এবারের বিশ্বকাপে কী কী রেকর্ড তৈরি হলো মেসি-এমবাপ্পেদের ঘিরে

একটি ক্লোজ-আপ ছবিতে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে একটি অনুশীলন সেশনে দেখা যাচ্ছে। তার চুলে কামিয়ে লেখা রয়েছে তার স্কোয়াড নম্বর ২৩।

ছবির উৎস, Reuters

    • Author, ফের্নান্দো দুয়ার্তে
    • Role, বিবিসি নিউজ ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

প্রথম বল মাঠে গড়ানোর আগেই কিছু ঐতিহাসিক নজির গড়েছিল ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ ২০২৬। এটি এখন পর্যন্ত একমাত্র টুর্নামেন্ট, যা দুইয়ের বেশি দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে অংশ নিয়েছে রেকর্ড ৪৮টি দেশ।

কিন্তু রোববার রাতের ফাইনালের আগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে মাঠের ভেতরে ও বাইরে যা ঘটেছে, তার মধ্যে চোখের আড়ালে রয়ে যাওয়া রেকর্ড বা ঘটনাগুলো কোনগুলো?

টুর্নামেন্টের এমন কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যান এখানে তুলে ধরা হলো, যা আপনাকে বিস্মিত করতে পারে।

শট নিতে দ্বিধাহীন ফরাসি ও স্প্যানিয়ার্ডরা

১০ই জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে একটি ফ্রি-কিক নেওয়ার আগে স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল, আলেক্স বাইয়েনা ও দানি ওলমোকে ঘনিষ্ঠ আলোচনায় দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, স্পেন ও ফ্রান্স এই বিশ্বকাপে গোল নেওয়ার উদ্দেশ্যে শট নিতে ভয় পায়নি

ফ্রান্সের তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন সেমিফাইনালেই ভেঙে দেয় স্পেন।

তবে ফাইনালের আগে সাতটি ম্যাচে দুই দলই সব মিলিয়ে গোলের জন্য বিস্ময়কর ১২০টি শট নিয়েছে।

আহা, ইংল্যান্ড

সেমিফাইনালে থেমে যাওয়া আরেক দল ইংল্যান্ড এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হয়েছে। তাদের বিপক্ষে ফাউল করা হয়েছে ১০২ বার।

রদ্রি, এক অবিরাম শক্তির উৎস

স্পেনের এই মিডফিল্ডার দারুণ পরিশ্রম করেছেন। সাত ম্যাচে তিনি প্রায় ৮৪ কিলোমিটার দৌড়েছেন।

৯ই জুলাই বোস্টনে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের জয়ের ম্যাচে গোল উদযাপন করছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার দুই হাত প্রসারিত, আর পেছনে দেখা যাচ্ছে মরক্কোর গোলরক্ষক বোনুকে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে দ্রুত গতিতে দৌড়েছেন, ঘণ্টায় ৩৭.৬ কিলোমিটার গতিতে

এমবাপ্পে, যেন এক বুলেট

ফরাসি এই ফুটবলার এবারের টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দ্রুতগতির খেলোয়াড়। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের জয়ে তিনি ঘণ্টায় ৩৭.৬ কিলোমিটার গতিতে দৌড়েছেন।

আর মাত্র একজন খেলোয়াড়, সুইডেনের অ্যান্থনি এলাঙ্গা, ঘণ্টায় ৩৭ কিলোমিটারের গতি অতিক্রম করতে পেরেছেন।

কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোই রুমকে তার দলের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে বল ঠেকাতে লাফ দিতে দেখা যাচ্ছে। বলটি আংশিকভাবে তার মুখ ঢেকে দিয়েছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, এলোই রুম এক বিশ্বকাপ ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে সর্বোচ্চ গোল ঠেকিয়ে দেওয়ার রেকর্ডে (১৫) ভাগ বসিয়েছেন

প্যারাগুয়ের প্রাচীর এবং কুরাসাওয়ের এক রেকর্ড

রাউন্ড অফ থার্টিটু-তে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি উপহার দেয় প্যারাগুয়ে। এরপর রাউন্ড অব ১৬-এ তারা ৭০ মিনিট পর্যন্ত ফেবারিট ফ্রান্সকে আটকে রাখে।

