আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'গুপ্ত' বলাতেই কি ছাত্রদলের ওপর ক্ষিপ্ত ছাত্রশিবির?
২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘুরেফিরে বারবার আলোচনায় এসেছে 'গুপ্ত' শব্দটি। এর সূত্র ধরেই গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রশ্ন উঠছে, গুপ্ত রাজনীতির বলার পর ছাত্রশিবিরের তরফ থেকে কেন প্রতিক্রিয়া আসছে?
যদিও ছাত্রসংগঠনটির দাবি, 'গুপ্ত' লেখার কারণে তারা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং তাদের ওপর হামলা হবার পরই তারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
একইসাথে দেশ পরিচালনায় বিএনপি সরকারের ব্যর্থতার দায় ঢাকতে এমন বিতর্ক সৃষ্টি করে তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল জনসাধারণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেছে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা।
তবে এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, গ্রাফিতির জবাব গ্রাফিতি এঁকে দেয়ার কথা ছিল। তা না করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে ছাত্রশিবির। সিটি কলেজে হামলার ঘটনায় সম্পূর্ণ দায়ভার ছাত্রশিবিরের বলেও দাবি করেছেন তারা।
মূলত গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে পরিচয় গোপন করে বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময়ও বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখেও গুপ্ত রাজনীতির কথা শোনা গিয়েছিল। যদিও সেসময় তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি।
পরে তার জবাবও দেন জামায়াতের আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
দেয়ালে 'গুপ্ত' লেখা ও সংঘর্ষ নিয়ে যা বলছেন দুই সংগঠনের নেতারা
গত মঙ্গলবার কলেজ ভবনের দেয়ালে লেখা "ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস"-র ছাত্র শব্দটি কালি দিয়ে মুছে 'গুপ্ত' লেখে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সেখান থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে দাবি করে ছাত্রদল।
যদিও ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই বক্তব্য আসছে সংঘর্ষে জড়ানো দুই ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে।
ছাত্রশিবিরের দাবি, গুপ্ত লেখা নিয়ে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং লেখাটিকে ঘিরে চলমান "মিথ্যাচারকে এনজয়" করছেন বলে দাবি করেছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
তার দাবি, সিটি কলেজে টানানো তাদের দলীয় পোস্টার নামিয়ে দেয় ছাত্রদল। এবিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়ে বেরিয়ে আসার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে তাদের হাতাহাতি হয় এবং একজন শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করা হয়।
তারপর মূল ফটকের বাইরে বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর আঘাত করা হয়, যার প্রতিবাদে বিকেলে মিছিল বের করলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রদল পেছন থেকে হামলা করে বলে দাবি করেন তিনি।
"এটা হচ্ছে সূত্রপাত। এমনি ওই লেখা নিয়ে কোনো বিষয় ঘটেনি", বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ইসলাম।
অনেকটা একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ।
"মুশকিল হচ্ছে আপনি গুপ্ত ডেকে গ্রাফিতি আঁকবেন - নো প্রবলেম। কিন্তু সেখানে শিবিরের আস্তানা ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও বলে স্লোগান দিলেন - তখনতো আমি রিএক্ট করবো", বলেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলছেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি বা দেয়াললিখনে 'গুপ্ত' লেখার কারণে ছাত্রশিবির তাদের ওপর হামলা করেছে।
হামলার পর 'সামান্য পরিসরে হাতাহাতির' ঘটনার সময় শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছিল। পরে অধ্যক্ষের উপস্থিতিতে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হলে তারা চলে যান।
"এরপরে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা উসকানি দেন এই বলে যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নাকি লেজ গুটিয়ে চলে গেছে- এসব অভিযোগ করে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তারা পোস্ট দিয়েছে। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে", বলেন তিনি।
নাছির উদ্দীন বলেন, গুপ্ত লেখার কারণে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন কিংবা বিষয়টি তাদের অপছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে তারা আরেকটি গ্রাফিতি আঁকতে পারতো। "কিন্তু সেটি না করে তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছে"।
ছাত্রশিবিরের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা 'গুপ্ত' শব্দটিকে একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বরং একে 'স্যাটায়ার' হিসেবে নেয়ার কথাও বলেছেন তাদের কেউ কেউ।
সেক্ষেত্রে বুধবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে "গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই" লেখাটির পাশে দাঁড়িয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের ছবি তোলার প্রসঙ্গও টানেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম।
তিনি দাবি করেন, ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রদল নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
একই সুরে নূরুল ইসলাম ও ডাকসুর সহসভাপতি সাদিক কায়েম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ছাত্রদলের নতুন কোনো কর্মসূচি না থাকা এবং পুরনো রাজনীতির ধারায় থেকে যাওয়ার কারণে তাদের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দূরত্ব বেড়েছে।
