ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা মুখ খুলছেন অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে

তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির ফাইল ছবি।
    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা, ক্ষোভ। তাদের অনেকে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দল পরিচালনার জন্য সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে।

তাদের কেউ যেমন অভিযোগ করছেন, অভিষেক ব্যানার্জী তাদের দলটিকে "শেষ করে দিলেন", কেউ সামাজিক মাধ্যমে তার উদ্ধত আচরণের কথা লিখছেন, তেমনই তারই উদ্যোগে যে পরামর্শদাতা সংস্থা নিযুক্ত হয়েছিল, সেই 'আইপ্যাক'-এর বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ অনেকে।

আইপ্যাক কর্মীদের 'মাতব্বরি'র কথাও বিবিসিকে বলেছেন এক নেতা।

আবার সিনেমা জগৎ বা ক্রীড়া জগৎ থেকে যারা তৃণমূল কংগ্রেসে এসেছিলেন, এমন একাধিক পরাজিত প্রার্থী ও টিকিট না পাওয়া অভিনেতাও রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

একাধিক নেতা- মন্ত্রী স্থানীয় গণমাধ্যমে এমন অভিযোগও তুলেছেন যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা নিয়মিত জেলা ও স্থানীয় স্তরের নেতাদের কাছে অর্থ দাবি করতেন।

ভোটের ফলাফল বেরনোর পর থেকেই যেভাবে দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন, তার প্রেক্ষিতে তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে ওই সব বক্তব্যের সঙ্গে দল সহমত পোষণ করে না, এবং চারজন নেতা ও মুখপাত্রকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দিয়েছে দলটি।

অভিষেক ব্যানার্জী কর্পোরেট কায়দায় দল চালান বলে ভোটের ভরাডুবির পরে অভিযোগ উঠছে - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অভিষেক ব্যানার্জী কর্পোরেট কায়দায় দল চালান বলে ভোটের ভরাডুবির পরে অভিযোগ উঠছে - ফাইল ছবি

অভিষেক দলটিকে 'তিলে তিলে শেষ করে দিলেন'

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসনে পরাজিত হয়ে এ বছর ক্ষমতা হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা, ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস-সহ দলের একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী নিজেদের কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

মালদা জেলার প্রবীণ নেতা ও সাবেক পর্যটনমন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ন চৌধুরী এর জন্য সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিযেক ব্যানার্জীর দিকে আঙুল তুলেছেন।

নির্বাচনের ফলাফলের পর তিনি সংবাদমাধ্যমে দলের 'বিপর্যয়ের' জন্য মি. ব্যানার্জিকে দায়ী করে বলেছেন, "একজনই ব্যক্তি আছে যিনি দলটিকে তিলে তিলে শেষ করে দিলেন। তিনি অভিষেক ব্যানার্জি। … দলটাকে যেভাবে নিয়ে গিয়েছিল কর্পোরেট হাউসের মতো, এখানে বাংলাতে কর্পোরেট হাউসে [রাজনীতি] চলে না।"

তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী এবং দলের বর্ষীয়ান নেতা অতীন ঘোষ সংবাদমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একজন আধুনিক নেতা। তিনি পার্টিটাকে একটি সংগঠিত আকার দিতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে মানুষের পাল্স বোঝা যায় না।"

তিনি মনে করেন, তৃণমূল স্তরে এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন যারা সরাসরি "মানুষের সঙ্গে মিশে মানুষের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করবেন।"

'দলবিরোধী মন্তব্যের' জেরে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে মি. চৌধুরী ছাড়াও ঋজু দত্ত, পাপিয়া ঘোষ, কোহিনুর মজুমদার এবং কার্তিক ঘোষের মতো নেতানেত্রী ও মুখপাত্রদের শোকজ নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের খবর।

কলকাতা লাগোয়া বিধাননগরের যে কর্পোরেট অফিস ভবনে আইপ্যাকের দফতর - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতা লাগোয়া বিধাননগরের যে কর্পোরেট অফিস ভবনে আইপ্যাকের দফতর - ফাইল ছবি

'কর্পোরেট স্টাইলে দল চালানো যায়না'

তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ সরাসরি পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের 'মাতব্বরি'র কথা বলছেন।

প্রাক্তন বিধায়ক ও প্রবীণ নেতা খগেশ্বর রায় বিবিসি-কে বলেন, "এই ফলাফলের জন্য আমি ৯৮ শতাংশ আইপ্যাক-কেই দায়ী করব। আমি ১৯৯৮ সাল থেকে দলের হয়ে কাজ করছি। পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা, অনেক নির্বাচন দেখেছি। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে আইপ্যাক আমাদের ওপর মাতব্বরি শুরু করল।"

তার অভিযোগ, আইপ্যাকের কর্মীরা তৃণমূল স্তরের মানুষের পাল্স বুঝতে ব্যর্থ।

তার কথায়, "ওরা আসতেন রাজকীয় মেজাজে, এসি গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন। এভাবে দল চালানো যায় না, মানুষের সঙ্গেও মেলামেশা করা যায় না।"

মি. রায়ের দাবি, "আইপ্যাক ঠিক করে দিত প্রার্থী কে হবেন বা দলের কর্মসূচি কী হবে। আমরা পুরনো কর্মী হলেও আমাদের কোনো গুরুত্ব ছিল না। দলের অনেক অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকা হতো না। এই দলটা কি ওরা গড়েছে, না আমরা? আসল তৃণমূল কংগ্রেসের আদর্শ বা আবেগ, কোনোটাই ওরা বুঝতে পারেনি।"

আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক কর্মরত চিকিৎসকের নির্যাতন ও খুনের ঘটনার পর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন প্রাক্তন আমলা জহর সরকার। এ বছরের নির্বাচনের আগে, ১৯শে এপ্রিল সমাজিক মাধ্যমে তিনি দাবি করেন, আইপ্যাকের প্রভাবে দলে একটি 'কর্পোরেট-স্টাইল' রাজনীতির সংস্কৃতি শুরু হয়েছে।

"এটা অত্যন্ত দূঃখজনক। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলির নিজস্ব সদস্য থাকা উচিত। অথচ রাজ্য সরকার ও দলের বাইরে আইপ্যাক নামের একটি তৃতীয় শক্তি সবস্তরে প্রভাব ফেলত," লিখেছিলেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারের কৌশল থেকে শুরু করে স্লোগান, সবই ঠিক করে দিত আইপ্যাক

ছবির উৎস, Sudipta Das/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারের কৌশল থেকে শুরু করে স্লোগান, সবই ঠিক করে দিত আইপ্যাক

অর্থের বিনিময়ে টিকিট বিলির অভিযোগ

এর আগে, তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক 'টাকার বিনিময়ে' নির্বাচনের টিকিট দেয়।

প্রাক্তন বিধায়ক খগেশ্বর রায় সংবাদমাধ্যমে আগে বলেছিলেন, প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে উনি 'টাকার কাছে হেরে গেছেন।'

বিবিসি সেই বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে উনি বলেন, "আমি আইপ্যাকের কার্যকলাপ নিয়ে অনেক কিছু বলেছি। টাকার ব্যাপারটা যার বোঝার তিনি বুঝে যাবেন।"

নির্বাচনের আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় ৭৪ বিধায়ককে প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের যুক্তি ছিল, পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকা তৈরী করা হয়েছে।

কিন্তু টিকিট না পেয়ে নেতাদের একাংশ তখন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

পূর্বস্থলী উত্তর আসনের প্রাক্তন বিধায়ক সেই সময়ে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন, তিনি আইপ্যাককে টাকা দিতে পারেননি বলে তাকে নির্বাচনে লড়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এইসব অভিযোগ ভোটের আগে থেকেই উঠছিল। কখনোই আইপ্যাক-এর তরফে এ নিয়ে কোনো বিবৃতি আসে নি।

সাম্প্রতিক অভিযোগগুলি নিয়ে বিবিসি বাংলা আইপ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে।

এই প্রতিবেদন লেখার আগে তাদের কাছে বক্তব্য জানতে চেয়ে যে মেসেজ করা হয়েছে, তারও কোনো উত্তর এখনো আসে নি।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরের দিন দলের প্রবীণ নেতানেত্রীদের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন করেন তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরের দিন দলের প্রবীণ নেতানেত্রীদের সঙ্গে সাংবাদ সম্মেলন করেন তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জি, তার পাশে বসে আছেন অভিষেক ব্যানার্জী

'ভালো কাজ করার জায়গা দিত না'

অন্যদিকে, ক্রীড়া দফতরের প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই দলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন।

তার দাবি, দলের পক্ষ থেকে একটি 'ললিপপের' মতো তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, এবং দফতরে 'চা-বিস্কুট' খাওয়া ছাড়া তার কোনো কাজ ছিল না।

সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, "যখন আমাকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল জয়যুক্ত হওয়ার পর, তখন আমি ভেবেছিলাম যে অনেক কিছু উন্নয়ন উন্নতি করতে পারব এই দফতরে এসে। কিন্তু যা দেখলাম, এখানে ভালো কাজ করার জায়গা দিত না অরূপ বিশ্বাস।"

অরূপ বিশ্বাস ছিলেন বিদায়ী মন্ত্রিসভায় রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মি. তিওয়ারি বলেন, লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে অব্যবস্থা এবং বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী তিনি।

এছাড়াও, ক্রীড়া পরিকাঠামো আরও মজবুত করার তার স্বপ্নও 'নষ্ট' করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন মি. তিওয়ারি।

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচীর কাছে পরাজিত হয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক এবং ব্যারাকপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন।

সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, "২০২১-এ আমার রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ। মানুষ আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন কাজ করার। পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে সেভাবেই বিধায়কের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে গেছি। সে অধ্যায় শেষ হলো ২০২৬-এ। সঙ্গে শেষ হলো আমার রাজনৈতিক জীবনের পথচলা।"

"বাংলার মানুষের মতামতে বাংলায় নতুন সরকার এসেছে। … আশা করব আপনাদের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে যাবে উন্নতির পথে।"

মি. চক্রবর্তী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন।

বিধায়ক থাকাকালীন তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুমোদিত কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।

অন্যদিকে, শিলিগুড়ি কেন্দ্রে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী গৌতম দেব বিবিসিকে বলেন, "নির্বাচনের ফলাফলের পেছনে দলের স্ট্র্যাটেজিতে কী ত্রুটি ছিল, তা নিয়ে আমি দলের সঙ্গে আলোচনা করব। আমি মনে করি, নির্বাচনে অনেক অনিয়ম হয়েছে। আমার চোখের সামনে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কারচুপি হয়েছে। আমি দলের খুব পুরোনো কর্মী, সবার সামনে দলের নিন্দা করতে চাই না।"