স্বাভাবিক প্রসবের জন্য যেসব প্রস্তুতি সহায়ক হতে পারে

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

প্রথম সন্তান গর্ভে থাকার সময় সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ডেলিভারির একমাসের বেশি সময় আগে আল্ট্রাসনো রিপোর্ট দেখে গাজীপুরের বাসিন্দা ও গৃহিনী জান্নাতুল মাওয়াকে সিজার বা অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দেন চিকিৎসক।

মিজ মাওয়া ২০১৯ সালে তার প্রথম সন্তান জন্মদানের সময়ের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন।

ঢাকার মিরপুরের একটি ম্যাটারনিটি হাসপাতালে সেসময় ডাক্তার দেখিয়েছিলেন তিনি।

আল্ট্রাসনো প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর ১৪ই জুন মিজ মাওয়ার সন্তান জন্মদানের এক্সপেক্টেড বা প্রত্যাশিত তারিখ ছিল।

"রেগুলার চেকআপ করাতে পাঁচই মে ডাক্তারের কাছে যাই। আল্ট্রা করতে বললে করি, রিপোর্টটা দেখে বলেন তোমার পানি কমে গেছে, সিজার করিয়ে ফেল। ১৮ মে সিজারের ডেট দেন ডাক্তার," বিবিসি বাংলাকে বলেন মিজ মাওয়া।

পানি অনেক কম বললেও তাৎক্ষণিকভাবে সিজারের সময় না দিয়ে চিকিৎসক ১৪ দিন পরে ডেট দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পরিবারের খটকা লাগে বলে জানান মিজ মাওয়া।

"সমস্যা হলে তো দুইসপ্তাহ পরে সিজারের ডেট দেবে না। পরে আম্মা আমাকে চাঁদপুরে বাবার বাড়ি নিয়ে যান" বলেন মিজ মাওয়া।

এই জেলা শহরটির মা ও শিশু কল্যান কেন্দ্র নামে একটি সরকারি হাসপাতালে তিনি ডাক্তার দেখান।

এখানকার চিকিৎসকরা আগের আল্ট্রাসনো রিপোর্ট দেখে মিজ মাওয়াকে জানান, সব ঠিক আছে, পানি যতটুকু কম আছে তাতে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

"আমি ভাবলাম ওই রিপোর্ট কী ডাক্তার খেয়াল করে নাই। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আমার কী পানি কম আছে? ওনি আমাকে বলে, একটু কম এটা সমস্যা না, নরমাল হওয়ার জন্য এই পানি পর্যাপ্ত। যখন ব্যথা উঠবে তখন সাথে সাথে হাসপাতালে চলে আসবেন," বলেন মিজ মাওয়া।

পরে ২০১৯ সালের ২৫শে মে ভোরে ব্যথা উঠলে বেলা বারোটায় হাসপাতালে যান তিনি।

প্রত্যাশিত সময়ের ১৯ দিন আগে ওইদিন বিকাল সাড়ে পাঁচটায় স্বাভাবিকভাবেই সন্তান প্রসব করেন মিজ মাওয়া।

বাংলাদেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার বাড়লেও মিজ মাওয়ার মতো অনেকেই স্বাভাবিকভাবে (নরমাল ডেলিভারি) জন্ম দিতে ইচ্ছুক।

চিকিৎসকরা বলছেন, একজন গর্ভবতী নারী কিভাবে সন্তান প্রসব করবেন সেটি নির্ভর করে রোগীর বয়স, পূর্ব মেডিকেল রেকর্ড, গর্ভপাত কিংবা অন্যান্য জটিল রোগ আছে কি না, বাচ্চা ও গর্ভফুলের অবস্থান এমন নানা বিষয়ের ওপর।

যোনিপথে স্বাভাবিক প্রসব সন্তান জন্ম দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় বলে জানান গাইনি চিকিৎসকরা।

তবে প্রসুতি মায়ের স্বাস্থ্য এবং ঝুঁকির স্তরের উপর ভিত্তি করে কোন পদ্ধতিতে প্রসব হবে সেটি সিদ্ধান্ত নেবেন একজন গাইনি চিকিৎসক।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসুতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "রোগীর স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেওয়ার মানসিকতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।"

আর যোনিপথে (নরমাল ডেলিভারি) সন্তান প্রসবের জন্য গর্ভবতী নারীকে নানা ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়।

নরমাল ডেলিভারির জন্য কিভাবে একজন গর্ভবতী মাকে প্রস্তুতি নিতে হবে?