তাদের ছয় ম্যাচের অভিযানে গোলরক্ষক অরলান্দো গিল বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ঠেকিয়েছেন ২৮টি গোল, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ।

একই ধরনের কীর্তির জন্য নাম বলতে হয় কুরাসাওয়ের এলোই রুমেরও। ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র ম্যাচে তিনি নির্ধারিত সময়ে এক বিশ্বকাপ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৫টি গোল ঠেকানোর রেকর্ডে ভাগ বসান।

পেনাল্টি কিক অপচয়

এই বিশ্বকাপে অনেক পেনাল্টি দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, টাইব্রেকারসহ ৬১টি।

এর মধ্যে মাত্র ৪০টি বল জালে গেছে।

ক্রীড়া বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান অপটার তথ্য অনুযায়ী, পেনাল্টি কিক গোলে রূপান্তরের হার (৬৫.৫%) ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে কম।

এমনকি লিওনেল মেসিও দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন।

বেশি দল, বেশি কার্বন নিঃসরণ

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি ল্যাম্পপোস্টে ঝুলছে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ব্যানার। ওপরে নীল আকাশে উড়ে যাচ্ছে একটি যাত্রীবাহী বিমান।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিশ্বকাপে কার্বন নিঃসরণের সিংহভাগই হবে বিমান ভ্রমণ থেকে

আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের নেটওয়ার্ক সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপনসিবিলিটি (এসজিআর)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে দূষণকারী বিশ্বকাপ।

গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টুর্নামেন্টটির কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইডে পৌঁছাতে পারে, যা আগের চারটি বিশ্বকাপের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।

দর্শক উপস্থিতির রেকর্ড

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্ব শেষে দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড গড়েছে। ৭২টি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন ৪৬ লাখ দর্শক, যা ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র আয়োজিত বিশ্বকাপের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

রাউন্ড অফ সিক্সটিন শেষে দর্শকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬২ লাখ ৫০ হাজারে, যা কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ গুণ।

বিশ্বকাপের একটি ম্যাচের পর মাঠ ছাড়ার সময় কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে সমর্থকদের সঙ্গে সেলফি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এবারের বিশ্বকাপের পর থেকে কেপ ভার্দের ভোজিনিয়াকে সম্ভবত আরও অনেক বেশি সেলফির জন্য থামতে হবে

ভোজিনিয়া, সামাজিক মাধ্যমের এক বিস্ময়

এই বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের দলটির কথা বলতে গেলে, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার নৈপুণ্য তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

টুর্নামেন্টে আসার সময় ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী ছিল ৫০ হাজার। ১৬ই জুলাই পর্যন্ত সেই সংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়েছে।

ফিলাডেলফিয়ায় ঘাম ঝরানো লড়াই

উত্তর আমেরিকার প্রচণ্ড গরমের কারণে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি চালু করে।

তারপরও ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ফিলাডেলফিয়ার স্টেডিয়ামে।

এটি এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উষ্ণ ম্যাচ, যা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সাদা শার্ট, নেভি ব্লেজার ও টাই পরা লিওনেল মেসি হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে। তিনিও একই ধরনের পোশাক পরেছেন, তবে লাল টাই ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার ব্যাজ রয়েছে তার পোশাকে। ২০২৬ সালের ৫ই মার্চ হোয়াইট হাউসে ইন্টার মায়ামি খেলোয়াড়দের সংবর্ধনায় ট্রাম্পের হাতে একটি উপহারস্বরূপ ফুটবল দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ১৯শে জুলাই কি আবারও দেখা হবে ট্রাম্প ও মেসির?

একবারও দেখা যায়নি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্কের জন্ম দেন যখন তিনি দাবি করেন, আমেরিকান ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানকে দেখানো লাল কার্ড প্রত্যাহারে তিনি সফলভাবে ফিফাকে রাজি করিয়েছিলেন।

তবে আয়োজক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচেও উপস্থিত হননি, যা বেশ অস্বাভাবিক।

তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, তিনি ফাইনালে উপস্থিত থাকবেন এবং বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন।