আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জামালপুর সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা সেই বৃদ্ধের পরিচয় মিললো
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
নির্বাক চোখে একবার এই দেশ তো আরেকবার ওই দেশ, দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিটিই যেন 'নো-ম্যানস ল্যান্ডের অ্যালোন সোলজার, যে স্থানে থাকে না কারো অধিকার।'
বলছিলাম, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্ত দিয়ে যেই ব্যক্তিকে বাংলাদেশে 'পুশইনের' চেষ্টা করেছে, তার কথা।
বিবিসি বাংলা এবং বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমেই বুধবার এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, কূটনীতিকে ছাপিয়ে সীমান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ব্যক্তির জন্য মানবিকতাবোধ মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি পোস্ট করে এমন কথাও লিখেছেন অনেকে।
অবশ্য পরে পরিচয় মিলেছে ওই ব্যক্তির, বাংলাদেশের নাগরিক, নাম তার ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন, বয়স ৬৮ বছর।
চব্বিশ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় কামালপুর সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে মি. বর্মনকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানায় নিয়ে হেফাজতে রাখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বিজিবি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর, সেটি দেখে বিজিবির সাথে তার পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করেছেন।
জামালপুর - ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারি পরিচালক ইমাম হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মি. বর্মন বাংলাদেশী নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মি. হোসেন বলেন, "ভিডিওটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করেছে। তার বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ি।"
পরে দুপুরে মি. বর্মনের পরিবারের সদস্যদের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।
কামালপুর সীমান্তে কী ঘটেছে?
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্ত দিয়ে বুধবার ভোরে বিএসএফের সদস্যরা মি. বর্মনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায়।
সেসময় বিষয়টি বুঝতে পেয়ে জামালপুর-৩৫ বিজিবির সদস্যরা ওই চেষ্টা রুখে দেন।
বিবিসির ভিডিওতে দেখা গেছে, এ সময় বিএসএফ ও বিজিবির সদস্যদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হচ্ছে।
বিজিবির সদস্যরা, বিএসএফের সদস্যদের বেশ ক্ষোভের সাথে বলছেন, "আপনি গুলি করার কথা বললেন কেন? কী বললেন এটা আপনারা, গুলি করবেন? গুলি নাই আমাদের কাছে?
ওইসময় দুইপক্ষের মাঝে বেশ অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে উভয়পক্ষের দিকেই তাকাচ্ছিলেন মি. বর্মন, যাকে পুশইনের চেষ্টা নিয়ে সীমান্তে এই উত্তেজনা।
বিজিবির সদস্যরা মি. বর্মনকে, ভারতের দিকে লক্ষ্য করে "অ্যাই ওইদিকে যাও, যাও ওইদিক যাও" বলে নির্দেশ দেন।
৬৮ বছর বয়সী মি. বর্মনকে অবশ্য এই সময় কোনো কথা বলতে শোনা যায় না।
কিন্তু তিনি বিএসএফের সাথে ভারতের দিকে যেতে চাইলে, তার হাতে ধাক্কা মেরে বাংলাদেশের দিকে লক্ষ্য করে "এইদিক কি আসছে, ওইদিক যাও", বলেন বিএসএফ সদস্যরা।
পরে পাশে সরে গিয়ে মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নেন মি. বর্মন।
ভিডিওতে এ সময় দেখা যায়, হিন্দিতে বিএসএফের সদস্যরা বিজিবির সদস্যদের জানান, আপনারা সেদিকে(বাংলাদেশে) যেতে দেবেন না, আমরা এদিকে(ভারতে) যেতে দেব না। উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে, সেখানে যা সিদ্ধান্ত হবে, সেটাই করা হবে। আপনারা তাকে চাইলে নিয়ে যেতে পারেন, সে বাংলাদেশী।
ভিডিওতে এ সময় একজন বিজিবি সদস্যকে মি. বর্মনকে আইডি বা টাকা আছে কী না, সে প্রশ্ন করতে দেখা যায়।
পরে আবারো বিজিবি, বিএসএফ উভয়পক্ষই তাকে বিপরীত দিকে যেতে নির্দেশ দিচ্ছিল।
স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানান, রাতে নো-ম্যান্স ল্যান্ডেই অবস্থান করেছিলেন মি. বর্মন।
"সারা রাত তিনি নো-ম্যান্স ল্যান্ডেই ছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তার কথাও অস্পষ্ট" বলেন একজন সাংবাদিক।
যেভাবে নিশ্চিত হয় পরিচয়
বুধবার বিজিবি ও বিএসএফের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ওই ভিডিও দেখে রাতেই মি. বর্মনের পরিবারের সদস্যরা তাকে চিহ্নিত করে, যোগাযোগ করেছেন বলে জানান পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা।
বিবিসি বাংলার কাছে বুধবারের ঘটনার বর্ণনা দেন জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারি পরিচালক ইমাম হোসেন।
