লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি বাড়ার ঘোষণার মধ্যেই সংঘাতের খবর, ইরানের আকাশে ড্রোন

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও সেখানে থেমে নেই অস্থিরতা। এছাড়া ইরানের রাজধানী তেহরানেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে পুরোপুরি থেমে নেই সংঘাতও।

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানো হলেও, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন।

তার মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত পুরোপুরি থামবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যানন স্পষ্টভাবে বলেছেন, "লেবানন সরকারের হেজবুল্লাহর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।"

হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন করে রকেট হামলার অভিযোগও তুলেছে ইসরায়েল।

মি. ড্যানন অভিযোগ করেন, "হেজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিকে ব্যাহত করতে রকেট হামলা চালাচ্ছে। আর ইসরায়েলকে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা জবাব দিতে হচ্ছে। আমরা যখনই কোনো হুমকি দেখছি, তখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।"

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের পর চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি আরও তিন সপ্তাহের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই নতুন চুক্তি প্রসঙ্গে ড্যানি ড্যানন বলেন, "এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়। আমি আশা করি, লেবাননের সেনাবাহিনী বাস্তবে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও বলবৎ করতে সক্ষম হবে।"

এদিকে লেবানন থেকে ছোড়া বেশ কয়েকটি প্রজেক্টাইল বা রকেট প্রতিহত করার দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এই ঘটনার জেরে ইসরায়েলের শতুলা এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছে হেজবুল্লাহও।

এর আগে ওভাল অফিস থেকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এসময় তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত ছিলেন।

যুদ্ধবিরতীর মেয়াদ নতুন করে বাড়ানোর পর উপস্থিত সবাই এই চুক্তিকে 'ঐতিহাসিক' বলে অভিহিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশংসাও করেন।

কিন্তু এই চুক্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ তুলেছে দুই পক্ষই।

বিবিসির সংবাদদাতা টম বেইটম্যান বলছেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, যার কেন্দ্রে রয়েছে- দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকা ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে, গত কয়েক বছরে ইরানের দুর্বল হয়ে পড়া এবং হেজবুল্লাহর শক্তি হ্রাস পাওয়া তাদের নিরস্ত্র করার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

যদিও এই প্রক্রিয়ায় লেবানন রাষ্ট্রের সম্মতি পেতে হলে বড় ধরনের বিনিময়ের প্রয়োজন বলেই মনে করেন মি. বেইটম্যান।

যার মধ্যে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান, অর্থাৎ ইসরায়েলি হামলার স্থায়ী নিশ্চয়তা এবং লেবাননের জাতীয় বাহিনীকে শক্তিশালী করতে ওয়াশিংটনের ব্যাপক সহায়তার বিষয়গুলোও রয়েছে।

অন্যদিকে, হেজবুল্লাহও নিজেদেরকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবাননের একমাত্র কার্যকর সশস্ত্র প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

বিশ্লেষকদের মতে, হেজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যদি কেবল চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করে এবং কোনো কার্যকর প্রণোদনা না দেয়, তবে তা লেবাননে নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিতে পারে।

লেবাননকে হেজবুল্লাহর থেকে 'রক্ষা' করতে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

বৃহস্পতিবার লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে আলোচনায় হয়। পরে ওভাল অফিসে তাদের নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সঙ্গে কাজ করবে যাতে তারা নিজেকে হেজবুল্লাহ থেকে রক্ষা করতে পারে"।

ট্রাম্প বলেন, এই "অত্যন্ত ঐতিহাসিক বৈঠকে" অংশ নিতে পারা তার জন্য "বড় সম্মানের" ছিল এবং ভবিষ্যতে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে আতিথ্য দিতে আগ্রহী।

ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার 'নয়'

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন কি না- একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, "আমার এটা কেন দরকার হবে?"—এবং প্রশ্নটিকে "মূর্খতাপূর্ণ" বলে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, "যখন আমরা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই প্রচলিত উপায়ে তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করেছি, তখন আমি কেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব?"

ট্রাম্প আরও বলেন, "কোনো অবস্থাতেই কারও দ্বারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়।"

ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ করতে তার ওপর কোনো চাপ নেই এবং তিনি ইরানের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো চুক্তি করতে চান।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের "পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ" রয়েছে এবং ইরান যখন একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, যুদ্ধবিরতির সময় ইরান যেন তেল বিক্রি করে শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করতে না পারে, সেটিও তিনি চান না।

তিনি বলেন, "এই বিষয়টা মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলার আয় করতে না পারে, আমি তা চাই না। আমিই এটা বন্ধ রেখেছি... তারা যদি চুক্তি করতে না চায়, তাহলে আমি সামরিকভাবে (যুদ্ধ) শেষ করব।"

ট্রাম্প আরও বলেন, "আমি তাড়াহুড়া করতে চাই না।"

মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিমানবাহী রণতরী

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড।

সেন্টকম সামাজিক মাধ্যম এক্সে শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সুপারক্যারিয়ারটি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করছে।

এই রণতরীটি অঞ্চলটিতে থাকা অন্যান্য জাহাজের সঙ্গে যোগ দেবে, নাকি কোনো একটি জাহাজের স্থলাভিষিক্ত হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট নয়, যদিও কিছু গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে আজ সেন্টকম জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড "লোহিত সাগরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের আওতায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে"।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের রাজধানী তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনার পর, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বেশ কিছু 'ছোট ড্রোন' শনাক্ত হওয়ার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে।

এর আগে বিভিন্ন ইরানি সূত্র থেকে জানা যায়, তেহরানের বিভিন্ন স্থান থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

যদিও এই ড্রোনগুলো কারা পাঠিয়েছে বা এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে।