আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ?
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
২০২৪ সালে বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও সম্প্রতি দলটির পক্ষে নানা কার্যক্রম সামনে আসছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও গত কয়েকদিনে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় নানা তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীদের মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সর্বশেষ গত শুক্রবার একটি দলটির কিছু নেতাকর্মীদের একটি শপথ গ্রহণ করতেও দেখা যায়।
লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগরের একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এই কর্মসূচি পালনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা আলোচনা চলছে।
যেখানে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে শপথ নিতে দেখা গেছে দলটির নেতাকর্মীদের।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও দলীয় নেতাকর্মীরা নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ও সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের প্রায় পৌনে দুইশো আইনজীবী। তারা সেখানে, দ্রুতই দলটির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেও দাবি জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। অংশ নিতে পারেনি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে।
গত ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হওয়ার পরদিন সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দলীয় কার্যালয় চালুসহ দলটির নেতাকর্মীদের নানা তৎপরতা দেখা যায়।
কিন্তু চলতি মাসে জাতীয় সংসদে দলটির নিষেধাজ্ঞা বহালের সুযোগ রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ আইন আকারে পাশ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে যে গুঞ্জন ছিল সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে সেটি কতখানি সফল হবে তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর।
লক্ষ্মীপুরে 'শেখ হাসিনাকে ফেরানোর শপথ'
গত শুক্রবার লক্ষ্মীপুরের একটি উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রাতের অন্ধকারে শপথ পাঠের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
এটি কমলনগরে ধারণ করা ভিডিও বলে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করছে কমলনগর থানা পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল ব্যক্তি একটি নির্জন জায়গায় রাতের অন্ধকারে মোবাইল ফোনের লাইট জালিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করছেন।
ওই শপথের সময় তাদের নিজেদেরকে কালকিনি ইউনিয়ন (কমলনগর উপজেলা) কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বলে পরিচয় দিতেও দেখা যায়।
তাদেরকে বলতে শোনা যায়, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন তারা। এছাড়াও দেশের সেবায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করার ঘোষণাও দেন তারা।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, শপথ বাক্য পাঠ শেষে- 'জয় বাংলা', 'জয় বঙ্গবন্ধু'সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় তাদের 'তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে'ও শ্লোগান দিতে শোনা যায়।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আমজাদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, ওই ভিডিওটি গত ২২শে এপ্রিল রাতের। ওই শপথের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণ যারা করেছিলেন তাদের সবাই কমলনগর উপজেলার কালকিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী।
মি. হোসেন জানান, মূলত গত ২৪শে এপ্রিল একটি নদীর পাড়ে ধারণকৃত ভিডিও হলেও গত সোমবার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই এটি নিয়ে নানা আলোচনা হয়।
ওই শপথ বাক্য যিনি পাঠ করেছেন তার সাথেও যোগাযোগ করা হয় বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে। তবে, তিনি এটি নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজী হননি।
কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "অন্ধকারের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে শপথ বাক্য পাঠ করার ভিডিওটি আমাদের নজরেও এসেছে। আমরা এটি যাচাই বাছাই করতেছি। যাচাই বাছাই শেষে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে"।
কক্সবাজারের আইনজীবীদের বিবৃতিতে কী আছে?
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার বরাবর একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে কক্সবাজার জেলার আইনজীবী সমিতির সদস্যরা।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির ১৭৩ জন আইনজীবী ওই যৌথ বিবৃতিতে সাক্ষর করেছেন।
বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেছেন, 'বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬' -এর মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী"।
বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ। কিন্তু নতুন এই আইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
এতে বলা হয়, 'আইনের যথাযথ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় বিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে তারা মনে করেন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাংলাদেশের বিচারিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর চরম আঘাত'।
ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য জুলকারনাইন জিল্লু। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশে আইনের দৃষ্টিতে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা চরম পদক্ষেপ। যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে রাজনৈতিক জটিলতা বাড়াবে। বিবৃতিটা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার একটা তাগিদ আরকি"।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, 'কোনো দলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বা সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ব্যতীত নিষিদ্ধ করা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন'।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ। কিন্তু সংসদে কালো আইন পাস হওয়ায় সেই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার অধিকারকে ক্ষুন্ন করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য রিদুয়ান আলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কেন ফেরানো উচিত তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও জাতিসংঘে এইসব জায়গায় গিয়েছে। আসলে সংগঠনের রাজনীতি করার যে অধিকার আছে সেই বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে"।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
কী বার্তা দিতে চাইছে আওয়ামী লীগ?
২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১১ই মে 'সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯' সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। যে কারণে চলতি বছরেরে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনের বিএনপি জয়লাভের পরদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনসহ কিছু কার্যক্রমও চালাতে দেখা গিয়েছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীদের।
দলটির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ হয়তো কিছু কার্যক্রমের সুযোগ পাবে।
কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, তেমনটা তো ঘটেইনি বরং বিএনপি সরকারের সময়ে এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিলও সংসদে পাস হয়ে গেছে।
এরপর গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় দলটির নেতাকর্মীদের মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতেও দেখা গেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বর্তমান সরকার ও এর আগের অন্তর্বর্তী সরকার দলের কার্যক্রমে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত যাই থাকুক আমরা আওয়ামী লীগ আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি"।
এই কার্যক্রমের পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারসহ আন্তর্জাতিক মহলেও তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি ও চিঠি পাঠিয়েছেন তারা।
বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চালালেও এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা খুব একটা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অনেক পুরনো রাজনৈতিক দল। তারা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ফলে তাদের তো ফিরে আসার প্রচেষ্টা থাকবেই খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সুযোগ দিবে কী-না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে"।
বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ, নাগরিক সমাজ কিংবা গণমাধ্যমের চাপের কারণেই সরকার চাইলেও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারবে না বলে তিনি মনে করেন।