চলটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন হিমবাহ হ্রদের উপচে পড়া, মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং ভূমিধসের মতো ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এছাড়াও, ২০২৫ সালের নভেম্বরে, মণিপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং এমপি-আইডিএসএ স্রোতস্বিনী হাজারিকার একটি বিশ্লেষণে সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য পরিবেশগত ও জলবায়ুগত ঝুঁকির দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, সিয়াং অঞ্চলটি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের পেছনের দিকে সরে যাওয়া এবং হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এতে আরও বলা হয়েছে যে, হিমালয়ের আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য ঘটনার ফলে জলপ্রবাহ ও পলি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা এই বিশাল জলাধারটির জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

চীনের মেগা বাঁধ উদ্বেগ ভারত-বাংলাদেশে

২০২৫ সালের জুলাই মাসে চীন একটি বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করেছে, যা ভারত ও বাংলাদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

চীনের কর্মকর্তারা তিব্বত অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর এই প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

নদীটি তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। এই প্রকল্পটি সমালোচিত হয়েছে কারণ এটি ভারত ও বাংলাদেশের ভাটির দিকের লক্ষ লক্ষ মানুষ, স্থানীয় তিব্বতি জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, চীন দাবি করে যে এই প্রকল্পটি পরিবেশগত ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দেয় এবং স্থানীয় সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে।

অনেক বিশেষজ্ঞ ও ভারতীয় কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, নতুন এই বাঁধটি চীনকে ইয়ারলুং সাংপোর মতো আন্তর্জাতিক নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বা তার গতিপথ পরিবর্তন করার ক্ষমতা দিতে পারে। এই নদীটি তিব্বতে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং যমুনা নামে বাংলাদেশে মিলিত হয়। ভারতে এটি সিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত।

অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ২০২০ সালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, "তিব্বত মালভূমিতে প্রবাহিত এই নদীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ চীনকে ভারতের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়।"

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান যে, ভারত মেগা বাঁধের প্রভাব নিয়ে চীনের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনকে "নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর ক্ষতি না করে এই ধরনের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও আলোচনা নিশ্চিত করার" জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে, চীনের বাঁধ থেকে হঠাৎ জল ছাড়ার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং বন্যার ঝুঁকি কমাতে ভারতও সিয়াং নদীর উপর একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে।