আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে এই ভুক্তভোগী' বলা ময়মনসিংহের নারী ব্যবসায়ী কারাগারে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে বিএনপি সরকার ও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর ময়মনসিংহে একজন নারী ব্যবসায়ীকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় একটি মার্কেটে সাথী আক্তার নামের এই ব্যবসায়ীর একটি পার্লার রয়েছে।
রোববার ফেসবুক লাইভে এসে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কারেন্টের তার চুরির কথা উল্লেখ করে "দেশে কেউ নিরাপদে নেই" বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিজ আক্তার।
একইসঙ্গে, ২০২৬ সালে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে, যেমন- চুরির ঘটনা বেড়েছে এমন কথাও বলেন তিনি।
একপর্যায়ে বলেন- "বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়ে এখন ভুক্তভোগী"।
এই লাইভের পর সাথী আক্তারের প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
পরে পুলিশ সাথী আক্তারকে হেফাজতে নেয়। এরপর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
ইতোমধ্যেই সোমবার আদালতে হাজির করার পর মিজ আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানান, সোমবার রাতে সাথী আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত তার জামিনের কোনো আবেদন আদালতে জমা পড়েনি।
আগামীকাল বুধবার এই মামলায় শুনানি হওয়ার দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান মি. রহমান।
প্রশ্ন হলো, সাথী আক্তারের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল? পুলিশ কেন তার বিরুদ্ধে মামলা দিলো? ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারাতেই বা কী বলা হয়েছে?
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
কেন ক্ষোভ নারী ব্যবসায়ীর?
ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজের বিউটি পার্লার থেকে রোববার ফেসবুকে দুটি লাইভ করেন সাথী আক্তার।
তার দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আনুমানিক ২৪ হাজার টাকা মূল্যের কারেন্টের তার চুরি হওয়ায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দুইটি ভিডিওতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার বাড়ি থেকে মোবাইল, সেন্ডেলসহ নানা জিনিস চুরি হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন মিজ সাথী।
একইসঙ্গে, তিনি বলেন, এই বছর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে "ভুক্তভোগী" হয়েছেন।
দুটি লাইভের একটি আট মিনিট নয় সেকেন্ড এবং আরেকটি পাঁচ মিনিট ২২ সেকেন্ডের।
একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, অনেক পরিশ্রম করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কিন্তু চুরি-ডাকাতির জন্য রাত হলে নিরাপদে থাকতে পারছেন না। শুধু ব্যবসায়ীরাই না, "দেশে এখন কেউই নিরাপদে নেই" বলেও লাইভে দাবি করেন সাথী আক্তার।
"এখন আমাদের কিছু করার নাই, ব্যবসায়ীদের কোনো নিরাপদ নাই। কোনো মানুষই নিরাপদ না এখন। এই ২৬ সালকেই মিন করে বলতাছি, ২৬ সালেই এতো কিছু ঘটনা ঘটলো," লাইভে বলছিলেন মিজ আক্তার।
আরেকটি লাইভ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, যে বুড়ো আঙ্গুলে একটি সেন্ডেল দিয়ে আঘাত করছেন তিনি।
এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, "জুতা দিয়া কপালে মারি। কারণ হইছে কি, এই ২৬ সালে আইসা আমাদের যে ভুক্তভোগী হইছি তা বলার মতো না। ২৬ সালে সরকাররে আমি এই হাত দিয়া ভোট দিছিলাম না, এই আঙ্গুলে বাইড়াই, এই যে এইরকম।"
"বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে এই ভুক্তভোগী" এই মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ২০২৬ সালের আগে কখনো এমন ভুক্তভোগী হননি।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের তার আবার লাগাতে মাসের শেষে কোথায় থেকে ২৪ হাজার টাকা পাবেন এমন অসহায়ত্বও প্রকাশ করেন মিজ আক্তার।
পরে রোববার রাতে তার প্রতিষ্ঠানের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে তার লাইভে বলা কথার প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে সাথী আক্তারের সঙ্গে তাদের বাদানুবাদও হয়।
পরে খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাথী আক্তারকে হেফাজতে রাখার জন্য থানায় নিয়ে যায়।
কী বলছে পুলিশ?
