আওয়ামী লীগে শেখ সেলিমকে নিয়ে আলোচনা কেন

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগে 'শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে কে দলের সভাপতি হবেন'- এই ইস্যুতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-কে টেলিফোনে দেওয়া শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকারের জের ধরেই নতুন করে এ বিতর্ক সামনে এসেছে। রবিবার এটি প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াল।

ওই সাক্ষাৎকারে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন তার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি এমন সময় এই মন্তব্য করলেন যখন আগামী ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং দলটির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ গত কিছুদিন ধরে শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়কে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরে আসছেন।

আবার ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির নেতৃত্ব পুনর্গঠনে সম্ভাব্য হিসেবে এতদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী কিংবা সজিব ওয়াজেদ জয়সহ কয়েকজনের নাম কর্মী সমর্থকদের মধ্যে আলোচনায় ছিল।

সেখানে শেখ সেলিমের নাম কখনো দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনায় এসেছে বলে শোনা যায়নি। বরং দলেরই একটি অংশ এখনো সামাজিক মাধ্যমে মি. সেলিমের বিষয়ে প্রকাশ্যেই তাদের হতাশা প্রকাশ করছেন।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে শেখ পরিবারের বাইরে কেউ শীর্ষ নেতৃত্ব পাবে না- সেটিই সত্যি হয়ে আসছে কি-না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মজিবর রহমান চৌধুরী বলছেন, শেখ সেলিম ব্যক্তি ও পারিবারিকভাবে একজন 'টিপিক্যাল আওয়ামী লীগার' কিন্তু দলটির কর্মী সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে দলটিকে নতুন সময় ও প্রজন্মের জন্য ঢেলে সাজানোর যে আকাঙ্ক্ষা তার সাথে এই নামটি মানানসই নয়।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত অবশ্য বলছেন, শেখ হাসিনা শুধুমাত্র দলের গঠনতন্ত্রের প্রক্রিয়াটিই উল্লেখ করেছেন এবং সে অনুযায়ী শেখ হাসিনার পর জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে শেখ সেলিম দলের বিভিন্ন সভায় সভাপতিত্ব করছেন।

এসব বিতর্কের মধ্যেই ভারতের অবস্থানরত দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রবিবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, "নতুন সময়ের দরকার নতুন মানুষ ও নতুন আইডিয়া। আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন তুলে দেওয়া"।

শেখ সেলিম আসলে কে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুকাল ধরে সক্রিয় এবং বিভিন্ন অভিযোগে সমালোচিত শেখ সেলিম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আপন ভাগ্নে। তার পুরো নাম শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

১৯৭৫ সালের পনেরই অগাস্টে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের ছাড়াও যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে মি. সেলিমের বড় ভাই শেখ ফজলুল হক মণি ও তার স্ত্রীও ছিলেন।

তার বোনের ছেলে আন্দালিভ রহমান পার্থ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। আরেক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্পর্কে মি. সেলিমের বেয়াই।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর ১৬ সদস্যের মধ্যে ক্রমানুসারে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের অবস্থান তৃতীয়। তার আগের দুজন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মতিয়া চৌধুরী মারা গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে দেশে দেখা যায়নি। দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে, তিনি এখন ভারতে অবস্থান করছেন।

সম্পর্কে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিম ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। দলীয় পরিমণ্ডলে শেখ পরিবারের সদস্য হিসেবে বরাবরই প্রভাবশালী মি. সেলিম দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদে গোপালগঞ্জ থেকে প্রথমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সবমিলিয়ে তিনি আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

কিন্তু দলের ভেতরে বাইরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে তিনি সবসময়ই আলোচিত হয়ে এসেছেন। যদিও তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক রাজনীতিকের সাথে তাকেও আটক করা হয়েছিল।

এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানেও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গটি ছিল। ওই সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মামলাও হয়েছিল।

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে নতুন একটি মামলা হয়েছিল যেখানে অভিযুক্তের তালিকায় যাদের নাম রাখা হয়েছিল তার মধ্যে শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিমও আছেন।

ওই সরকারের সময়েই ২০২৫ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাংচুরের ঘটনার সময়ে শেখ সেলিমের বনানীর বাসায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

চলতি বছর পহেলা মার্চ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি মাসের শুরুতে দুদক জানিয়েছে তারা মি. সেলিমের নামে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত সম্পদের সন্ধান পেয়েছে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য ও নানা প্রশ্ন

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল- তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লিগের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন তিনি।

