ভারতে চিনির দাম বৃদ্ধিতে পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে মিষ্টির দাম, ইথানল উৎপাদনই কি দায়ী?

    • Author, প্রত্যুষ রায়
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
    • Reporting from, দিল্লি
    • Author, গোপাল কাটেশিয়া
    • Role, বিবিসি সংবাদদাতা
    • Reporting from, আহমেদাবাদ
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

"গ্যাসের দাম বাড়ার জন্য এই কয়েকদিন আগেই দাম বাড়াতে বাধ্য হলাম। আবার চিনির দাম বেড়েছে, ফলে মিষ্টিপ্রতি পাঁচ শতাংশ লাভ কম করতে হচ্ছে। বছরে কতবার দাম বাড়াব?"

হতাশ হয়ে রাখিবন্ধন উৎসবের পরেই দাম বাড়ানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গের 'জলভরা সন্দেশ'-এর আবিষ্কারক বলে পরিচিত 'সূর্য কুমার মোদক' মিষ্টির দোকানের বর্তমান কর্ণধার শৈবাল মোদক।

অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ইতোমধ্যেই দাম বাড়িয়েছেন বর্ধমানের শক্তিগড়ের 'ল্যাংচা' বিক্রেতারা। প্রতি কেজি 'নিখুঁতি' মিষ্টিতে প্রায় ৫০ টাকা দাম বাড়িয়েছেন শান্তিপুরের মিষ্টি বিক্রেতারাও।

সেপ্টেম্বর মাস থেকেই শুরু পুজোর মৌসুম। জন্মাষ্টমী, বিশ্বকর্মা পূজা ও গণেশ চতুর্থী দিয়ে শুরু করে অক্টোবর মাসেই দুর্গাপূজা। এই অবস্থায় মিষ্টির চাহিদা বাড়বে হু হু করে। পশ্চিমবঙ্গের বহু মিষ্টির দোকানির মূল আয় এই উৎসবের মৌসুমেই।

কিন্তু ভারতে চিনির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তার মুখে পড়েছেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে ভারতে বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তখন বহু মিষ্টি ব্যবসায়ীই দাম বাড়িয়েছিলেন।

কয়েক মাসের মধ্যেই ফের দাম বাড়াতে হলে মিষ্টি ব্যবসা মার খাবে বলেই মনে করছেন শৈবাল মোদক।

ভারতে চিনির দামে হঠাৎ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ইথানলকে দায়ী করেছেন। আখ থেকেই তৈরি হয় ইথানল, যা বর্তমানে ভারতে জ্বালানির সঙ্গে মেশানো হচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমে দাবি, ইথানলের জন্য ভারতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চিনির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন। কিন্তু এই দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত?

'পেট্রোলের দাম তো কমল না, চিনির দামও বেড়ে গেল'

ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে চিনির দাম নিয়ে বেশ ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বরের বাসিন্দা ৩০ কিলোমিটার নিজের গাড়ি চালিয়ে কলকাতার সল্ট লেকে তার অফিসে যান।

তার ক্ষোভ, গাড়ির জ্বালানিতে ব্যবহৃত পেট্রোলে ইথানল মেশানো শুরু হলেও তেলের পাইকারি দাম কমেনি, কিন্তু গাড়ির মাইলেজ কমে গিয়েছে। অন্যদিকে চিনির দামও বেড়েছে।

এক্ষেত্রে সরকারের নীতিতে সাধারণ মানুষ কি আদৌ লাভবান হচ্ছেন? এই প্রশ্ন তুলছেন তিনি।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু অগাস্ট মাসেই ভারতে চিনির দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

২৭শে অগাস্টের বাজারদর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে যে জেলাগুলোয় চিনির দাম ৭০ টাকা প্রতি কেজিতে পৌঁছে গিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কলকাতা, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান। এই জেলাগুলো মিষ্টি উৎপাদনের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ।

