পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কি রাস্তায় নামাজ পড়া বন্ধ করতে বলেছেন?

কলকাতার রেড রোডে ২০২৬ সালের নামাজের জমায়েত

ছবির উৎস, DEBAJYOTI CHAKRABORTY/Middle East Images/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার রেড রোডে ২০২৬ সালের নামাজের জমায়েত
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

'শুভেন্দু অধিকারী রাস্তায় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করেছেন', ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বিজেপি নেতা ও ব্যারাকপুরের সাবেক সংসদ সদস্য অর্জুন সিংয়ের দেওয়া এই বিবৃতির পরে হইচই হচ্ছে সারা দেশ জুড়ে।

ইন্ডিয়া টুডে টিভিকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারের পরে একাধিক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে কথা শুরু হয়। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে অনেকে যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করেছেন।

ইন্ডিয়া টুডে টিভিকে অর্জুন সিং বলেন, "ক্যাবিনেট মিটিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক নির্দেশ দিয়েছেন। রাস্তায় নামাজ পড়া বরদাস্ত করা হবে না। মসজিদে নামাজ পড়লে কোনও আপত্তি নেই কিন্তু রাস্তায় পড়া যাবে না।"

এর আগেও একাধিকবার বিজেপির বিভিন্ন নেতাদের রাস্তা আটকে নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা গিয়েছে।

অর্জুন সিং আরও বলেন, "গরু পাচার, চোরা কারবার ও পুলিশের উপর ঢিল-পাটকেল ছোড়ার বিরুদ্ধেও কঠোর হয়েছে সরকার।"

প্রসঙ্গত, গত বছর কলকাতার রেড রোডে ঈদের নামাজ আয়োজনের অনুমতি প্রথমে দেয়নি সেনা বাহিনী। কলকাতার এই রাস্তাটি সেনা বাহিনীর অধীনে আছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, সেনার অনুষ্ঠানের জন্য অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে পরে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে সেনা বাহিনী ও অনুমতি দেয়।

তবে রেড রোডে নামাজ পড়া নিয়ে আপত্তি ছিল বিজেপির একাধিক নেতার, তারা গণমাধ্যমের সামনে এই বিষয় নিয়ে আপত্তিও তুলেছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা

অর্জুন সিংয়ের দাবির সত্যতা কতটা?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা সোমবার ১১ই মে তাদের প্রথম বৈঠক করে। এর পরে পুলিশ, জেলাশাসকদের উদ্দেশ্যে তিনি একাধিক নির্বাহী আদেশ দেন বলে জানা গিয়েছে।

উল্লেখ্য, এই আদেশগুলি অনেক সময়েই বৈঠক করে ঠিক করা হয়। অনেক সময়েই এর লিখিত কোনও কপি প্রকাশিত হয় না। এগুলি মূলত প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজের রূপরেখা নির্ধারণের জন্য।

ভারতের সংবিধানের ৭৭ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেট ও রাজ্য সরকারের ক্যাবিনেটকে এই ধরনের অর্ডার দিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন আদেশ সত্যিই দেওয়া হয়েছে তবে তাতে নির্দিষ্টভাবে নামাজ বন্ধ করার কোনও উল্লেখ নেই।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রাস্তা আটকে যে কোনও ধর্মীয় উপাসনার ক্ষেত্রেই কঠোর হতে বলা হয়েছে পুলিশকে।

তিনি যোগ করেন, "দুর্গা পূজা, রমজান, ঈদ ইত্যাদির মতো বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগে থেকে করা আবেদনের ভিত্তিতে রাস্তায় জমায়েত ও উপাসনার অনুমতি আছে, যেমনটা আগেও ছিল।

"আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সুষ্ঠু যানবাহন চলাচলের জন্যই এই সিদ্ধান্ত" জানিয়েছেন তিনি।

অল ইন্ডিয়া হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ আবদুল সেলিম বলেছেন, "কাটা মাংস ঢেকে বিক্রি করা ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক নির্দেশিকা সমর্থনযোগ্য।"

তবে অর্জুন সিংয়ের দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, "এই কথাগুলো অহেতুক বলা হয়। অর্জুন সিংয়ের কথায় নামাজও থামবে না বা আজানও বন্ধ হবে না।"

বিজেপি নেতার কথায় মুসলমান সমাজের মধ্যে কোনো রকম অস্বস্তির সৃষ্টি হবে না বলেই মনে করেন মি. সেলিম।

বিজেপি নেতা অর্জুন সিং

ছবির উৎস, Sonu Mehta/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজেপি নেতা অর্জুন সিং

আর কী নির্দেশ দেওয়া হলো?

একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কলকাতা বিমানবন্দরের দুই নম্বর রানওয়েতে অবস্থিত মসজিদটিকে 'সসম্মানে' অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

এই মসজিদটি ফ্লাইট ওঠা-নামায় সমস্যা সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ করে থাকেন বিজেপির একাধিক নেতা-মন্ত্রী।

গত বছর ডিসেম্বর মাসে বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া দাবি করেছিলেন যে, মিনিস্ট্রি অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন বা বেসামরিক উড়ান মন্ত্রণালয়-এর মতে, রানওয়ের নিকটবর্তী ওই মসজিদটি, "নিরাপদ বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে" এবং "জরুরি পরিস্থিতিতে রানওয়ের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে"।

"বেসামরিক উড়ান মন্ত্রণালয় স্বীকার করে নিয়েছে যে, দ্বিতীয় রানওয়ের অদূরেই একটি মসজিদ অবস্থিত। এটি নিরাপদ বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং রানওয়ের 'থ্রেশহোল্ড' বা প্রবেশবিন্দুকে ৮৮ মিটার পিছিয়ে দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতে যখন মূল রানওয়েটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত থাকে, তখন রানওয়ের ব্যবহারিক উপযোগিতা এর ফলে ব্যাহত হয়," নিজের 'এক্স' হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া।

তিনি আরও লিখেছিলেন, "তোষণ রাজনীতির দোহাই দিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে না।"

তবে এই বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কলকাতার কয়েকটি পত্রিকায় লেখা হয়েছে যে ওই নির্বাহী আদেশগুলির মধ্যে এটাও বলা হয়েছে যে মাইকের শব্দের যে উর্দ্ধসীমা রয়েছে, সেটাও কঠোরভাবে বলবৎ করতে হবে পুলিশকে।

মসজিদগুলি থেকে মাইকে কেন আজান দেওয়া হবে, সেই শব্দ কেন কানে আসবে, এই প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদীদের একাধিকবার তুলতে শোনা গেছে।

এরকম একটি নির্দেশের কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও এই প্রসঙ্গে পুলিশের ওই অধিকর্তা জানিয়েছেন, ৬৫ ডেসিবেলের যে উর্দ্ধসীমা আছে, সব মাইকের আওয়াজ যাতে তার মধ্যেই থাকে, সেই দিকে সতর্ক নজর রাখবে পুলিশ।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নিরাপত্তায় যেন কোনও প্রকার অবহেলা না থাকে সেই বিষয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের তরফে।

এ ছাড়া শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া অন্য কেউ যাতে হেলমেটবিহীনভাবে বাইক না চালাতে পারে সেই বিষয়ে সতর্ক হতে বলা হয়েছে পুলিশকে।

রেড রোডে রাজ্য সরকার আয়োজিত দুর্গাপুজো কার্নিভাল

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রেড রোডে রাজ্য সরকার আয়োজিত দুর্গাপুজো কার্নিভাল

পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা আটকে উপাসনার সংস্কৃতি

পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা বন্ধ করে উপাসনার সংস্কৃতি নতুন নয়। একাধিক ধর্মীয় উৎসবে রাস্তা বন্ধ করে উপাসনা ও অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করার প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গে আছে।

যে রেড রোড নিয়ে এত বিতর্ক, সেই রেড রোড প্রতি ঈদেই কার্যত একটি ঈদগাহের রূপ ধরণ করে। কলকাতা ও আশেপাশের বহু মানুষ রেড রোডে নামাজ পড়তে আসেন।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও এই রেড রোডে একাধিকবার ঈদ উপলক্ষ্যে ভাষণ দিতে উপস্থিত হয়েছিলেন।

তবে এই রেড রোডের নামাজ অনুষ্ঠান মূলতঃ সেনাবাহিনীর থেকে অনুমতি পাওয়ার পরেই করা হয়।

এ ছাড়াও দুর্গাপূজার সময়ে কলকাতার একাধিক রাস্তা আটকে যায় অস্থায়ী মণ্ডপ ও প্যান্ডেলের জেরে।

কলকাতায় মোট দুর্গাপুজোর সংখ্যা ২০২৫ সালে ছিল চার হাজারের বেশি, এমনটাই জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর মধ্য় বহু দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল তৈরি হয় রাস্তা বন্ধ করেই।

এ ছাড়াও চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, বাঁশবেড়িয়ার কার্তিক পুজো ও কালনার সরস্বতী পুজোর কারণেও এই শহরগুলিতে বহু রাস্তা বন্ধ করা হয় ও যান নিয়ন্ত্রণ চলে।