'বাংলাদেশের খুন' নিয়ে মমতা ব্যানার্জীর বক্তব্য নিয়ে ঢাকার দলগুলোতে কী প্রতিক্রিয়া

"বাংলাদেশে... কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন?" মঙ্গলবার ২রা জুন কলকাতার ধর্মতলায় একটি ধর্না মঞ্চ থেকে বললেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, "বাংলাদেশে... কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন?" মঙ্গলবার ২রা জুন কলকাতার ধর্মতলায় একটি ধর্না মঞ্চ থেকে বললেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর 'বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন জানি' -মন্তব্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের দিক থেকে সতর্ক প্রতিক্রিয়া আসলেও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনে করছে, মিজ ব্যানার্জী বাংলাদেশের ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকেই ইঙ্গিত করে কথাগুলো বলেছেন।

সে কারণে এনসিপি মনে করে মমতা ব্যানার্জীর ওই বক্তব্যে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম উদ্ধৃত থাকায় বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করা।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বলছে মিজ ব্যানার্জীর বক্তব্য থেকে 'বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভারতীয় খেলার' একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, বাংলাদেশের নাম আসায় এবং মমতা ব্যানার্জীর মন্তব্যে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নাম থাকায় বাংলাদেশ সরকার একটি ব্যাখ্যা চাইতে পারে, যদিও নির্বাচনে পর পরস্পরকে দোষারোপ করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অভিযোগের সংস্কৃতি বাংলাদেশের মতো ভারতেও আছে।

অন্যদিকে সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, মমতা ব্যানার্জী তার দেশের সরকারকে উদ্দেশ্য করে কথা বলেছেন, যা নিয়ে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত হবে না বলে মনে করেন তিনি।

মমতা ব্যানার্জী তার বক্তব্যে ওসমান হাদীর নাম উল্লেখ করেননি।

ছবির উৎস, Osman Hadi/facebook

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জী তার বক্তব্যে ওসমান হাদীর নাম উল্লেখ করেননি।

কী বলেছিলেন মমতা

কলকাতার ধর্মতলায় মঙ্গলবার ২রা জুন একটি ধর্না মঞ্চ থেকে বক্তব্যটি দিয়েছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের প্রশংসা করে তিনি বলেন, "বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার সেই অধিকার নেই, কিন্তু আমার মুখ্য বক্তব্য হলো, তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে।"

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "তার পরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেন... আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়। এটা দেশের স্বার্থে।"

মমতা ব্যানার্জী বলেন, "কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথা ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার।"

প্রসঙ্গত, চলতি বছরেরই মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশে ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুই মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। তাদের নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন।

এই দুই অভিযুক্ত মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছিল বলে জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এর পরে অভিযুক্ত ফিলিপ সাংমা নামে একজনকে নদিয়ার শান্তিপুরের কাছ থেকে গ্রেফতার করে এসটিএফ।

এর আগে ফয়সাল করিম মাসুদকে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

তবে এই ঘটনটির দিকেই তিনি নির্দেশ করছেন কিনা, তা স্পষ্ট জানাননি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মিজ ব্যানার্জী।

গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন ওসমান হাদি।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের বক্তব্য আর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় এসে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন শরিফ ওসমান হাদি।

ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি 'রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম' তৈরির মাধ্যমে নিজের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন তিনি।

ওসমান হাদির হত্যায় সন্দেহভাজন দুজনকে ভারতে আটক করা হয়েছে

ছবির উৎস, Md. Rakibul Hasan Rafiu/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ওসমান হাদির হত্যায় সন্দেহভাজন দুজনকে ভারতে আটক করা হয়েছে

ঢাকায় প্রতিক্রিয়া

মমতা ব্যানার্জীর বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে আসতেই এ নিয়ে শোরগোল শুরু হয় সামাজিক মাধ্যমে। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, ভারত, বাংলাদেশ ইস্যুতে নানা ধরনের পোস্ট আর মন্তব্য দেখা যায় সেখানে।

তবে মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে পাঠায়নি।

সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, "পাশের দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে তিনি পরাজিত হয়েছে তিনি তাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছেন। সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়"।

তিনি আরও বলেন, "ভারত সরকার যদি বাংলাদেশকে হাদি হত্যার বিষয়ে বলে...এটি নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে। আমরা এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছি এবং অগ্রগতিও হয়েছে। ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেই কাজ করতে হবে"।

বিএনপির অন্য নেতারা এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে তাদের দলের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া এবং কৌতূহল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি নেতারা কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মিজ ব্যানার্জীর মন্তব্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

জামায়াতের মধ্যেও কেউ কেউ মনে করেন যে বিজেপি ও মমতা ব্যানার্জীর নির্বাচনী দ্বন্দ্বের কারণেই বাংলাদেশকে জড়িয়ে এমন মন্তব্য আসতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, মমতা ব্যানার্জী কারও নাম বলেননি তবে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গকে মিলিয়ে রাজনীতির নাটাই হাতে রাখতে চাইছে।

"তার কথা থেকে বোঝা যায় যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং আধিপত্যবাদী চিন্তা থেকে এদেশের সরকারে ওঠা-নামার রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে বলে বলা হয় সেই খেলাতেই তারা মেতে উঠেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

মি. পরওয়ার বলেন, "সবকিছু মিলিয়ে মমতা ব্যানার্জীর এ বক্তব্য সহজভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তার বক্তব্যের সূত্র ধরে ভারত সরকারের বক্তব্য সরকার জানতে চাইতে পারে"।

ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তাঁর সঙ্গী আলমগীর হোসেন পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়ার পর বিএসএফের নজর এড়িয়ে ওই দুই অভিযুক্ত ভারতে কী করে প্রবেশ করল - প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল কংগ্রেস

ছবির উৎস, Osman Hadi/Facebook

ছবির ক্যাপশান, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তাঁর সঙ্গী আলমগীর হোসেন পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়ার পর বিএসএফের নজর এড়িয়ে ওই দুই অভিযুক্ত ভারতে কী করে প্রবেশ করল - প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল কংগ্রেস

ভারত সরকারের ব্যাখ্যা দাবি এনসিপির

অন্যদিকে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলছেন, মমতা ব্যানার্জী যেভাবে বলেছেন সেটি ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকেই ইঙ্গিত করে। তিনি মনে করেন বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখনই এ বিষয়ে ভারত সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করা।

"হাদির যে অ্যাক্টিভিজম ও সেই সময়ের যে প্রেক্ষাপট, খুনিদের ভারতে পালিয়ে যাওয়া এসব কিছু বিবেচনা করতে হবে। কড়াকড়ি ছিল সীমান্তে তারপরেও কীভাবে খুনিরা দ্রুত সময়ে ভারতে চলে যেতে পারল? মমতা ব্যানার্জীর বক্তব্য থেকে অনুমান করা যায় যে খুব অল্প সময়ে তাদের কীভাবে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হলো। আমরা মনে করি এসব প্রশ্নের জবাব সরকারের চাওয়া উচিত," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. হোসেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, নির্বাচনে হারলে কিংবা নির্বাচনের পর যে কোনো ঘটনায় একে অন্যকে দায়ী করার প্রবণতা বাংলাদেশ ও ভারতে আছে।

"এখন মমতার বক্তব্যের কোনো ভিত্তি আছে কি-না সেটি প্রমাণ ছাড়া বলা কঠিন। মমতা যা বলেছেন নির্বাচনে হারার পর বলেছেন। এর সূত্র ধরে এদেশেও কিছু লোক এ নিয়ে রাজনীতি করছে। তবে দেখতে হবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিক থেকে কোনো জবাব আসে কি-না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।