গত ২৪শে অগাস্ট চিনির দামে লাগাম টানার জন্য রাজ্যের সচিবালয় নবান্ন ভবনে সাংবাদিক সম্মেলন থেকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে তার তিন দিন পরেও বাজারদরে খুব একটা ফারাক আসেনি।

ভারত সরকারের ভোক্তা বিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০শে অগাস্ট খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ভারতীয় মুদ্রায় ৫৫ টাকা ৭০ পয়সা।

এক মাস আগে একই সময়ে চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা প্রতি কেজি। আর ২০শে অগাস্ট ২০২৫-এ প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৬.৩০ টাকা।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আগে কখনও চিনির দাম এতটা বাড়েনি।

তাদের বক্তব্য, এল নিনোর প্রভাবে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাত চিনির উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব ফেলেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দামের ঊর্ধ্বগতিতে।

তবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আখের চাষের পরিমাণ গত বছরে প্রায় একই রয়েছে। বরং গত পাঁচ বছরের গড় এলাকার তুলনায় এ বছর আখের চাষ হয়েছে প্রায় চার লক্ষ হেক্টর বেশি জমিতে।

চিনির লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় সরকার ইতোমধ্যেই চিনি রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি, পাইকারি ব্যবসায়ীরা কত পরিমাণ চিনি মজুত রাখতে পারবেন, তারও একটি সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের আশা, এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির উপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আনা যাবে।

ইথানল উৎপাদনের প্রভাব কি চিনির দামে পড়েছে?

বিশ্বে অপরিশোধিত তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরেই ভারতের স্থান। তবে দেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

এই আমদানি নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং দূষণ কমানোর লক্ষ্যেই কেন্দ্র সরকার ২০১৮ সালে পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের হার ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এই লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণের কথা থাকলেও সরকার ২০২৫ সালের জুলাই মাসেই তা অর্জন করে।

চিনি কলগুলোর বেশিরভাগ বেসরকারি ও সমবায়ের মালিকানাধীন হলেও দাম নিয়ন্ত্রণ করে সরকার।

কৃষকদের কাছ থেকে কেনা আখের জন্য চিনি কলগুলোকে কত ফেয়ার অ্যান্ড রিমিউনারেটিভ প্রাইস (এফআরপি) দিতে হবে, তা কেন্দ্র সরকারই নির্ধারণ করে।

একই সঙ্গে কোন চিনি কল প্রতি মাসে কত পরিমাণ চিনি বিক্রি করতে পারবে এবং চিনি রফতানির অনুমতি থাকবে কি না, তাও সরকার ঠিক করে দেয়।

দেশে ইথানলের বৃহত্তম ক্রেতাও সরকার। ফলে ইথানলের দামও পরোক্ষভাবে সরকারি নীতির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ চিনি বর্ষে প্রায় ৩০ লাখ টন আখ ইথানল উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে। এটি দেশের মোট চিনি উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

আখের রস ছাড়াও চিনি উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে তৈরি হওয়া সিরাপ, এ-হেভি মোলাসিস, বি-হেভি মোলাসিস এবং সি-হেভি মোলাসিস থেকেও ইথানল তৈরি করা যায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে উৎপাদিত মোট ইথানলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আখ-ভিত্তিক কাঁচামাল থেকে তৈরি হয়েছে।

একটি বড় চিনি কলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বিবিসি গুজরাতিকে বলেন, "ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে চিনি কলগুলোর হাতে নগদের জোগান বাড়ে। তবে সরকার সব সময়ই স্পষ্ট করেছে যে, চিনি উৎপাদনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।"

তিনি আরও বলেন, "সরকার ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনির ব্যবহার বন্ধ করেনি, তাই বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে- এমন অভিযোগ করা সহজ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, চিনি উৎপাদনের প্রাথমিক পূর্বাভাস ছিল অনেক বেশি। আসল সমস্যা হলো, আখ ও চিনি উৎপাদনের নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি বা পদ্ধতি এখনো আমাদের হাতে নেই।"

তার মতে, "আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, ভারতের চিনি বাজার অত্যন্ত বড়। তাই শুধুমাত্র ইথানল উৎপাদনের জন্য কিছু চিনি সরিয়ে নেওয়ার কারণেই দেশে চিনির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না।"

চিনির দাম বৃদ্ধির পেছনে কারণ কী?

