বেশি খাওয়া কীভাবে কমাতে পারি আমরা?

একটি মুখের ছবি, চারপাশে চিপস দিয়ে ভরা, যা স্ক্রিনের বাকি অংশ ঢেকে রেখেছে। তাদের মুখে একটি চিজবার্গার আছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮০-এর দশকে মানুষের খাবারের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে
    • Author, সারাহ বেল
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস গ্লোবাল হেলথ
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

প্লেটে উপচে পড়ছে নানা রকম খাবার- এরকম দৃশ্য বাড়ি বা রেস্তোরাঁয় বিরল কোনো ঘটনা নয়। গত ৫০ বছর ধরে বিশ্বের কিছু এলাকায় মানুষের পাতে খাবারের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে –একই সঙ্গে বেড়েছে স্থূলতার হারও।

কিন্তু লোভনীয় সব খাবার আর বিকাশমান খাদ্যশিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কীভাবে নিশ্চিত করতে পারি যে আমরা সুস্থ থাকব এবং অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকব?

এই পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয় যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ১৯৮০-এর দশক থেকে খাবারের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। বাড়ির বাইরে খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে এটা ঘটে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ড. লিসা ইয়ং 'দ্য ফুড চেইন' অনুষ্ঠানকে বলেন, "যদি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান, ধরা যাক একটি পাস্তার দোকান, ছোট পাত্রে বা কম পরিমাণে পাস্তা বিক্রি করে, আর অন্য একটি প্রতিষ্ঠান যদি তার থেকে বড় পরিমাণ দেয়, তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বড় পরিমাণ দেওয়া জায়গাটিতেই যেতে চাইবে।"

তিনি ব্যাখ্যা করেন, "খাবার তখন খুবই সস্তা ছিল। আর যখন খাবার সস্তা হয়, তখন উৎপাদকদের জন্য আপনাকে দ্বিগুণ পরিমাণ দিয়ে সামান্য বেশি দাম নেওয়াটা লাভজনক হয়ে ওঠে। তখন আপনার মনে হয় আপনি ভালো একটা অফার পাচ্ছেন। আর এর মাধ্যমে তারাও বেশি লাভ করছে।"

সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মার্লে আলভারেঙ্গা বলেন, ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, "এটা মূলত প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে ঘটে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন ভাত-ডাল-আটা বা মাছের ক্ষেত্রে বড় পরিমাণ আপনি তেমন দেখবেন না।"

ড. ইয়ং ব্যাখ্যা করেন, এর প্রধান কারণ হচ্ছে খাদ্যব্যবস্থার 'আমেরিকানাইজেশন' বা আমেরিকান ধাঁচে পরিবর্তন।

তিনি বলেন, "ম্যাকডোনাল্ডস বা নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্ডি বারের মতো আমেরিকান ধরনের খাবার যখন অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেসব খাবারের আকার-আয়তনও বড় হতে শুরু করে। আর অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে আপনি অতিরিক্ত ৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারেন।"

একজন নারী একটি বাটি নুডলস খাচ্ছেন। তিনি পেছনের দিকে সামান্য ঝাপসা অবস্থায় আছেন, হাসছেন, লম্বা বাদামী চুল। তিনি চপস্টিক দিয়ে নুডলস তুলছেন, আর নুডলস একটি বড় ক্রিম রঙের বাটিতে রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একসময় মনে করা হতো যে ছোট প্লেট ব্যবহার করাই এর সহজ সমাধান

বেশি পরিবেশন করা মানেই কি বেশি খাওয়া?

আমরা যে মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছি, তার মতে গবেষণায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে দেখা গেছে- বড় পরিমাণে খাবার পরিবেশন করা হলে মানুষ বেশি খায়।

এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাবারের পরিমাণ দ্বিগুণ হলে মানুষ প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি খায়।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের অধ্যাপক লেনি ভার্টানিয়ান বলেন, "মানুষ সবসময় প্লেটে থাকা সব খাবার শেষ করে এমন নয়। তবে আমরা জানি, পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট খাওয়ার পরিমাণও বাড়ে।"

তিনি বলেন, সমস্যার একটি বড় অংশ হলো- কতটা খাওয়া উচিত তা বোঝা কঠিন, কারণ আমাদের দেহের অনুভূতি সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। আর অনিশ্চিত অবস্থায় আমরা পরিমাণকে নির্দেশক হিসেবে অনুসরণ করি।

তিনি বলেন, "আমরা সাধারণত খুব বেশি ক্ষুধার্ত বা খুব বেশি তৃপ্ত - এই দুই অবস্থার কোনোটাতেই থাকি না। মাঝামাঝি এই অবস্থায় আমরা নানা সংকেতের দ্বারা প্রভাবিত হই।"

ছোট প্লেট ব্যবহার করলে কি উপকার হবে?

একসময় মনে করা হতো- ছোট প্লেট ব্যবহার করাই সহজ সমাধান হতে পারে। এতে কম খাবার রাখা যায় এবং চোখে বেশি মনে হয়, ফলে মানুষ কম খেতে পারে।

কিন্তু গবেষণায় এই ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক ভার্টানিয়ান বলেন, "শুধু প্লেটের আকার মানুষের খাদ্য গ্রহণে প্রভাব ফেলে না। আসল বিষয় হলো অতিরিক্ত খাবার সহজলভ্য কি না।"

এর অর্থ, পাশেই যদি খাবার রাখা থাকে, মানুষ নিজের প্লেট যাই হোক না কেন, ইচ্ছা হলে আরও খাবার তুলে নেবে।

তিনি বলেন, তাই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিবেশন করে বাকি খাবার চোখের আড়ালে সরিয়ে রাখা উচিত।

"এভাবে রাখুন যেন আপনি দ্বিতীয়বার নেওয়ার সুযোগ না পান," তিনি বলেন।

ওপর থেকে তোলা একটি ছবি, যেখানে একটি কাঠের টেবিলে বিভিন্ন আকারের থালা-বাটিতে বিভিন্ন খাবার সাজানো আছে, এবং কয়েকজন মানুষের হাত চপস্টিক দিয়ে খাবার নিচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কতটুকু খাচ্ছেন সেব্যাপারে সবাইকে আরো সতর্ক হতে বলেন বিশেষজ্ঞরা

কীভাবে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে সবচেয়ে বেশি যা করতে হবে তা হলো নিজেদের ক্ষুধা অনুভব করা এবং কী খাচ্ছেন সে বিষয়ে সচেতন হওয়া।

ডা. লিসা ইয়াং বলেন, "মানুষ তাদের প্লেটে কী আছে সেদিকে মনোযোগ দেয় না। তারা নিজের ক্ষুধার দিকে খেয়াল করে না। তারা তৃপ্ত হয়েছে কি না সেটাও লক্ষ্য করে না।"

"পোর্শন ডিস্টরশন" বা পরিমাণগত বিকৃতি - এটিও মানুষের জানা উচিত। বড় পরিমাণ সহজলভ্য হলে মানুষ সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।

ডা. মার্লে আলভারেঙ্গা বলেন, "আমার পরামর্শ হলো, মনোযোগ দিন। লেবেল দেখুন, আকার দেখুন। শিল্প প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিপণন করছে তা বোঝার চেষ্টা করুন।"

Skip বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: and continue readingবিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

একজন নারী এক হাতে একটি বক্সে ছয়টি ডিম এবং অন্য বক্সে মোবাইল ধরে আছেন। মোবাইলে কয়েকটি সবজির পুষ্টিগুণ দেখাচ্ছে। সামনে একটি বাক্সে কিছু শাকসবজি রাখা। ছবিটি নারীর পেছন দিক থেকে তোলা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কী খাচ্ছি ও কতটুকু খাচ্ছি তাতে মনোযোগ দেওয়া উচিত

স্ন্যাকসের ক্ষেত্রে কী করবেন?

ডা. ইয়াং বলেন, "আপনি যদি আপেল বা অন্য ফলের মতো প্রাকৃতিক খাবার খান, যা প্যাকেটজাত নয়, তাহলে কতটা খান তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ এগুলো স্বাস্থ্যকর।"

তবে যদি প্যাকেটজাত কিছু খান, সেখানে সাধারণত একটি মানসম্মত পরিবেশনের পরিমাণ উল্লেখ থাকে - যেমন একটি প্যাকেটে চার জনের জন্য পরিবেশন উপযোগী খাবার থাকতে পারে।

আপনার উচিত প্যাকেট থেকে খাবার বের করে দেখে নেওয়া- এটি দেখতে কেমন এবং আপনি আসলে কতটা খাচ্ছেন।

তিনি বলেন, "মানুষ বলে, 'আমি সকালে ছোট এক বাটি সিরিয়াল (শস্যদানা জাতীয় একটি খাবার) খাই'। কিন্তু যখন তাদের বলা হয় তারা যতটা খায় তা ঢেলে দেখাতে এবং সেটি লেবেলে দেওয়া মানসম্মত পরিমাণের সঙ্গে তুলনা করতে - তখন দেখা যায় তারা তিনগুণ বেশি খাচ্ছে।"

তিনি বলেন, "লেবেলে দেওয়া পরিমাণ অনুযায়ী খাবার ঢালুন এবং চোখে মাপুন। তারপর ভাবুন আপনার প্লেট বা বাটিতে আসলে কত কাপ পরিমাণ খাবার রয়েছে - এটি সহায়ক হবে।"