জলবিদ্যুতেই বাজি ধরেছিল নেপাল, বন্যা দেখিয়ে দিচ্ছে কেন এটি বড় সমস্যা

    • Author, কেলি এনজি এবং নবীন সিং খাদকা, পরিবেশ বিষয়ক সংবাদদাতা, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

নেপালের প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎই আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। তারা এত বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে যে ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে প্রতি বছর আয় করে প্রায় ২০ কোটি ডলার।

নেপালকে এই বিশাল প্রাকৃতিক সুবিধা এনে দেওয়া সেই হিমবাহ ও পর্বতগুলোই এখন বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আর গত বুধবারের মারাত্মক বন্যা দেশটির জলবিদ্যুৎ খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে থাকা ঝুঁকিগুলোকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

এই বন্যায় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থিত গ্রামগুলোকে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া এই বন্যা ত্রিসূলী নদী অববাহিকার ১২টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এর ফলে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি অকেজো হয়ে গেছে।

এই স্থাপনাগুলোর কোনোটি আবার চালু করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে অপারেটররা এখনো জানেন না বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (ক্ষতিগ্রস্ত ১২টির মধ্যে ছয়টি প্লান্ট তাদের মালিকানাধীন রয়েছে)- দেশটির সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছে যে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে।

তবে এর মুখপাত্র রাজন ঢাকাল স্বীকার করেছেন যে, জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগগুলো যেহেতু ঘনঘন ঘটছে, তাই "আমাদের জলবিদ্যুৎ নীতি নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে।"

২০১০ সালেও নেপালের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল এবং অনেক পরিবারকে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হতো।

জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুর্নীতি মোকাবিলা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে মৌসুমি ঘাটতি পূরণের কারণে ২০১৮ সালের মধ্যে নেপালের বেশিরভাগ মানুষ দিনে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেতে শুরু করে।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নেপালে ২২৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা তিন হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের বেশি, যা একসঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

আরও শত শত এমন প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে অথবা পাইপলাইনে আছে। এর বেশিরভাগই পাহাড়ের উঁচুতে নির্মিত, যেখানে তারা দ্রুতগামী স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই প্রকল্পগুলোতে খুব সামান্য স্টোরেজ সিস্টেমের প্রয়োজন হয়, অথবা আদৌ স্টোরেজ সিস্টেম লাগে না।

তবে হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলগুলো বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত উষ্ণ হওয়ায়, সেগুলো বেশি পরিবেশগত ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।

প্রাথমিক তদন্তে নেপালে গত সপ্তাহের আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে একটি ভেঙে পড়া হিমবাহ এবং এর ভিত্তিশিলাকে দায়ী করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা যদিও বলছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর কোনো সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র টানার সময় এখনো আসেনি।

তবে নেপালের ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এর আগে জানিয়েছিল যে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যেসব দুর্যোগের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, তার ৯১ শতাংশেরও বেশি ছিল 'জলবায়ু-সংক্রান্ত'।

নেপালের সাবেক জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী কুলমান ঘিসিং, যিনি এই বন্যাকে 'শতবর্ষে একবার ঘটা' ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।

মঙ্গাবে নামক একটি পরিবেশ বিষয়ক সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান যে, এটি প্লান্টের ডিজাইন এবং নির্মাণের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষা দেয়।

তিনি বলেন, "আমাদের প্লান্টগুলোকে বন্যার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী করে ডিজাইন করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।"

বন্যা আঘাত হানার পর থেকে শত শত জলবিদ্যুৎ শ্রমিক, প্রকৌশলী এবং স্থানীয় বাসিন্দা এই প্লান্টগুলোর কাদা ভরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির ঢাকাল বলছেন, নেপালের জলবিদ্যুৎ কার্যক্রম 'পুনর্বিবেচনার' মধ্যে এমন জলাধারভিত্তিক প্লান্ট অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা পাহাড়ের উঁচুতে বসানোর প্রয়োজন হয় না।

এগুলো পানি সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ছাড়ার সুযোগ দিতে পারে, তবে এর সাথে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যয়ও জড়িত থাকবে।

সব ডিম এক ঝুড়িতে

নেপাল কি জলবিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে- এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ক্লিন টেক ফার্ম 'উইন্ডপাওয়ার নেপাল'-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞ কুশাল গুরুং বলেন, "এই বিপজ্জনক সময়ে আমাদের সমস্ত ডিম এক ঝুড়িতে রাখা উচিত নয়।"

তিনি বলেন, "আমাদের সৌর এবং বাতাসের মতো অন্যান্য বিকল্পগুলোকেও গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হবে। আর সেজন্য আমাদের এমন একটি নীতি সংশোধন করতে হবে যা এই মুহূর্তে পুরোপুরি জলবিদ্যুৎ-পন্থি।"