বিশ্বে চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের পরেই ভারতের স্থান।

ভারত সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে আখের রস থেকে চিনি উৎপাদনকারী মোট ৭০৩টি চিনি কল রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৫টি বেসরকারি, ৩২৫টি সমবায় এবং ৪৩টি সরকারি চিনি কল।

ভারতে চিনি উৎপাদনের বার্ষিক চক্র সাধারণত অক্টোবর মাসে শুরু হয়ে পরের বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হয়।

চিনি শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ন্যাশনাল ফেডারেশন অব কো-অপারেটিভ সুগার ফ্যাক্টরিজ লিমিটেড-এর সহ-সভাপতি কেতন প্যাটেল জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ চিনি বর্ষে দেশে প্রায় ৩.২ কোটি টন চিনি উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টন, যা অনুমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

বিবিসি গুজরাতিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেতন প্যাটেল বলেন, "গত বছর বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আখের ফলনে। পাশাপাশি, উত্তর প্রদেশে উচ্চ ফলনশীল সিও-০২৩৮ জাতের আখে 'গেরুয়া রোগ' ছড়িয়ে পড়ে।

"এই দুই কারণে আখের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে সুগার রিকভারি রেট, অর্থাৎ ১০০ কেজি আখ থেকে যে পরিমাণ চিনি পাওয়া যায়, তা ১২ কেজিরও নিচে নেমে গেছে। ফলে চিনির উৎপাদন পূর্বাভাসের তুলনায় কম হয়েছে।"

কেতন প্যাটেল জানান, ভারতে বছরে সাধারণত ২.৬ কোটি থেকে ২.৮ কোটি টন চিনি ব্যবহার হয়। সাধারণ পরিস্থিতিতে বছরের শেষে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন চিনি 'এন্ডিং স্টক' বা উদ্বৃত্ত মজুত হিসেবে থেকে যায়।

তিনি বিবিসি গুজরাতিকে বলেন, "২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে 'এন্ডিং স্টকের' পরিমাণ ছিল মাত্র ৫০ থেকে ৫০.৫ লাখ টন। ফলে ২০২৫-২৬ চিনি বর্ষের শুরুই হয়েছিল তুলনামূলক কম 'ওপেনিং স্টক' বা প্রাথমিক মজুত নিয়ে। এরপর উৎপাদনও প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম হয়েছে। তাই শুধু দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিকেই চিনির উৎপাদন কমার একমাত্র কারণ বলা যাবে না।"

"তবে মনে হচ্ছে, দাম আরও বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় অনেকেই প্যানিক বায়িং বা অতিরিক্ত কেনাকাটা করছেন। একদিকে বাজারে মজুত তুলনামূলক কম, সামনে উৎসবের মরসুম, আবার বৃষ্টিপাত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে চাহিদা বেশি। সব মিলিয়ে চিনির দাম বেড়ে গেছে।"

ভারতে চিনি মজুত কি পর্যাপ্ত?

ভারতের বেসরকারি চিনি কলগুলির সংগঠন ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইএসএমএ)-এর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, দেশের বস্ত্রশিল্পের পর আখ-ভিত্তিক শিল্পই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিনির্ভর শিল্প।

আইএসএমএ-র তথ্য বলছে, ভারতে প্রতি বছর গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়। এর ফলে বছরে গড়ে ৪৫ কোটি টন আখ উৎপাদিত হয় এবং এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।

চিনির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র সরকারের অবস্থান জানতে বিবিসি যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল কেন্দ্রীয় ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন প্রতিমন্ত্রী নিমুবেন বাম্ভানিয়ার সঙ্গে। ফোন ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে ২৮শে জুলাই প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্র সরকার দাবি করেছিল, দেশে চিনির কোনো ঘাটতি নেই। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "সম্প্রতি বিভিন্ন চিনি কলের গেটে চিনির দামের যে বৃদ্ধি দেখা গেছে, তা বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"

সরকারের দাবি, কিছু ব্যবসায়ী, ডিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীর মজুতদারি, জল্পনামূলক লেনদেন এবং মিল থেকে প্রকৃতপক্ষে চিনি সরবরাহ না করেই কাগজে-কলমে ব্যবসা দেখানোর প্রবণতা বাজারে কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, "এই ধরনের লেনদেনের ফলে অপ্রয়োজনীয় মূল্য অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চিনি কলের গেটের দাম থেকে শুরু করে খুচরা বাজারেও, যেখানে চিনির মূল্য বেড়েছে।"

কেন্দ্র সরকার আশ্বস্ত করে বলেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চিনি মজুত রয়েছে এবং ভোক্তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

দাম কমার কোনো সম্ভাবনা আছে?

কেতন প্যাটেলের মতে, জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসকে সাধারণত চিনি উৎপাদনের অফ-সিজন ধরা হয়। আবার এই সময়েই বিভিন্ন উৎসবের মৌসুম শুরু হয়। ফলে প্রতি বছরই এই সময়ে বাজারে চিনির দাম কিছুটা বাড়তে দেখা যায়।

আখের 'ফসলি সনে' এই তিন মাস চাষ হয় না। কিন্তু উৎপাদন সম্পর্কিত আর্থিক কার্যকলাপ চলে।

তিনি বলেন, "এখন চিনির দাম ৫০ টাকার উপরে থাকলেও, উৎপাদন মরসুমে সাধারণত তা ৩৮ থেকে ৪২ টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু ওই দামে চিনি কলগুলোর পক্ষে কৃষকদের ফেয়ার অ্যান্ড রিমিউনারেটিভ প্রাইস (এফআরপি) বা সরকার নির্ধারিত ন্যায্য মূল্য সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

"এ কারণেই অনেক কৃষক আখের বদলে অন্য ফসলে ঝুঁকছেন, যেগুলো থেকে তিন বা ছয় মাসের মধ্যেই আয় পাওয়া যায়। বাজারদর বাড়লে চিনি কলগুলির সুবিধা হয় এই যে, তারা মজুত চিনি বিক্রি করতে পারে এবং কৃষকদের বকেয়া এফআরপি সময়মতো মিটিয়ে দিতে সক্ষম হয়।"

তিনি আরও বলেন, "অক্টোবর থেকে নতুন মরসুমের চিনি বাজারে আসতে শুরু করবে। ফলে তখন দামের ওপর চাপ কমবে এবং মূল্যহ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।"

তবে গুজরাতের সুরেন্দ্রনগরের চিনি ব্যবসায়ী ধনরাজ কৈলা বিবিসি গুজরাতিকে জানান, "এই মুহূর্তে বাজারে চিনির তেমন কোনো ঘাটতি নেই, আবার অতিরিক্ত মজুতও নেই। পরিস্থিতি অনেকটা 'হ্যান্ড-টু-মাউথ', অর্থাৎ বাজারে যত চিনি আসছে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

"এর একটি বড় কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির মজুত কম। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ লাখ টন চিনি ইথানল উৎপাদনের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি রফতানিও হয়েছে।"

তিনি সতর্ক করে বলেন, "যে দেশে প্রায় দেড়শো কোটি মানুষ চিনির ক্রেতা, সেখানে এক বা দু'বছর খরা দেখা দিলে ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচির মতো প্রকল্প ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

"মানুষের মধ্যে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাত কম হবে এবং চিনির দাম আরও বাড়বে। এর ফলেই আতঙ্কে বেশি করে কেনাকাটা শুরু হয়েছে। আগে যারা পাঁচ কেজি চিনি কিনতেন, তারা এখন ৫০ কেজি কিনছেন। আর যারা ৫০ কেজি কিনতেন, তারা ১০০ কেজি চিনি চাইছেন।"