মি. হোসেন জানান, বুধবার তার পরিচয় ও বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে ঠিকভাবে বলতে পারেননি।
"না, সে পুরাপুরি বলতে পারে নাই। যেমন: গতকালকে যখন নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ছিল, তখন সে শুধু বলছে যে আমার বাড়ি রাজশাহী। রাজশাহীর গোদাগাড়ি এতটুক সে বলতে পারে। পুরাপুরি সম্পূর্ণ সে বলতে পারে না এবং তার কাছে তখন কোনো আইডি কার্ড, টাকা-পয়সা মানে হচ্ছে, বাংলাদেশি কোনো চিহ্ন তার ছিল না" বলেন মি. হোসেন।
তিনি জানান, "ওই এলাকার মধ্যে কেউ বলতে পারবে না যে এই লোক বাংলাদেশি, তাকে কেউ চিনে না। যখন কেউ তাকে চিনে না, তখন আমরা তাকে রিসিভ করি নাই। কারণ সে যে বাংলাদেশি এটাতো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না"।
বিজিবির এই সদস্যকেই ভিডিওতে মি. বর্মনকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়।
তিনি জানান, বুধবার মি. বর্মন মাঝে-মধ্যে বলে যে, "আমি ভুল করে চলে আসছি এবং সে ইঙ্গিত করে ভারতের ওই কাঁটাতারের দিকে এবং সে একবার ভারতের কাঁটাতারের ওইদিকে যায়, আবার সে বাংলাদেশের দিকে আসে। আবার ওইদিকে যায়, আবার এইদিকে আসে।"
ওই ব্যক্তির কাছে নিজের কোনো পরিচয়পত্র, টাকা-পয়সা বা নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু জানাতে পারেনি বলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।
"তো আমরা কনফিউজড ছিলাম যে সে আসলে কোথাকার, আমাদের বাংলাদেশি নাকি সে ইনডিয়ান নাগরিক" বলেন বিজিবির সহকারি পরিচালক মি. হোসেন।
তিনি জানান, ওই ব্যক্তি বারবারই বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ি বলে জানায়।
"ওইটাকে কেন্দ্র করে তার বাড়িতে মেসেজ পাঠিয়েছি, পাঠানোর পরে ওই এলাকার মানুষ যখন ফেসবুকে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ভাইরাল হইছে যে তার ছবি এইটা। তখন তারা নিশ্চিত হইছে যে, এটা আমাদের সদস্য। পরে তারা যোগাযোগ করে।"
এরপরই বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে সাতটায় বিজিবির সদস্যরা কামালপুর সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থানরত ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানায় নিয়ে যায়।
"তারপর তাকে আমরা উদ্ধার করে থানায় দিয়েছি এবং তার আত্মীয়-স্বজন এসে থানা থেকে আজকে নিয়ে যাবে" বলেন মি. হোসেন।
এরই মধ্যে, পরিবারের সদস্যরা বিজিবির সাথে যোগাযোগ করেছে এবং দুই মাস ধরে তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না বলেও জানান তিনি।
"বকশীগঞ্জ থানায় তাকে হ্যান্ডওভার করেছি। কারন হচ্ছে যখন সে বললো, গোদাগাড়ি বাড়ি, তখন তার বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলাম। তার পরিচয় নিশ্চিত করেছি যে সে বাংলাদেশি এবং তার পরিবার দাবি করেছে যে সে দুই মাস যাবত হারানো অবস্থায় ছিল, সে ছিল না কোথাও, পায়নি তাকে" বলেন বিজিবির সহকারি পরিচালক ইমাম হোসেন।
বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মকবুল হোসেন তাকে থানায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, "বিজিবির সদস্যদের হেফাজতে আছে। তারা থানায় নিয়ে আসছে। তার পরিচয় তারা পাইছে, রাজশাহীতে তার বাড়ি। রাজশাহী থেকে লোকজন আসতেছে, আসলেই তাদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হবে।"
পুলিশ কর্মকর্তা মি. হোসেন জানান, তার নাম ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন, বাবার নাম বাবু চন্দ্র বর্মন। মায়ের নাম কমলা রানী।
জাতীয় পরিচয়পত্রে তার এই পরিচয়ও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
ভোটার আইডিতে তার ঠিকানা, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি থানার চান্দলাই গ্রাম।
সকালে গণমাধ্যমের কর্মীরা যখন বকশীগঞ্জ থানার গোলঘরে বসে থাকা এই বৃদ্ধের ভিডিও ধারণ করছিলেন তখন উদ্ভ্রান্ত ছিল তার দৃষ্টি। দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
একজন স্থানীয় সাংবাদিক জানান, তাকে বেশ অসুস্থ দেখা যাচ্ছিল। সারারাত মাটিতে শুয়ে থাকায় তার শরীরে ও পায়ে কাদা-মাটি লেগেছিল।
পরে দুপুর আড়াইটার দিকে মি. বর্মনের পরিবারের সদস্যরা বকশীগঞ্জ থানায় পৌঁছায়।
পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা তাদের কাছে মি. বর্মনকে হস্তান্তর করেন।
তার মেয়ের জামাই গৌর চন্দ্র বর্মন জানান, "আজ থেকে দুই মাস আগে আমার শ্বশুর হারায় গেছিল। আমরা খুব খোঁজাখুঁজি করছিলাম। হঠাৎ করে কালকে ফেসবুকের চ্যানেলে দেখছি। আগে কখনো হারায় নাই, এবারই প্রথম।"
এদিকে, বর্তমানে জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানান বিজিবির সহকারী পরিচালক ইমাম হোসেন।
মি. হোসেন জানান, এখন তিনি বাঘারচর সীমান্তে টহল দিচ্ছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক আছে বলেও জানান তিনি।
"আমার এলাকায় পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক। আজকে পুশইনের কোনো চেষ্টা হয়নি" বলেন বিজিবির এই কর্মকর্তা।