হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাতটি নৌযান ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি ট্রাম্পের

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাতটি দ্রুতগতির নৌযানে হামলা চালিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে এই জলপথ দিয়ে নিরাপদে বের করে আনতেই ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, "আমরা সাতটি ছোট নৌকা বা দ্রুতগামী নৌযানকে ডুবিয়ে দিয়েছি। তাদের কাছে শুধু এগুলোই অবশিষ্ট ছিল"।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নৌযানগুলোতে হামলা চালাতে তারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে।

পরে অবশ্য ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো ইরানি স্পিডবোটগুলোতে মার্কিন হামলা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে তথ্য দিয়েছিল তা অস্বীকার করেছে।

তবে একটি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরানের দুইটি পণ্যবাহী জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে এবং পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয়ই সোমবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে তাদের জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার খবর দিয়েছে। এছাড়াও আরব আমিরাত আরও জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর ফুজাইরাহর বন্দরে বড় ধরনের আগুন লেগে গেছে।

শিপিং কোম্পানি ম্যায়াস্ক বিবিসিকে জানিয়েছে যে, ট্রাম্পের 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' উদ্যোগের তত্ত্বাবধানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় তাদের মার্কিন পতাকাবাহী একটি জাহাজ সফলভাবে প্রণালিটি থেকে বেরিয়ে এসেছে।

তাদের মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ 'অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স' গত ফেব্রুয়ারির শেষে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে, সোমবার সেটি হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পেরেছে।

এই কোম্পানিটি আরো জানিয়েছে যে তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ করেছে এবং মার্কিন সামরিক সুরক্ষা নিয়েই তারা উপসাগরীয় এলাকা থেকে বের হতে পেরেছে এবং সব নাবিক নিরাপদ ও অক্ষত রয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালির ঘটনাপ্রবাহ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই।

তিনি আরও যোগ করেন, "প্রজেক্ট ফ্রিডম আসলে প্রজেক্ট ডেডলক"।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ রয়েছে।

হামলার জবাবে বিশ্বের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি অবরোধের ঘোষণা দেয়, যেখান দিয়ে সাধারণত বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করে। তবে এরপরও খুব কম সংখ্যক জাহাজই এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পেরেছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে জানিয়েছিল, সোমবার নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ও মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। তারা বলেছে, তাদের সামরিক বাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছে।

যদিও, মার্কিন সামরিক বাহিনী গতকাল সোমবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি অ্যাডনকের একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে আক্রান্ত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে নোঙর করা তাদের একটি জাহাজে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং চারটি ড্রোনকে প্রতিহত করেছে।

দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে ইরানি হামলায় গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর ফুজাইরাহতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং এই ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছেন।

আবুধাবি এই হামলাগুলোকে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে বলেছে যে তারা পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবকাঠামোতে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো এই হামলাকে "অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য" বলে মন্তব্য করেছেন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অংশীদারদের রক্ষায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

ফুজাইরাহতে হামলার খবর প্রকাশের পরপরই 'বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট' অপরিশোধিত তেলের দাম পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার করেছে।

ফুজাইরাহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলে, হরমুজ প্রণালির ওপারে ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত।

আবুধাবির তেলক্ষেত্রগুলো থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত একটি পাইপলাইন গেছে, যার ফলে প্রণালিটি কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সীমিত পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ট্যাঙ্কারে বোঝাই করে বিশ্ব বাজারে পাঠানো হয়।

প্রতিবেশী কাতারও অ্যাডনকের একটি ট্যাংকারের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং পুনরায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

রোববার ট্রাম্প বলেছেন, 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নৌপথ থেকে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে বের করে আনতে সাহায্য করা শুরু করবে।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ২,০০০ জাহাজের ২০,০০০ নাবিক আটকা অবস্থায় রয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের জাহাজগুলো মুক্ত করতে সাহায্য চেয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালীতে আটকে আছে এবং কেবলমাত্র নিরপেক্ষ ও নিরীহ দর্শক।

সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এর ফলে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।

কিন্তু তারা কীভাবে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখবে তা নিয়ে বিস্তারিত বলেননি ট্রাম্প। তিনি শুধু শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন।