ঢাকার শাহ আলী মাজারে হামলার পেছনে কী কী কারণ জানা যাচ্ছে?

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী মাজারে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। হঠাৎ করেই রাজধানীতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় কেন হামলা চালানো হলো এ নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে আসছে।

শাহ আলী মাজারে হামলার কারণ কী কেবলই ধর্মীয় মতাদর্শগত, নাকি এর পেছনে মাজার কেন্দ্রিক অর্থ এবং দখলের রাজনীতিও রয়েছে?

প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসেন ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত হযরত শাহ্ আলী বাগদাদীর মাজারে। কিন্তু ১৪ই মে রাতে হঠাৎই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মাজারে ওরস চলাকালে একদল ব্যক্তি লাঠি হাতে মাজার এলাকায় থাকা ব্যক্তিদের মারধর করছেন। যাদের হাত থেকে বাঁচতে ছোটাছুটি করছেন অনেকে।

বিবিসি এসব ভিডিও স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

তবে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য মতে, মাস্ক পরা একদল ব্যক্তি লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাজারে হামলা চালায়। ওই রাতে মাজারের পূর্ব পাশে মাদুর বিছিয়ে বসা নারী ও পুরুষদের ওপর প্রথম চড়াও হয় তারা।

মাদকবিরোধী অভিযানের দোহাই দিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে লাঠিসোঁটা হাতে একদল ব্যক্তি তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়, মাজারের মূল স্থাপনায়ও ভাঙচুরের চেষ্টা করে তারা- বলছিলেন তিনি।

"কমবয়সি ২০ থেকে ৩০ জন, সাথে বয়স্করাও ছিল- লাঠি হাতে মাজারের সীমানায় ঢুকে যারে পাইছে তারেই মারছে। একপর্যায়ে তারা মূল মাজারেও হামলার চেষ্টা করে," বিবিসি বাংলাকে বলেন এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তৌহিদুল ইসলাম।

ঘটনার পর থেকেই হামলার কারণ হিসেবে ধর্মীয় ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক আধিপত্য, মাদকবিরোধী অভিযান এবং মাজারকেন্দ্রিক অর্থ দখলে নেওয়ার চেষ্টাসহ নানা বিষয় সামনে আসছে।

এই ঘটনার জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দায়ী করছেন মাজারের ভক্তরা। হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে রাজনৈতিক দলটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এছাড়া এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি রয়েছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

"মাজারে হামলার এই ঘটনায় টাকা-পয়সা, ভিন্নমত দমন এবং মাদক ব্যবসাসহ নানা কারণ একসাথে যুক্ত হয়েছে। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে," বলে বিবিসি বাংলাকে জানান পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মো. মোস্তাক সরকার।

যদিও এটিকে পরিকল্পিত 'অপপ্রচার' বলেই দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই হামলার ঘটনায় দলীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেই দাবি দলটির।

ভিন্ন মত দমনের চেষ্টা

বাংলাদেশে ধর্মীয় ভিন্নমতের বিষয়টি সামনে এনে মাজারে হামলার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

মিরপুরের শাহ আলী মাজারে হামলার পর থেকেই দেশে ভিন্নমত বা ধর্মের অনুসারীদের স্বাধীনতার বিষয়টি নতুন করে আবারও সামনে এসেছে।

মাজারে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অনেক মানবাধিকার সংগঠনও।

মিরপুরের শাহ আলী মাজারে হামলার চেষ্টা অতীতেও হয়েছে বলে দাবি মাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকের। তাদের দাবি, অনেকদিন ধরেই ধর্মীয় উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী মাজারের নানা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

তারা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়িয়ে একটি পক্ষ মাজারে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তারা মাজারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও দাবি তাদের।

গ্লোবাল সুফি অরগানাইজেশন এর কেন্দ্রীয় কার্য-নির্বাহী পরিষদের সদস্য আফতাব আলম জিলানী বলছেন, মাজারের বিরুদ্ধে মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগ তোলা হলেও এসব ব্যক্তিদের মূল লক্ষ্য হলো মাজার ধ্বংস করা।

"মাজারে সব ধরনের মানুষ আসেন। হ্যাঁ, কিছু মানুষ এখানে নিরবতার সুযোগ নিয়ে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরাও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি, কিন্তু তার মানে তো এই না যে তাদের জন্য আপনি মাজারে হামলা করবেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. জিলানী মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে অসংখ্য মাজার গড়ে উঠেছে এবং অনুসারীও বাড়ছে, যেটি ধর্মীয় উগ্রবাদীরা মেনে নিতে পারছে না বলেই এমন ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলছেন, "পাঁচই অগাস্টের পর থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সুযোগ নিয়েছে। এই দুই বছরে অন্তত ৮০টা মাজারে হামলা হয়েছে, ওপেন মব তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি মাজারে হামলার সময় একটা শ্রেণি মাজার ভাঙে, অন্যরা লুটপাট করে, একটা শ্রেণি পিটিয়ে হত্যা করছে।"

হামলায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

মিরপুরে শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

মূলত মিরপুরের যেখানে শাহ আলীর মাজার অবস্থিত, ওই এলাকার সংসদ সদস্য জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেও পরিচিত।

মাজারে হামলার পর এই ঘটনা নিয়ে নিজের অবস্থান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।

একটি মাদক চক্র মাজারকে ব্যবহার করে মাদকের রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছে বলেই দাবি তার। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের ওপর মাদক কারবারিরা হামলা চালিয়েছে বলেও জানান তিনি।

"ঢাকা চৌদ্দ আসনে যিনি নির্বাচিত সংসদ সদস্য হন তিনি মাজার কমিটি গঠন করার এখতিয়ার রাখেন। শিক্ষক, আলেম সবাইকে নিয়ে একটি সর্বজনীন মাজার কমিটি গঠন করে এই কাগজপত্র ওয়াক্‌ফ প্রশাসন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি, কিন্তু প্রায় তিন মাস হলেও সেটি অনুমোদন হয়নি।"

এছাড়া হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দলীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এটিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় শাহ আলী থানায় যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের নাম রয়েছে।

এমনকি যে পাঁচজনকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে, সেখানেও জামায়াত কর্মী রয়েছেন বলে জানান পুলিশের মিরপুর বিভাগের বিভাগের উপর কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার।

"অভিযোগকারীরা বলেছেন যে জামায়াতের কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। আমরা যে কয়জন আসামিকে গ্রেফতার করেছি তার মধ্যেও জামায়াতের অনুসারী আছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

তিনি জানান, মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। অতীতেও শাহ আলী মাজার এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান মি. সরকার।

"এই ঘটনার কিছুদিন আগেও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযান চালানো হয়েছিল, সেটিও পুলিশের অভিযান ছিল না। তবে সেখানেও রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নাম এসেছিল," বলেন তিনি।

হঠাৎ করেই কেন শাহ আলী মাজারে হামলা চালানো হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলছেন, "অনেকগুলো বিষয় থাকতে পারে। আমরা এখনো বিষয়টি পরিষ্কার না।

"মাজারে প্রভাব বিস্তারের জন্য এটা করা হতে পারে বা মাজারপন্থিদের ভিন্ন চোখে দেখা বা পছন্দ না করা এমন বিষয়গুলোও সামনে আসছে। সামনে মাজারের প্রতিনিধি পর্ষদ নির্বাচনের একটা বিষয়ও রয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মাজারকেন্দ্রিক অর্থ ও দখলের লড়াই

মাজারে হামলার এই ঘটনাটি কেবল ধর্মীয় কারণেই ঘটেছে বিষয়টি এমন নয় বলেই মনে করেন ওই এলাকার অনেকে। এর পেছনে মাজারকেন্দ্রিক অর্থ এবং মাদক ব্যবসার বিষয়টিও রয়েছে।

জানা গেছে, শাহ আলী মাজারের ভেতরে ও আশেপাশে গড়ে ওঠা কাঁচামালের আড়ত, দোকান ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো পরিচালনার জন্য শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে।

অভিযোগ রয়েছে, মাজারের আয় ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বারবার হাতবদল করার চেষ্টা করে।

এর সঙ্গে মাজার কমিটির নিয়ন্ত্রণ, দোকান বরাদ্দ এবং মাজারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির দখলও হামলার পেছনে দায়ী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দা এবং মাজারের অনুসারীরা জানিয়েছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের দোহাই কেবল একটি কৌশলমাত্র। প্রকৃত লক্ষ্য হলো মাজারকেন্দ্রিক টাকা-পয়সা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা।

হযরত শাহ আলী বাংলাদেশ জাতীয় বাউল সমিতির সভাপতি লতিফ সরকার বলছেন, মাজারের সম্পত্তি থেকে বিপুল অর্থ আয় হয়, এর হিসাব নেওয়া জরুরি।

"মাজারে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও প্রতারণার অভিযোগ থাকলে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিন। ঢালাওভাবে একটি মাজারের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার বা ভক্তদের মারধর করার যুক্তি হতে পারে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মাজারে হামলার ঘটনা কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার ওপর আঘাত বলেই মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরাও।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলছেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতার বিষয়টি সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।

মি. মোরসেদ বলছেন, সরকারকে অবশ্যই এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। "সাম্প্রতিক সময়ে মাজারে হামলার ঘটনা নিয়ে অনেক মামলা হয়েছে, কিন্তু তার বেশিরভাগেরই অগ্রগতি নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।