'রাতে সুস্থ আছে কইয়া বাচ্চা ফেরত দিলো, ভোরে আর নাই'

ছবির উৎস, SCREEN GRAB
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"আমার বেবি দুইদিন আগে হইছে। রাতে সুস্থ আছে কইয়া বাচ্চা ফেরত দিলো, ভোরের দিকে আর নাই"।
একথা বলছিলেন ঢাকার আদ্–দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া একটি শিশুর বাবা শান্ত ইসলাম।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মি. ইসলাম জানান, ২৫শে মে তার কন্যা শিশুর জন্ম হয়, নাম রেখেছিলেন জান্নাতি।
হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা শিশু ও তার মায়ের সঙ্গে ছিলেন মি. ইসলামের মা। তিনি জানান, "আমার নাতিন কালকে সন্ধ্যারাতেও ভালো ছিল। রাত তিনডা বাজে, হঠাৎ করেই দেখি আমার নাতিন কাঁদতেছে। আর থামে না।"
ঢাকার আদ্–দ্বীন হাসপাতালে একসাথে কয়েকটি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। হাসপাতাল থেকে ছয়টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে।
তবে মৃত শিশুদের স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এই সংখ্যা আরো বেশি।
এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসায় অবহেলাসহ নানা অভিযোগ তুলছেন ভুক্তভোগীরা।
যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে গভীর রাতে একটি শিশুকে হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো জটিলতা না পাওয়ায় আবারও তাকে পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে ফেরত পাঠান চিকিৎসক।
"ভোররাতে ওই ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুই একসাথে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা দিয়েও তাদের আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি," বিবিসি বাংলাকে বলেন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন।
এদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যে ওয়ার্ডে শিশুদের রাখা হয়েছিল সেখানে এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন একজন মা। তবে সেই রুমটিতে বাতাস আসা-যাওয়ার বিকল্প আর কোনো পথ ছিল না বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেছেন,সেখানে "শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে।"

ছবির উৎস, SUMON
ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি বুধবার সকালে আলোচনায় আসে।
জানা গেছে, হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১১ জন মা, যাদের ছয়জনের সঙ্গে ছিল ছয়টি নবজাতক শিশু।
মৃত শিশুদের স্বজনদের অনেকেই বলছেন, গভীর রাত থেকেই ওই ওয়ার্ডে থাকা শিশুরা অসুস্থ হতে শুরু করে। একপর্যায়ে ভোরের দিকে শিশুগুলো বমি করা শুরু করলে চিকিৎসার তোড়জোড় শুরু হয়।
ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগীর স্বজন জানান, রাত তিনটার দিকে শুরুতে দুই শিশু বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে আবারও তাদের ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
কিন্তু ভোরের দিকে ওই ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশু একসাথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের সবাইকে আবারও এনআইসিইউতে নেওয়া শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কোনে হাসপাতালের এনআইসিইউ বা নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট হলো যেখানে সদ্যজাত অসুস্থ চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
মারা যাওয়া এক শিশুর অভিভাবক জানান, "রাতে হঠাৎ করেই দেখি আমার বেবি কান্না শুরু করছে। ভোরের দিকে ওয়ার্ডের চার পাঁচটা বাচ্চা একসাথে সমানে বমি করতেছে।"
হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থেকে গ্যাস লিকেজের কারণেই শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অনেক ভুক্তভোগী।
মারা যাওয়া এক শিশু অভিভাবক বলছেন, "পুরো ওয়ার্ডেই গ্যাসের বিকট গন্ধ ছিল। একসাথে সবগুলো বাচ্চা কান্না শুরু করছে।"

