বিতর্কিত মামলায় কারাগারে স্কুল শিক্ষার্থীরা, ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগ

গাজীপুরের টঙ্গিতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কয়েকজন অভিযুক্ত
ছবির ক্যাপশান, গাজীপুরের টঙ্গিতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কয়েকজন অভিযুক্ত
    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"সবাই থানায় গিয়ে বললো যে, ও তো ছোট মানুষ। ওকে ছেড়ে দিন। পরেরদিন টেস্ট পরীক্ষা, সেটাও বলা হলো। কিন্তু থানার ওসি বললো যে, না ছাড়া যাবে না।"

গত বছর অক্টোবরে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর থানার অভিজ্ঞতা বলছিলেন ষোল বছরের কিশোর কাওসার হোসেন (ছদ্মনাম)।

কাওসার হোসেনের বাবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। বাবা-ছেলে দু'জনেই সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলার আসামী হওয়ায় পলাতক ছিলেন।

"আমি গ্রামে ফিরে আসি নানুর বাড়িতে। কারণ টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে। টেস্ট পরীক্ষা না দিলে তো এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারবো না। ভেবেছিলাম হয়তো পালিয়ে পালিয়ে পরীক্ষাটা দিতে পারবো। কিন্তু প্রথম পরীক্ষার রাতেই পুলিশ নানুবাড়ি থেকে আমাকে ধরে নিয়ে যায়" বলেন কাওসার হোসেন।

কাওসার পরে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তবে সেটা চার মাসেরও বেশি সময় পর এসএসসি পরীক্ষার মাত্র একদিন আগে। তার সহপাঠীরা এখন পরীক্ষার মধ্যে থাকলেও কাওসার পরীক্ষায় বসতে পারছেন না।

তিনি বলেন, "আমি জেলখানায় বসে জানুয়ারি মাসে কোর্টে আবেদন করি। কিন্তু কোর্টে বলেছে যে, টেস্ট পরীক্ষা না দিলে এসএসসির ফরম ফিলআপ করা যাবে না। আমার স্কুলেও যোগাযোগ করা হয়। তারাও বলে টেস্ট পরীক্ষা ছাড়া এসএসসি দেয়া যায় না। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষা আমি কীভাবে দেবো? আমি তো জেল হাজতে ছিলাম!"

বাংলাদেশে সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে কাওসারের মতো স্কুল শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার এবং মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে না পারার কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।

বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো বিতর্কিত আইনের বিভিন্ন ধারায় আটক এসব কিশোরদের অনেকে জামিনও পাচ্ছে না।

আঠারো বছরের নিচে যাদের বয়স, এমন কিশোরদের গ্রেফতার কিংবা জামিন পেতে বিলম্ব হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানাচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীদের অনেকেই।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, আইন অনুযায়ী মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু কিংবা অসুস্থ থাকলে তাদের জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলেও জামিন দিতে পারবে। কিন্তু এর ব্যত্যয় করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, "ধরেন আমার ছেলে যদি হয় ষোল বছর বয়স। তার তো বিবেক-বুদ্ধি এখনও ডেভেলপ করে নাই। সে একটা মিছিলে যদি সত্যিই গিয়ে থাকে, তাকে কি আপনি আট মাস কারাগারে রেখে দেবেন?"

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কিশোর বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, যথাসময়ে জামিন না পাওয়ায় তিনি এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। ফলে এসএসসি পরীক্ষাতেও তাকে বসতে দেয়া হয়নি
ছবির ক্যাপশান, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কিশোর বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, যথাসময়ে জামিন না পাওয়ায় তিনি এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি

'রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে' রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ পরিবারের

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিলো নাইম হাসানের (ছদ্মনাম)। তবে ক্লাস টেনে থাকাকালীন সময়ে তিনি গতবছর ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিলে অংশ নেন।

সেই ছবি দেখে পরে তাকে শনাক্ত করে পুলিশ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তার নাম ওঠে।

তারপর একদিন বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

"আমি তখন টেস্ট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমি যে মামলার আসামী সেটা আবার পরিবার জানে না। এরমধ্যেই পুলিশ ধরে নিলো।" বলেন নাইম হাসান।

