নরসিংদীর মাদ্রাসায় কী হয়েছে, আবাসিক মাদ্রাসায় মেয়েরা কতটা নিরাপদ

ছবির উৎস, ANDREW HOLBROOKE
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় মেয়েদের একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় একজন ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে আটকের জন্য অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আবাসিক মাদ্রাসায় প্রায় একই ধরনের বেশ কয়েকটি যৌন নির্যাতনের ঘটনার কারণে সারাদেশের আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিশু-কিশোর, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, আবাসিক মাদ্রাসায় থাকা মেয়েদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত কীভাবে করা হচ্ছে এবং কারা এগুলোর দেখভাল করছে। আবার এ ধরনের মাদ্রাসা দেশে কতগুলো আছে সেগুলোর পুর্ণাঙ্গ তথ্যও খুব একটা পাওয়া যায় না।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কওমি আবাসিক মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা পুরোটাই এর প্রতিষ্ঠাতা বা মালিকের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং তিনিই তার মতো করে এগুলো চালান। কোনও কোনও জায়গায় একটি পরিচালনা কমিটি থাকলেও সেটি মালিকের নির্দেশেই পরিচালিত হয়।
আবার মাদ্রাসা বোর্ড থেকে তদারকির কথা থাকলেও বড় আকারের সুপরিচিত মাদ্রাসাগুলো ছাড়া অন্য কওমি মাদ্রাসার যেগুলো ছোটো বাচ্চাদের হিফজ শিক্ষাদান করে সেখানে তদারকি বলতে কিছু নেই।
আবার পুলিশ বা প্রশাসন মাদ্রাসার বিষয়ে নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে চায় না ধর্মকেন্দ্রিক অপপ্রচারের আশঙ্কায়।
ইসলাম বিষয়ক লেখক ও গবেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলছেন শক্ত মনিটরিং ও নিশ্ছিদ্র জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক নৈতিক বিচ্যুতির যেসব ঘটনার অভিযোগ আসছে সেগুলো থেকে মাদ্রাসাগুলোকে নিরাপদ রাখা যাবে।
কওমি মাদ্রাসার ছয়টি বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মাদ্রাসা বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক হিসেবে পরিচিত)-এর অধীনে। এর সহকারী মহাপরিচালক মাওলানা ইসমাইল হোসেন বলছেন, তাদের অধীনে থাকা মাদ্রাসার জন্য ৩০ জন পরিদর্শক আছেন, যারা নিয়মিত মাদ্রাসা পরিদর্শন করে থাকেন।
"কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটছে। আসলে কোরআন হাদিস ঠিকমতো মানলে এগুলো হতো না। নিয়মিত মাদ্রাসা পরিদর্শন ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আচরণ ও দায়িত্ব নিয়ে আমরা সচেতন করার চেষ্টা করছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

নরসিংদীতে কী হয়েছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নরসিংদীর রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে হাশিমপুর এলাকার একটি আবাসিক মাদ্রাসার 'শিক্ষক ও মুহতামিম' এর বিরুদ্ধে দশ বছর বয়েসি একজন ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে রবিবার থানায় মামলা হয়েছে।
"মেডিকেল প্রতিবেদন পেয়েছি আমরা। আমরা অভিযুক্ত শিক্ষককে ধরার চেষ্টা করছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
নিপীড়নের শিকার ছাত্রীর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দুই মাস আগে ওই শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসাটিতে দেওয়া হয়েছিল। তার ছোটো ভাইও ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
শিশুটি পরিবারকে জানিয়েছে যে, গত শুক্রবার রাতে তাকে নির্যাতন করা হয় এবং এতে রাতেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শনিবার সকালে অসুস্থ অবস্থায় তাকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়।
সেখানেই এসে তার বাবা-মা ঘটনার বিস্তারিত জানতে পেরে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মেয়েটিকে এখন পরিবারের কাছে রাখা হয়েছে।
"বাচ্চাটা এখনো অসুস্থ। আমরা দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি চাই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন শিশুটির নানা সুজন মিয়া।
ওদিকে ঘটনাটি জানাজানির পর শনিবার সন্ধ্যায় মাদ্রাসায় সালিশের নামে মীমাংসা করার চেষ্টা হলে স্থানীয়রা মাদ্রাসা ভাংচুর করার পর অভিযুক্ত শিক্ষক পালিয়ে যায়। পরে রোববার মেয়েটির মা থানায় মামলা করে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে, তবে এখন থেকে মেয়েদের আবাসিক মাদ্রাসাগুলো পরিদর্শন ও তদারকির চিন্তা চলছে জানিয়েছেন তিনি।
"মাদ্রাসাগুলো নিজেরাই একটি কমিটি করে পরিচালনা করে। প্রতি বছর নতুন মাদ্রাসা হয়। আমরা তাদের নিবন্ধনের পরামর্শ দেই। অনেক সময় আমরা যাই। কিন্তু তাও নানা ঘটনা ঘটছে। সে কারণে উপজেলা প্রশাসনের নারী কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়মিত পরিদর্শন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে," বলছিলেন মি. রানা।

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
আরও যত ঘটনা আলোচনায়
সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের আরও কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ছেলে ও মেয়ে শিশুকে যৌন হয়রানির ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও ব্যবস্থা নিয়েছে কিছু ঘটনায়।
যৌন হয়রানির কারণে এক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় মাদ্রাসার এক শিক্ষককে গত ২২শে এপ্রিল অবরুদ্ধ করেছিল স্থানীয়রা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে আটক করে।
আবার চাঁদপুরে মতলব উত্তরে এক শিক্ষককে একই ধরনের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করেছে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি।
শিক্ষার্থীরা কয়েকজন ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল, যা পরে তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়।
এর আগে গত পনেরই মার্চ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় একটি মহিলা মাদ্রাসার পরিচালককে এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ আটক করেছ।
এর আগে ২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজীতে একটি মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে এক শিক্ষার্থীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।
ওই শিক্ষার্থীর ভাই তখন বিবিসিকে বলেছিলেন, তার বোন তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করেছিল, সেই ঘটনার জেরে ওই অধ্যক্ষের পক্ষের শিক্ষার্থীরা তার বোনকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে।
আবাসিক মাদ্রাসা দেখভাল কীভাবে হয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার দারুস সুন্নাহ্ মহিলা (হিফজ) মাদ্রাসায় ছোটো মেয়েদের জন্য আবাসিক সুবিধা আছে।
মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি আমির হামজা বলছেন, বেফাকের অনুমোদন নিয়েই মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন তিনি।
"আমার এখানে মেয়েদের সেকশন আমার স্ত্রী, বোন ও অন্য শিক্ষিকারা দেখভাল করে। আমি নিজেই সেখানে যেতে পারি না। অন্য কোনো পুরুষ তো নয়ই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে যেসব আবাসিক মাদ্রাসায় মেয়েদের নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে সেখানে ছাত্রীদের জন্য পুরুষ শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মি. হামজা তার মাদ্রাসাটি বোর্ড থেকে পরিদর্শন করা হয়েছে জানালেও দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বহু কওমি মাদ্রাসাতেই মেয়েদের থাকার নিরাপদ ব্যবস্থা কতটা রাখা আছে তা দেখার জন্য কেউ কখনো যায়নি।
মূলত কওমি মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে নানা আলোচনা হলেও বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব মাদ্রাসার তদারকিকে শক্ত কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞ্চা মোঃ নূরুল হক বলছেন যে, কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজেরাই নিজেদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে এবং সে কারণে সরকারি প্রশাসনের তদারকিও সেখানে দৃশ্যমান হয় না।
"তারা সরকারের অনুদান নেয় না। সে কারণে শিক্ষাদান ও ব্যবস্থাপনায় তারা নিজেদের রীতি নীতি অনুসরণ করতে চায় এবং সেভাবেই চলছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. হক।
আবার বাংলাদেশে মোট কওমি মাদ্রাসা কত এবং এর মধ্যে আবাসিক মাদ্রাসা কতগুলো কিংবা সেগুলোর মধ্যে মেয়েদের জন্য কতগুলো আছে -এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না।
দুই হাজার একুশ সালে সরকারের দিক থেকে সব ধরনের মাদ্রাসার ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। তখন মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে কওমি, নূরানী, দীনিয়া, হাফেজিয়া, ফোরকানিয়া, ইবতেদায়িসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেইজ তৈরি করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
কিন্তু পরে সেটির আর অগ্রগতি হয়েছে কি-না সে সম্পর্কে কোনো তথ্য মাদ্রাসা বিভাগ থেকে পাওয়া যায়নি।
এমনকি তখন কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিলেও তাতে রাজি হয়নি বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নেতৃত্ব।

ছবির উৎস, Universal Images Group via Getty Images
এর আগে তখন সরকারের দিক থেকে সংসদে বলা হয়েছিল কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। যদিও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কওমি মাদ্রাসার বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত পক্ষে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি।
দেশে এখন কওমি মাদ্রাসার ছয়টি বোর্ড রয়েছে। এগুলোর তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ অবশ্য বলছে তারা শুধু দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি তদারক করে।
"অন্যসব বিষয় সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর। আমরা আর কিছু দেখি না," আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ- এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবিসিকে জানানো হয়েছে।
ওদিকে কওমি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় বোর্ড হিসেবে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর সহকারী মহাপরিচালক মাওলানা ইসমাইল হোসেন বলছেন, তাদের আওতায় প্রায় ৩০ হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে।
"এগুলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা আছে। বোর্ডের পরিদর্শকরা এগুলো পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। মেয়েদের আবাসিক ব্যবস্থাপনা কেমন হবে সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে এবং তাগিদ দেওয়া হয় যাতে এগুলো ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়। তবে আমরা মনে করি কোরআন ও হাদিস ঠিকমতো অনুসরণ করা এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন করার কাজ আমরা করি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
ইসলাম বিষয়ক লেখক ও গবেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসায় নৈতিক বিচ্যুতির ঘটনার অভিযোগ আসছে এবং কিছু ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা হয়।
"ভালো মনিটরিং ও নিশ্ছিদ্র জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রশাসনেরও উচিত আরও তদারকি করা। আবার এটিও নিশ্চিত করতে হবে যাতে ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় শিক্ষা ঢালাও অপপ্রচারের শিকার না হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।