এই দাবির সঙ্গে একমত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জির গবেষক বিবেক শাস্ত্রীও।

তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, "বাতাস এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোজন হলো এমন একটি কৌশল যা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় সীমিত করতে পারে।"

জার্মান সাহায্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা জলবিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।

নেপালের জ্বালানি উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আনার বিষয়ে একমত ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পুষ্প শর্মা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, এটি "একটি সীমিত মাত্রায়" করা যেতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনার তুলনা করে বিভিন্ন গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "বাতাস ও সৌরশক্তিতে অব্যবহৃত ক্ষমতা থাকলেও, জলবিদ্যুৎই মূলত নেপালকে তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় একটি বিশাল প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়।"

নেপালে বড় আকারের বিনিয়োগে জলবিদ্যুৎই আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে এবং কিছু জলবায়ু কর্মী বলছেন যে, দুর্যোগের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে।

আপার ত্রিসূলী-১ প্রকল্প, যা গত সপ্তাহের বন্যায় প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, নেপালের অন্যতম বৃহত্তম বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ উদ্যোগ, যার মূল্য প্রায় ৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

এর পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে রয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন।

এছাড়া নেপালের আপার ত্রিসূলী-৩ প্রকল্পটিও একইভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার অর্থায়ন করেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টেড ব্যাংক।

দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপল-এর সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাকরম বলছেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা "হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, বাসিন্দা, নদী, অবকাঠামো এবং ল্যান্ডস্কেপ যে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে সে বিষয়ে সচেতন ছিল।"

তিনি বলেন, "তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনে বারবার এটি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়নি, কঠোর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের দাবিও জানায়নি। এমনকি এরকম একটি দুর্যোগ যে ঘটতে পারে সেটি জানার পরও এ নিয়ে তারা প্রস্তুত ছিল না।"

ইতিহাস ইতোমধ্যে ত্রিসূলী নদী অববাহিকাকে পরিবর্তনশীল বা অস্থির হিসেবে প্রমাণ করেছে, ঠাক্কর উল্লেখ করেন কীভাবে এটি গত দুই বছরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেও ত্রিশূলি ও ভোটেকোশী নদী অববাহিকায় মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছিল।

গত সপ্তাহের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে নদী তীরবর্তী এসব এলাকাও রয়েছে।

এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, তিব্বতের গিয়রং কাউন্টির একটি হিমবাহের হ্রদ ফেটে নেপালের ঠিক এই নদীর পথ বেয়েই নিচে নেমে এসেছিল এবং কমপক্ষে ১১ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।

সেই বন্যায়ও অবকাঠামোর গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং ব্যস্ত নেপাল-চীন করিডোরের বাণিজ্য থমকে গিয়েছিল। সীমান্ত পারাপার প্রায় ছয় মাস বন্ধ ছিল, যা চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি পুনরায় চালু হয়।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির ঢাকাল স্বীকার করেছেন যে, জলবায়ু ঝুঁকির মূল্যায়ন সঠিকভাবে করা হলেও, "প্লান্টগুলোর ডিজাইন হয়তো সেই অনুযায়ী করা হয়নি।"

তিনি যোগ করেন, "স্পষ্টতই আমাদের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নির্মাণ ও পরিচালনার পদ্ধতিতে উন্নতি করতে হবে।"

নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক সমিতির উত্তম ভলোন লামার মতে, বেসরকারি অপারেটররা ইতোমধ্যে আর্থিক প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন।

গত তিন বছরে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ২০টিরও বেশি প্লান্টে বন্যার কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে বিমাকারীরা প্রায় চার কোটি ডলার পরিশোধ করেছে বলেও জানান তিনি।

তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচকে 'অসম্ভব' করে তুলছে।

নেপালের জলবায়ু প্রতিনিধি দলের সদস্য মনজিৎ ঢাকাল এর মতে, এই দুর্যোগ প্রমাণ করে যে জলবায়ুর ঝুঁকিগুলো আন্তর্জাতিক এবং একা নেপালের পক্ষে তা সামলানো সম্ভব নয়।

তিনি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানান যে, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে ডেটা শেয়ার করতে হবে, প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

"যে দেশগুলো সবথেকে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে তার মধ্যে নেপাল অন্যতম। আমাদের জলবিদ্যুৎ শিল্প ন্যূনতম নির্গমন কমানোর একটি প্রচেষ্টা। ফলে এই ঝুঁকি আমাদের একা মোকাবিলা করা উচিত নয় এবং আমরা এটা করতেও পারি না," বলেন তিনি।