গ্রেফতারের পর স্কুলশিক্ষার্থী হওয়ায় নাইমকে রাখা হয় গাজীপুরের টঙ্গিতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। এর কিছুদিন পরই শুরু হয় টেস্ট পরীক্ষা। নাইম হাসান যেখানে অংশ নিতে পারেননি।

"আমি কারাগারে ছিলাম চব্বিশ দিন। কয়েকবার শুনানি হয়েছে। কিন্তু জামিন হয় নাই। শেষপর্যন্ত স্কুল থেকে প্রত্যয়নপত্র, প্রমাণপত্র ইত্যাদি যোগাড় করে যখন দেয়া হইছে ততোদিন আমার টেস্ট পরীক্ষা প্রায় শেষ। ফলে জামিন পেলেও আর পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি।"

নাইম হাসানের দাবি, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা না হলে হয়তো আগেই জামিন পেতেন তিনি।

"যেহেতু সন্ত্রাসবিরোধী মামলা, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মামলা সে কারণে উপর থেকেই একটু চাপ দেয়া হয় যে জামিন দ্রুত না নিতে পারি।"

নাইম হাসান এখন নতুন করে ক্লাস টেনে ভর্তি হয়েছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার।

তবে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয় এমন কিশোরদেরও কেউ কেউ রাজনৈতিক মামলায় আটক হয়ে দিনের পর দিন কারাগারে আছেন, এরকম অভিযোগও আছে।

এরকমই একটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয় গত বুধবার।

"আমার ছেলেকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ। রাস্তায় নাকি মিছিল হয়েছিলো। কিন্তু আমার ছেলে তো সেটা জানে না। মিছিলের পর এসে তাকে পেয়ে ধরে নিয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় ঢুকায় দিয়েছে। আমার ছেলে যদি রাজনীতি করতো তাহলে তো জানতাম। তার মোবাইলে সার্চ করেও সন্দেহজনক কিছু পায় নাই। পরে মোবাইলও ফেরত দিয়েছে থানা থেকে।"

বলেন রাজিয়া বেগম (ছদ্মনাম)। যার ছেলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় রাস্তা থেকে গ্রেফতার হন আট মাস আগে। কিন্তু দফায় দফায় চেষ্টা করেও জামিন হয়নি।

পরিবারটির আতঙ্ক এমন অবস্থায় পৌছেছে যে নিজেদের পরিচয়ও প্রকাশ করতে চায় না।

"আমার ছেলে আমাকে ছাড়া কোথাও এক রাত থাকেনি। ও এমনিতেই একটু বোকা ধরনের। যখনই দেখা করতে গেছি, শুধু কান্নাকাটি করে। বলে কখন জামিন হবে। আট মাস তো হয়েই গেলো! আমারতো আর সেই সামর্থ্য নাই যে আজকে (কারাগারে) ঢুকেছে আর কালকে বের করে নিয়ে আসবো।"

হতাশ কণ্ঠে বলেন রাজিয়া বেগম।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ ব্যারিস্টার নাজিয়া কবির
ছবির ক্যাপশান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ ব্যারিস্টার নাজিয়া কবির

শিশু কারাগারে 'বিতর্কিত আইনে' ৫৭ শিশু-কিশোর

কাওসার এবং নাইম হাসান এসএসসি পরীক্ষা দিতে না পারলেও জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তারা দুজনেই আটক ছিলেন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যেখানে আঠারো বছরের কমবয়সী আসামীদের রাখা হয়। গাজীপুরের টঙ্গিতে এই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র স্থানীয়ভাবে শিশু কারাগার হিসেবেও পরিচিত।

কাওসার এবং নাইম হাসানের সূত্র ধরে এই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে তাদের মতোই এরকম বহু শিক্ষার্থী কিংবা কিশোরের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন মামলায় আটক হয়ে আছেন।

এদের কেউ জামিন পেয়েছেন। আবার অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না।

মূলত: আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগের মিছিলে যাওয়া, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো নানা অভিযোগে তারা আটক হয়েছে।

মামলার ক্ষেত্রে আবার কয়েকটি আইনের ব্যবহার দেখা যায়। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইন।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে এই ৪টি আইনে গ্রেফতারের সংখ্যা ৫৭ জন।

বিভিন্ন সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যাদের একটা বড় অংশই ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থাৎ রাজনীতি সংশ্লিষ্ট।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া যায়। এসব মিছিল থেকে কিংবা মিছিলে সন্দেহভাজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেই অনেকেই আটক হয়েছেন। আটকদের মধ্যে যাদের বয়স আঠারো বছরের নিচে তাদেরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়ছে।

এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পাঁচই মে পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সন্ত্রাসবিরোধীসহ ৪টি আইনের অধীনে গ্রেফতারের পর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আনা হয়েছে একশত আটাশ জনকে। এইসব কিশোরদের মধ্যে কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ জামিন না পেয়ে আটক আছেন।

রাজিয়া বেগম জানিয়েছেন, তার ছেলে আট মাস ধরে কারাগারে। নিম্ন আদালতে জামিন না হওয়ায় এখন তিনি উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করছেন।

সমালোচনা কেন হচ্ছে?

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নানারকম ঝটিকা মিছিলের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব মিছিলকে ঘিরে আটকের ঘটনাও আছে।

দেখা যাচ্ছে, এসব আটকের সময় বিশেষক্ষমতা আইন, দ্রুত বিচার কিংবা সন্ত্রাস দমন আইনের এমনসব ধারায় মামলা দেয়া হচ্ছে, যেগুলো জামিন অযোগ্য।

তবে শিশু-কিশোরদের জামিনের সুযোগ থাকলেও অনেকসময়ই সেটা হচ্ছে না। মানবাধিকার আইনজীবীদের অনেকেই যার সমালোচনা করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, আইন অনুযায়ী মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু কিংবা অসুস্থ থাকলে তাদের জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলেও জামিন দিতে পারবে। কিন্তু এর ব্যত্যয় করা হচ্ছে।

"ধরেন আমার ছেলে যদি হয় ষোল বছর বয়স। তার তো বিবেক-বুদ্ধি এখনও ডেভেলপ করে নাই। সে একটা মিছিলে যদি সত্যিই গিয়ে থাকে, তাকে কি আপনি আট মাস কারাগারে রেখে দেবেন?"

মি. ফারুক বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে পুলিশ হোক, আইনজীবী হোক, আদালত হোক -সবখানেই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। বিশেষকরে মানবাধিকার যেন লংঘিত না হয় সেটা দেখতে হবে।

অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ ব্যারিস্টার নাজিয়া কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঢালাওভাবে বিশেষত: যেসব আইন বিতর্কিত সেগুলোতে গ্রেফতার করা ঠিক হচ্ছে না। গ্রেফতার হলেও জামিন যেন বিলম্ব না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

"এরকমভাবে যদি মামলা হয়, গ্রেফতার হয়, তদন্ত চলতে থাকে একটা বাচ্চার ব্যাপারে যে এক/দেড় বছর ধরে জেলে। এখন সে যদি জামিনের আবেদন করে, সেটা আবার নাকচ করা হয়, তাহলে ঐ বাচ্চার ভবিষ্যত কী?"

তার মতে এধরনের ক্ষেত্রে কাউকে গ্রেফতার করা হলে শুরুতেই কঠোরতা না দেখিয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া দরকার।

"সন্ত্রাস বিরোধী আইন বা এধরনের আইনগুলো যদি প্রয়োগ করতে চায় তাহলে শুরুতেই সেটা করা উচিত নয়। বরং প্রথমে তার পরিবারকে ডেকে সতর্ক করা উচিত, বোঝানো উচিত। তারপরও যদি একই অপরাধ হয় তাহলে তো আইনে কঠোর হওয়ার সুযোগ আছেই" বলেন নাজিয়া কবির।

মানবাধিকার আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, তাদের ভাষায়, শিশুদের ক্ষেত্রেও বিতর্কিত আইনের ঢালাও ব্যবহার হচ্ছে।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে এধরনের মামলা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে একইসঙ্গে গ্রেফতারের পর পরীক্ষা দিতে না পারার মতো যেসব ঘটনা জানা যাচ্ছে, সেসব বিষয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট ‌উর্ধতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।