তার বোন শেখ রেহানার সক্রিয় রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা কার্যত খারিজ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, "রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।"

দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

তার কথায়, "এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।"

এভাবেই এই খবর দ্যা ওয়াল প্রকাশ করার পরপরই বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে শেখ সেলিম আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হচ্ছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের মধ্যেও পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।

দলের সমর্থকদের কেউ কেউ এই খবরে তাদের হতাশার কথাও প্রকাশ করছেন।

যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলছেন, শেখ হাসিনা শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

"দলের সিনিয়র নেতাদের অনেকে মারা গেছেন, অনেকে জেলে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার পরে এখন শেখ সেলিমই জ্যেষ্ঠতম নেতা। দলীয় সভাগুলোতে সভানেত্রীর পর জ্যেষ্ঠতম সভাপতিমন্ডলীর সদস্য তিনিই সভাপতিত্ব করেন। এটিই শেখ হাসিনা বলেছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তাহলে শেখ হাসিনার পর শেখ সেলিমই দলের সভাপতি হবেন এবং সেটি কি তিনি শেখ পরিবারের বলেই কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "শেখ হাসিনা কাউকে চাপিয়ে দিচ্ছেন না। এখানে শুধু দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এ মুহূর্তের জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ সেলিমের নাম আসছে। শেখ হাসিনা যদি হঠকারিভাবে কাউকে বসাতেন তখন সেটি গণতন্ত্র বিরোধী হতো"।

সজিব ওয়াজেদ জয়কে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করে আসছিলেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকের মধ্যে এ ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে শেখ হাসিনার পর তিনিই তার দলের হাল ধরবেন।

কিন্তু মি. জয় আপাতত দলের নেতৃত্বে আসছেন না, শেখ হাসিনা কী সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন কি-না – এমন প্রশ্নের জবাবে মি. আরাফাত বলেন, "বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র হিসেবে দলের সর্বস্তরে তিনি গ্রহণযোগ্য ও তার প্রতি আগ্রহও ব্যাপক। দেশ ও আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালে তিনি তার দায়িত্ব পালন করছেন ও করবেন। তবে দলে তার ভূমিকা কি হবে সেটি দলের কাউন্সিলে নির্ধারিত হবে"।

আবার দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম নেতা হিসেবে শেখ সেলিম দলের সভাপতির দায়িত্ব পাবেন এমন খবরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে দলের ভেতর ও বাইরে থেকেও। অনেকেই মি. সেলিমকে বিতর্ক ও তার গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী সমর্থক মি. সেলিমের দলের নেতৃত্বে আসা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সামাজিক মাধ্যমে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, "আওয়ামী লীগের নেতা কে হবে সেটি দলের নেতাকর্মী কাউন্সিলে নির্ধারণ করেন। এখন শুধু সিনিয়র মোস্ট নেতা হিসেব শেখ সেলিম কিছু সভায় সভাপতিত্ব করছেন। তারও দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও অনেক ত্যাগ রয়েছে।

শেখ সেলিমের নাম সামনে এসেছে এমন এক সময়ে যখন কিছুদিন আগেই শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার কথা বলেছেন। তিনি কী তার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন? জানতে চাইলে মি. আরাফাত বলেন, "শেখ হাসিনার ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে দলের ভেতরে অনেক বৈঠক হচ্ছে। অনেক সভায় তিনি নিজেও সভাপতিত্ব করছেন। আবার তিনি যেগুলোতে থাকতে পারছেন না সেগুলোতে শেখ সেলিম সিনিয়র নেতা হিসেবে সভাপতিত্ব করছেন"।

তারপরেও এ কৌতূহল অনেকের মধ্যেই আছে যে, আওয়ামী লীগ আসলে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মজিবর রহমান চৌধুরী বলছেন, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের যে চর্চা সেখান থেকে বিএনপির মতো আওয়ামী লীগেরও বের হওয়া কঠিন।

"আওয়ামী লীগের অসংখ্য কর্মী সমর্থক এদেশে আছে। তাদের অনেকের প্রতিক্রিয়া থেকেই এটা পরিষ্কার যে এখনকার বাস্তবতা ও নতুন প্রজন্মের কথা বিবেচনায় নিলে শেখ সেলিম দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সঠিক ব্যক্তি নন। তবে তিনি তার দলে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা। আর শেখ হাসিনা নতুন কারও হাতে সভাপতির দায়িত্ব দিচ্ছেন এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো দেননি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।