বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাচ্ছে অভিযোগ ইরানের

ইরানের হরমোজগান প্রদেশে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু

ছবির উৎস, Handout Photo by Morteza Akhoundi via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শুক্রবার প্রকাশিত ছবিতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের একটি ক্ষতিগ্রস্ত সেতু দেখা গেছে।
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইরান অভিযোগ করেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ তাদের বেসামরিক নানা স্থাপনা মার্কিন হামলার শিকার হয়েছে। তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইরানের "নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতার ওপর হামলা" চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি "শেষ" বলে ঘোষণা করার পর থেকে তারা টানা সপ্তম রাতের মতো বৃহস্পতিবার রাতে ইরানে হামলা চালিয়েছে তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে চালানো হামলায় "মার্কিন বাহিনী যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেছে"।

তবে তেহরানের আগের সেই দাবি যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে যে তারা ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, যেমন সেতু, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।

যদিও গত মঙ্গলবার ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি আলোচনায় ফিরে না আসে তাহলে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে।

এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মধ্যাঞ্চলের ইয়াজদ শহর, কেশম দ্বীপ এবং হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

বিবিসি নিউজ ফার্সি দুটি ভিডিও যাচাই করেছে, যেখানে বন্দর আব্বাসের উত্তরে অবস্থিত শহিদ মিরজাই জোড়া টানেল ও এর আশপাশে ক্ষয়ক্ষতি এবং ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, জাস্কের কাছে একটি স্থাপনায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও লবণমুক্তকরণ পাম্পে হামলার কারণে ২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানযোগ্য পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এদিকে, উত্তর হরমোজগান প্রদেশে ১০০টিরও বেশি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে গেছে, যার ফলে ল্যান্ডলাইন, মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় "৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত" হয়েছেন।

ইরান এটাও জানিয়েছে, আঘাতের জবাবে তারা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে কুয়েত রয়েছে, যারা জানিয়েছে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় হরমুজগান প্রদেশে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু

ছবির উৎস, Handout Photo by Morteza Akhoundi via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।

যুদ্ধবিরতি মোটামুটি মেনে চলা হয়েছিল। যদিও তেহরান পরে দাবি করে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আগে জাহাজগুলোকে অনুমোদন নিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছিল তারা। জাহাজ চলাচলে ইরানের ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে।

আলোচনা শুরু হলেও এতে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে দেখা যায় এবং গত সপ্তাহে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঘোষণা দেন।

এর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং সেখান দিয়ে চলাচল প্রায় থেমে গেছে।

বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আগে এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Reuters

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থার একটি প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, "হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে মাইন পাতা একটি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী জাহাজ বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়।"

সেন্টকম বলেছে, "আইআরজিসির অধিকাংশ দাবির মতো এটিও মিথ্যা।"

শুক্রবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দাবি করে, তারা কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং প্রথমবারের মতো সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি অস্বীকার করেছে।

বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত সপ্তাহে জর্ডানে অবস্থিত দুটি ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন।

শনিবার কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, ইরানি একাধিক হামলায় একটি তেল স্থাপনার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

জর্ডানের সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা রাতে তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানের ছোড়া ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

বাহরাইনও দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের হামলা "ব্যর্থ করে দিয়েছে"।

২০২৬ সালের ১৫ই জুলাই, একজন নারী তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ার পার হচ্ছেন। তার সামনে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড রয়েছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি কফিনে শোয়ানো অবস্থায় দেখানো হয়েছে এবং ফার্সি ভাষায় লেখা আছে, "আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব"।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তেহরানে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড টানানো হয়েছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি কফিনে শোয়ানো অবস্থায় দেখানো হয়েছে এবং ফার্সি ভাষায় লেখা আছে- "আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব"

বিবিসি ভেরিফাই ও বিবিসি ফার্সি ইরানের হরমোজগান প্রদেশে গারিভেহ সেতুর ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও যাচাই করেছে।

রাতে ধারণ করা ভিডিওতে সেতুর ওপর আগুনের গোলা দেখা যায়। দিনের আলোয় তোলা ছবিতে সেতুর ভাঙা অংশের চারপাশে ধ্বংসস্তূপসহ রাস্তার একটি অংশ ধসে পড়তে দেখা যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হরমোজগান প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন।

হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত ছিল।"

যুক্তরাষ্ট্র আরও জানিয়েছে, তারা চাবাহার বন্দরের একটি নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ধ্বংস করেছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হামলার আঘাতে টাওয়ারটি ভেঙে পড়ার একটি ছবি শেয়ার করেছেন। সেন্টকম বলেছে, টাওয়ারটি আইআরজিসির একটি সামুদ্রিক নজরদারি নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আবার শুরু হওয়ার পর "৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত" হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে "পাঁচজন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী দুই শিশু ও কিশোর" রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আহতদের মধ্যে "৩২ জন নারী ও ১৮ জন কিশোর" রয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, "আহতদের মধ্যে ৩৭ জন" এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, তারা "ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অধীনে নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত" করেছেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অধীনে থাকা সব দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছে।" তিনি ইরানের এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকারী দলের সদস্য মি. গারিবাবাদি আরও বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অগ্রাধিকার হলো দৃঢ়ভাবে ইরানকে রক্ষা করা এবং আগ্রাসীদের জবাব দেওয়া।"