যেভাবে গুপ্ত রাজনীতির আলাপ শুরু
বাংলাদেশের নিষিদ্ধঘোষিত বেশ কয়েকটি সংগঠন গোপনে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেও রাজনীতির মাঠে এই শব্দটি চাঙ্গা হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে।
পাঁচই অগাস্টের পর থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের খবরে সয়লাব হয় সামাজিক মাধ্যম। আর সেখান থেকেই আলোচনায় আসে গুপ্ত রাজনীতির বিষয়টি।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ – ডাকসু নির্বাচনে জয়ী শীর্ষ দুটি পদে থাকা সহসভাপতি সাদিক কায়েম ও সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদের অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসে ছাত্রদলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কিছু ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে।
তারা দুজনই বর্তমান ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ঘটনার উদাহরণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন।
এছাড়া আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের ব্যানারে থাকা কয়েকজন নেতার পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবিরের সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশের বিষয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে পরিচয় গোপন করে রাজনীতি করার প্রবণতাই 'গুপ্ত' নামে পরিচিতি পায়।
যদিও এসব দাবি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছে ছাত্রশিবির। এই অভিযোগকে 'হাস্যকর' উল্লেখ করে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ থাকা অবস্থায়ও তারা নিজ পরিচয়ে মিছিল করেছেন।
"ছাত্রশিবির ২০২৩-২৪ সালেও প্রত্যেক জেলায় জেলায় বড় বড় বিক্ষোভ মিছিল করেছে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে", দাবি করেন এস এম ফরহাদ।
এর আগে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট ভাইরাল হয় যেখানে ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদের নাম ছিল।
পরে এক সংবাদ সম্মেলন করে মি. ফরহাদ বলেছিলেন, ছাত্রলীগের কমিটির কিছু প্রক্রিয়া আছে। আমি কখনও সেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করিনি। কখনও সিভি জমা দিইনি। তবু কেন আমাকে পদ দিলো, সে প্রশ্ন ছাত্রলীগকে করা উচিত।
মি. কায়েমকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "এটারতো কোনো প্রমাণ নাই। আমি কি কোনো কমিটিতে ছিলাম?"
ছাত্রদলের বিরোধিতা করার জন্য কোনো আদর্শিক ভিত্তি না থাকায় 'আগের ছাত্রলীগের মতো তারা দায় দেয়ার রাজনীতি' করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ছাত্রদল বলছে, পাঁচই অগাস্টের পর থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ছাত্রশিবির তাদের পরিচয় গোপন রাখার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম তারা প্রকাশ করেনি, বরং পরিচয় গোপন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের 'বিভ্রান্ত' করছে।
ফলে কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে আসছে না। একইসাথে নিজেদের স্বার্থও হাসিল করে নিচ্ছে সংগঠনটি, বলেন।
আর ছাত্রশিবিরের দাবি, তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে। তবে সংগঠনটির কমিটির ধরন অন্যদের মতো না হওয়ায়, বাকিরা এই বাস্তবতা স্বীকার করে নিচ্ছে না।
"আমাদের সাংগঠনিক চার হাজার থানা আছে। চার হাজার থানার আশি হাজার লোকের তালিকা কেন দেবো আমি? মানে এটা কি মামলা দেবেন আপনি, সেজন্য দেবো? বা আমার ওপর নির্যাতন করবেন তাই দেবো নাকি। এটা কোনো লজিক্যাল কথা হতে পারে?" বলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
বরং দেশ পরিচালনায় বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতেই এই সময়ে এসে 'গুপ্ত' নিয়ে বিতর্ক উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাঙ্গা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন সংগঠনটির নেতারা।
"তারা তাদের মতো করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য, জাতীয় জায়গা থেকে রাজনীতিতে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য সম্ভবত এই ধরনের এজেন্ডা তারা বিভিন্ন জায়গায় বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন", বলেন মি. ইসলাম।
এদিকে সরকারের সাথে এই বিতর্কের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। আর সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় ব্যর্থতা-সফলতার পরিমাপ করা যায় না বলে মন্তব্য করেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
"এগুলো পরিমাপ করার জন্য দুই মাস যথেষ্ট সময় না। তারা খুবই অপরিপক্ব রাজনীতির পরিচয় দিচ্ছেন", বলেন তিনি।
একইসাথে গোপন রাজনীতি কখনও কোনো দেশকে স্থিতিশীল রাখতে দেয় না বলেও মত দেন মি. রাকিব। একইসাথে "চূড়ান্ত পতনের ভয়ে" ছাত্রশিবির এখন পর্যন্ত তাদের সবার পরিচয় প্রকাশ্যে আনেনি বলেও মন্তব্য করেন ছাত্রদলের এই সভাপতি।
এর আগে, জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় এক ভাষণে বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও 'গুপ্ত' প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, "অনেকেই এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন, গুপ্ত তোমরা। কারণ, তাদের গত ১৬ বছর আমরা দেখি নাই। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে (৫ই অগাস্ট) পালিয়ে গিয়েছে।''
তারেক রহমান এই কথা বলার পরদিনই এক জনসভায় জামায়াতের আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ''অনেকে আমাদেরকে খোঁচা দেয়। আমরা নাকি গুপ্ত নাকি সুপ্ত। লজ্জা! নিজেরা যারা গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে থেকেছেন, সেই লোক যদি আমাকে গুপ্ত বলেন, আপনাকে গুপ্ত বলে, আপনার কেমন লাগবে বলেন!''