ছবির উৎস, SUMON
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনাকে 'দুর্ঘটনা' হিসেবেই বর্ণনা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তাদের দাবি, গভীর রাতে হঠাৎই দুই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ভোর নাগাদ ছয়জন শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলছেন, হাসপাতালের যে ওয়ার্ডে এই শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ১১ জন মা আর ছয়জন শিশু ভর্তি ছিলেন। নবজাতকদের বয়স এক অথবা দুই দিন বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, রাতে ওই ওয়ার্ডের এসি বন্ধ থাকায় শ্বাস নিতে সমস্যা হয়েছিল মারা যাওয়া এই শিশুদের।
"রাতে এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন একজন মা, হঠাৎ করে রাত তিনটার পরে দুইটি শিশু অসুস্থ হওয়ায় তাদেরকে নিউনেটাল আইসইউতে নেওয়া হয়েছিল," তিনি বলেন।
মিজ ইয়াসমিন বলছেন, "যেহেতু এটা এসি ওয়ার্ড, অনেক সময় ঠান্ডা লাগে। দায়িত্বরত নার্স যে ছিল, তাকে একজন মা বলেছিলেন এসি বন্ধ করার জন্য। এরকম আগেও হয়েছে, অনেক সময় এসি বন্ধ করে ফ্যান দেওয়া থাকে।"
রুমটিতে ভেন্টিলেশনে আরো কোনো ব্যবস্থা নেই বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেব্যাপারে অবশ্য তিনি কিছু জানাননি।
চিকিৎসকরা রাতেই অসুস্থ হয়ে পড়া শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছিলেন বলেও জানান মিজ ইয়াসমিন। তিনি বলছেন, শিশুদের অবস্থা ভালো থাকায় তাদের আবারও ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।
"ভোরের দিকে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে ছয়জন শিশুকে আবারও নিউ নেটাল আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পথেই দুই শিশুর মৃত্যু হয় এবং বাকি চারজনকে আইসিইউ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই চার শিশুকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি," বিবিসি বাংলাকে বলেন মিজ ইয়াসমিন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, চিকিৎসকরা সব ধরনের চেষ্টা করার পরও শিশুগুলোকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের মহাপরিচালক বলছেন, "এত দ্রুত ঘটনাটি ঘটেছে, আমরা আসলে ঠিকমতো দেখারও সুযোগ পাইনি। চিকিৎসকরা নিওনেটাল আইসিইউতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাচ্চাদের এতই শ্বাসকষ্ট ছিল যে তাদের বাঁচানো যায়নি।"
এছাড়া ওই ওয়ার্ডে আরও পাঁচটি নবজাতক ভর্তি ছিল বলে যে তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে যে, জন্মগ্রহণের সময় স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকায় অন্য পাঁচজন শিশু আগে থেকেই এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
"ওই ওয়ার্ডে ছয় জন শিশু এবং ১১ জন মা ছিলেন। বাকি পাঁচজন শিশু আগে থেকেই কোনো না কোনো কারণে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল, তারা ভালো আছে," বলে জানান হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন।

ছবির উৎস, SUMON
তদন্তে কমিটি গঠন
এক হাসপাতালে প্রায় একই সময়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তৈরি করেছে।
সকালেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এসময় হাসপাতালের যে ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটেছে সেখানে "শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি" পাওয়া গেছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, "ভোরবেলায় এই কক্ষে এসি–সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য যে-কোনো কারণে এখানে একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে।"
"আমরা দেখেছি, এসিটি এমনভাবে ছিল যে এটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসাধীন ছয়টি শিশুকে আমরা হারিয়েছি," বলেন তিনি।
এদিকে, এই ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
"তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত কোনো ত্রুটি, চিকিৎসা সেবায় অবহেলা কিংবা অবকাঠামোগত কোনো সমস্যা ছিল কি না, তা যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে কারিগরি বিশেষজ্ঞদেরও এই তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হবে," বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, জন্মের পর নবজাতকেরা সুস্থ ছিল। পরে পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গাফিলতি বা ত্রুটি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান মি. বিশ্বাস।
এদিকে, রমনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাহাত খান বিবিসি বাংলাকে জানান, আদ দ্বীন হাসপাতালের এই ঘটনায় বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
"হাসেপাতাল থেকে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে যে এসি বন্ধ থাকায় সাফোকেশনের কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি," বলেন তিনি।