সাথী আক্তারের লাইভের ভিডিও দেখেছেন উল্লেখ করে ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, ওই ভিডিওর কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।
ভিডিওতে "সরকারবিরোধী কিছুই নাই, এটা তো বাকস্বাধীনতা," বলেন মি. ইসলাম।
মিজ আক্তারের ওই ভিডিও তাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে 'সরকারবিরোধী' বলে দেখতে বলা হয়েছিল বলে জানান ওসি মি. ইসলাম।
কারা ভিডিও পাঠিয়েছিল - এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "এলাকাবাসী"।
ওসি জাহিদুল ইসলাম জানান, মার্কেট মালিক সমিতি এবং স্থানীয় বেশ কয়েকজন সাথী আক্তারের সঙ্গে কথা বলতে তার পার্লারের সামনে যায়।
মি. ইসলাম দাবি করেন, "আসলে ভিডিওর জন্য তাকে ধরা হয় নাই। ভিডিওর জন্য ধরলে বিকেল বেলায়ই ধরা হইতো। উনাকে অ্যারেস্ট করা হইছে উনার আচরণের জন্য।"
"উনি ওই জায়গায় গিয়া পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করেছেন। লোকজনের সাথে যদি কথা বলতো দুই মিনিট, তাহলে কিন্তু ওই জায়গায় শেষ হয়ে যেত বিষয়টা, আমার যা ধারণা। তো ওইটা না করে উনি তাদের সাথে মারমুখী আচরণ করছেন এবং বারবার," দাবি করেন ওসি মি. ইসলাম।
"নতি স্বীকার করে নাই। নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসা, একটা নমনীয়তা দেখানো, সেটা করে নাই। যে কারণে জিনিসটা এতোদূর গড়াইছে" বলেন মি. ইসলাম।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, ব্যাপক সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে যাওয়ায় সড়ক অবরোধ এবং দোকান ভাঙচুর হবে এমন আশঙ্কায় সাথী আক্তারকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশ কেন তাকে রক্ষা করার বদলে তার বিরুদ্ধে ১৫১ ধারার মামলা দিয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "তাকে রক্ষা করা হইছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দিছি।"
"১৫১ টা হচ্ছে প্রতিরোধমূলক। অপরাধ সংগঠনের আগে যেটা ঘটতে পারে আরো। উনার এই আচরণের কারণে লোকজন আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিল এবং একপর্যায়ে আমার ধারণা ওই ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ এই ধরনের ঘটনা ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না," সাথী আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করার পক্ষে এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভালুকা মডেল থানার ওসি।
এদিকে, সাথী আক্তারের স্বামী আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে দুপুরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় শুনেই "রং নাম্বার" বলে লাইন কেটে দেন মি. খান।
১৫১ ধারায় কী বলা হয়েছে?
দ্য কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮, এর ১৫১ ধারাটি মূলত পুলিশ যাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে সেজন্য রাখা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকেই জানেন এবং তার যদি মনে হয় যে, ওই অপরাধ সংঘটন অন্য কোনো উপায়ে রোধ করা সম্ভব নয়, তাহলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বা পরোয়ানা ছাড়াই ওই অপরাধের পরিকল্পনাকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, "এই ঘটনার মধ্য দিয়ে খুব স্পষ্ট একটা বার্তা আসছে, সেটা হলো যে- মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অবারিত নয়, সে মতামত যদি হয় সরকারের বিপক্ষে।"
এদিকে, সাথী আক্তারকে তার লাইভের বলা কথার জন্য গ্রেফতার করা হয়নি বলে পুলিশ দাবি করলেও আইনজীবী মি. মোরসেদ মনে করছেন, এই ঘটনায় ওই নারী ভিকটিম হলেও তাকে রক্ষা না করে বরং তার বিরুদ্ধেই ১৫১ ধারায় মামলা করার অর্থ পুলিশ যে সরকারের পক্ষে কাজ করতে হবে এই বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
"এটা পুলিশেরও একটা অবস্থানটা ক্লিয়ার হলো যে পুলিশও এখন রাজনৈতিকভাবে যে সরকার যে দল ক্ষমতায় আছে, তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য খুব অ্যাকটিভলি তারা চেষ্টা করছে," বলেন এই আইনজীবী।
একইসঙ্গে, ময়মনসিংহের যে আদালত ১৫১ ধারার মামলায় ওই নারী ব্যবসায়ীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন সেই আদালতের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনজীবী।
যারা 'মব' করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং মিথ্যা মামলায় ওই নারীকে গ্রেফতার দেখিয়ে পুলিশ যে অবস্থান নিয়েছে সেটি "সম্পূর্ণ বেআইনি" বলে মনে করছেন তিনি।
"পুলিশের এই অ্যাকশনটা আল্টিমেটলি মবকারীদের পক্ষেই গেল। ওখানে তো পুলিশ গিয়ে প্রথমে দায়িত্ব হলো যারা মব করতে গেছে সবাইকে ধরবে, তাদেরকে থানায় নিয়ে যাবে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারো তোমরা কেন ওখানে গেছ?" বলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।