এই লেখার শুরুতেই মিজ মাওয়ার কথা উল্লেখ করেছি যিনি নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করেছেন।

তার তিন মেয়েকেই স্বাভাবিকভাবে জন্ম দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

মিজ মাওয়া বলছিলেন, গাইনি চিকিৎসকরা তাকে বরাবরই স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্মদানের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। এজন্য তাকে বেশ কিছু প্রস্তুতি নিতেও পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক।

এর মধ্যে স্বাভাবিক উপায়ে সন্তান জন্মদানে তিনি আগ্রহী কি না সে বিষয়ে মানসিকভাবে স্থির হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।

স্বাভাবিকভাবে প্রসবের ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা, সুষম পুষ্টি এবং প্রসব পরিকল্পনা খুব জরুরি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

মানসিক প্রস্তুতি

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসুতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক মি. রেজাউল করিম কাজল বলছিলেন, "মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে স্বাভাবিক প্রসব জিনিসটা কী? নরমাল ডেলিভারির রিস্ক নিতে সে সক্ষম কি না সে বিষয়ে ভাবতে হবে।"

তবে, যে কোনো ধরনের পরিস্থিতির জন্য রোগী ও রোগীর পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে উল্লেখ করেন তিনি।

এই চিকিৎসক জানান, "কোনো বিপদ হলে জরুরি সিজার করতে হবে, সেই বিষয়ে রোগীর পরিবারকে রাজি থাকতে হবে যেন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন চিকিৎসক।"

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের (এনএইচকে) ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ সময় নেতিবাচক চিন্তা পরিহার করে শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, মানসিকভাবে উৎফুল্ল থাকতে গান শোনা প্রসুতির জন্য বেশ আরামদায়ক হবে।

সর্বোপরি একটি ইতিবাচক পরিবেশে থাকার চেষ্টা করতে হবে যেটি স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্মদানের সহায়ক।

সুষম পুষ্টি

অতিরিক্ত ওজন অথবা খুবই কম ওজন, দুইটিই গর্ভকালীন জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই হবু মায়ের ওজন বেশি হলে কমাতে হবে, কম থাকলে উচ্চতা অনুযায়ী বাড়াতে হবে বলে জানান চিকিৎসকরা।

গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এর মধ্যে প্রচুর তাজা ফল, শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন, আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান মি. কাজল।

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলছিলেন, "গর্ভবতী মায়ের ওজন যাতে অতিরিক্ত বেড়ে না যায় সেভাবে খাদ্যের তালিকা করে দেওয়া হয়।"

শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম

স্বাভাবিকভাবে তিন সন্তান জন্ম দেওয়া জান্নাতুল মাওয়া জানান, নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রচুর পানি পান এবং চিকিৎসকরা তাকে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের তেসরা জানুয়ারি তৃতীয় সন্তান জন্ম দেন তিনি।

প্রত্যাশিত সময়ের তিন দিন পরে প্রসব বেদনা ওঠে মিজ মাওয়ার।

"তখনও নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। এই বাচ্চাই শুধু ডেইটের তিনদিন পরে হইছে। বাকি দুইজনের সময় ডেইটের আগে ব্যথা উঠেছিল, চাঁদপুরের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা নরমাল ডেলিভারিই করেছিল" জানান তিনি।

তবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসকরা "প্রচুর হাঁটতে বলতো, ১৫ মিনিট হেঁটে পানি খেয়ে কিছুটা রেস্ট নিয়ে আবার ১৫ মিনিট হাঁটতে বলতো" বলেন মিজ মাওয়া।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক রেজাউল করিম কাজল বলছিলেন, স্বাভাবিক প্রসব ত্বরান্বিত করার জন্য বেশ কিছু শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এর মধ্যে স্কোয়াটিং, পেরিনিয়াল ম্যাসাজ, কেজেল এক্সারসাইজ, হিপ ওপেনিং ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পেরিনিয়াল ম্যাসেজ

চিকিৎসকরা বলছেন, পেরিনিয়াল ম্যাসেজ হল একটি সাধারণ প্রসবের টিপস যেটি জরায়ুকে দ্রুত প্রসারিত করতে সাহায্য করে।

স্বাভাবিক প্রসবের জন্য গর্ভবতী মায়ের শরীরকে খুব শান্ত এবং শিথিল রাখতে হবে।

আর এই পেরিনিয়াল ম্যাসেজ চাপমুক্ত শ্রমের জন্য পেশী এবং শরীরকে শিথিল করতে সহায়তা করে।

গাইনি চিকিৎসক অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলেন, কিছু ব্যায়াম আছে যেগুলো তলপেটের মাসলের ব্যায়াম সেগুলোকে আমরা পেলভিক মাসল বলি।

"তলপেটের যে হাড়গুলো আছে, হাড়ের জয়েন্টগুলো আছে সেগুলো যেন রিল্যাক্স (প্রসারিত) হয়, কারণ প্রসবপথে একটা আড়াই কেজি থেকে তিন কেজি বাচ্চা বের হওয়ার জন্য তার জয়েন্ট এবং মাসলগুলো লুজ হওয়া (প্রসারিত হওয়া) লাগবে" বলেন মি. কাজল।

এমন ধরনের ব্যায়াম করলে গর্ভবতী মায়ের স্বাভাবিক প্রসবে সুবিধা হবে বলে জানান এই চিকিৎসক।

মি. কাজল বলেন, "কাজেই তলপেটের মাংসপেশী, হাড় এবং হাড়ের জয়েন্টগুলো রিলাক্সেশনের জন্য আমরা কিছু ব্যায়াম লিখে দেই।"

প্রসব পরিকল্পনা

প্রসবকালীন সময়ে গর্ভবতী নারী ও তার পরিবারের প্রসব পরিকল্পনা রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ।

দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রসবকালীন সময়ের শেষ মুহূর্তের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলছিলেন, প্রসব চলাকালীন সময়ে যে কোন বিপদের কারণে সিজার করা লাগতে পারে এ বিষয়ে রোগী এবং তার পরিবারকে আগেই অবহিত করতে হবে।

একইসঙ্গে নবজাতক ও মায়ের সবধরনের চিকিৎসা সহায়তা এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসক পাওয়া যায় এমন হাসপাতাল বাছাই করা বেশ জরুরি।

"কখন ব্যথা উঠতে পারে, কতদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? স্বাভাবিক প্রসবে এক থেকে বারো ঘণ্টা সময় লাগে তাই এই বাচ্চা ও মাকে সুস্থতা পর্যবক্ষণ করা যাবে এমন হাসপাতালে ডেলিভারি করাতে হবে," বলেন মি. কাজল।

শুধু তাই নয় পরিবারের সদস্যদেরও প্রস্তুতি থাকতে হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, যোনিপথে স্বাভাবিকভাবে প্রসবের ক্ষেত্রে প্রসব পরিকল্পনা খুব জরুরি।

"পরিবারের অন্য সদস্যদের জানতে হবে এই ব্যথা ওঠার লক্ষণ কী, ব্যথা উঠলে কিভাবে হাসপাতালে যাবে, কোন হাসপাতালে কোন চিকিৎসকের কাছে যাবে? প্রয়োজন হলে রক্ত কে দিবে? টাকা-পয়সার যোগান কেমন লাগবে?" এসব বিষয় আগেই ঠিক করে রাখতে হবে বলে জানান তিনি।

এ কারণে গর্ভবতী নারীকে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকার প্রতি জোর দেন গাইনি চিকিৎসক মি. কাজল।