রসে ভরপুর আখের নাম 'ব্ল্যাক রুবি', এর বৈশিষ্ট্য কী

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশে আখের একটি জাতকে চলতি বছরেই 'ব্ল্যাক রুবি' নামে অনুমোদন দিয়ে বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করেছে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট বা বিএসআরআই। এটি দেশের কোনো কোনো এলাকায় ফিলিপাইন জাতের 'ব্ল্যাক সুগারকেইন' নামেও পরিচিত।

বিএসআরআই-এর প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ মোঃ আনিছুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, পুষ্টিতে সমৃদ্ধ, চিবোতে আরাম ও প্রাকৃতিক চিনির মাত্রা তুলনামূলক কম থাকা এই আখের জাতটিকে বহু বছরের গবেষণার পর চলতি বছরের মার্চে অবমুক্ত করেছেন তারা।

যদিও সরকারিভাবে রিলিজ দেওয়ার আগেই গত কয়েকবছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন হতে দেখা যাচ্ছে এবং আখের এই জাতটি চাষের জন্য কৃষকদের মধ্যে আগ্রহও বাড়ছে।

বাংলাদেশের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, আখ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল এবং এটি দণ্ডাকৃতির ডাল পালাহীন একবর্ষ বা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ।

দেশের প্রতিটি জেলাতেই কিছু না কিছু আখের চাষ হয়, তবে জলবায়ুর প্রভাব অনুযায়ী দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো আখ চাষের জন্য উপযোগী।

সরকারি হিসেবে, বাংলাদেশে গত অর্থবছরে আখের উৎপাদন ছিল প্রায় ২১ লাখ টন।

নাম কেন ব্ল্যাক রুবি

সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট বা বিএসআরআই এ পর্যন্ত আখের মোট ৪৯টি জাত অবমুক্ত করেছে এর মধ্যে সবশেষ বিএসআরআই আখ ৪৯, যা ব্ল্যাক সুগারকেইন বা কালো আখ নামে পরিচিত।

"তবে যখন কোনো নতুন জাত রিলিজ বা অবমুক্ত করা হয় তখন সেটির জন্য জনপ্রিয় হতে পারে এমন কোনো নাম তারা নির্বাচন করার চেষ্টা করেন। আমরা আখের এই জাতটি রিলিজের সময় নাম দিয়েছিলাম ব্ল্যাক রুবি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন আনিছুর রহমান।

কিন্তু ব্ল্যাক রুবি নামকরণের কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, "নামটা পপুলার হবে আর এই আখের কালারটা অনেকটা ডিপ পার্পল। সব মিলিয়ে এই নামেই রিলিজ হলো"।

তবে অনেকের কাছে এটি ফিলিপাইন জাতের কালো আখ হিসেবেও পরিচিত।

এর বৈশিষ্ট্য কেমন

ডঃ আনিছুর রহমান বলেন, আখের এই জাতটি রসালো, নরম ও চিবোতে খুব মজার। এছাড়া আখের রসে প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ যে পরিমাণ থাকলে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সমস্যা হতে পারে এই জাতে তার পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম।

তিনি বলেন, আখের ক্ষেত্রে জিআই ডায়াবেটিক ইনডিকেটর হিসেবে কাজ করে । এখানে ৫০এর বেশি হলে সুগার বেড়ে যায়। এই নতুন জাতের আখে জিআই হলো ৪০। এর আঁশ বা ফাইবার কনটেন্টও খুবই ভালো।

"দাঁত দিয়ে চিবানো খুবই সহজ। এমনকি গিটসহ এটি চিবিয়ে খাওয়া যায়। আবার ক্যালসিয়াম, জিংক ও আয়রনের পরিমাণও প্রচলিত অন্য যে কোনো জাতের আখের চেয়ে বেশি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. রহমান।

তিনি বলেন, এর জুস বাজারজাত করা গেলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে তারা মনে করছেন। আর বাসায় এর রস জুস আকারে খেলেও সেটি খুবই স্বাস্থ্যসম্মত হবে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই জাতের আখ অল্প সময়ের ভিতরেও কাটার উপযোগী হয় এবং ১০/১১ মাসেই এটি ১৬-১৮ ফিট লম্বা হয়ে যায়। এই আখ যথেষ্ট মোটা এবং এতে রসের পরিমাণ বেশি। অন্য কিছুর সাথে বেঁধে রাখতে হয়।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আখ গাছের গাছের পাতা কিছুটা ভুট্টার পাতার ন্যায় তবে অধিকতর শক্ত ও খাড়া, সুচালো ও কিনারা ধারযুক্ত।

আখদন্ড উচ্চতায় ১.৮৫-৩.৭২ মিটার পর্যন্ত এমনকি ৯.৩ মিটার পর্যন্ত হয়। দণ্ডের কোনোটি নরম এবং কোনোটি শক্ত, তবে সব দণ্ডই গিঁটযুক্ত।

আখ দণ্ড গিঁটযুক্ত এবং এর কোনোটি হালকা বেগুনি, কোনোটি সবুজ ও কোনোটি হলদে সবুজ রংয়ের হয়ে থাকে।

বাজারে যে আখগুলো আমরা দেখতে পাই সেগুলা সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ ফিট বা তার একটু বেশি হয়ে থাকে, কিন্তু ব্ল্যাক রুবি জাতের আখের উচ্চতা প্রায় দ্বিগুণ হয় ।

কীভাবে এলো এই জাত

দেখতে কিছু হালকা কালো ধরনের বলে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ হিসেবে এর পরিচিতি আছে কোনো কোনো জায়গায়। কিন্তু কেন এটি ফিলিপাইনের জাত হিসেবে পরিচিত পেল তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

ডঃ আনিছুর রহমান বলছেন, তারা সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট বা বিএসআরআইতে গবেষণার জন্য ৮/৯ বছর আগে সাভারের একটি নার্সারি থেকে এই আখের জাত সংগ্রহ করেছিলেন।

"এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তারিত গবেষণা, প্রদর্শনী চাষাবাদ, কৃষকদের মাধ্যমে চাষসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে আমরা ব্ল্যাক রুবি নাম দিয়ে এটি রিলিজ করেছি," বলছিলেন মি. রহমান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচারের সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি বলছেন, ফিলিপাইন আখ নামে পরিচিত এই আখের জাতের মতো আর কোনো আখ বাংলাদেশে নেই, যা খুবই মিষ্টি ও দুর্দান্ত।

"চুয়াডাঙ্গায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সময় ২০১৮ সালে ঢাকার বৃক্ষ মেলা থেকে এর সন্ধান পেয়ে সংগ্রহ করেছিলাম। পরে আমরা এটি সংগ্রহ করে কৃষকদের ট্রায়াল দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এর মধ্যে একজন কৃষক খুবই সফল হয়েছিলেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তালহা জুবাইর মাসরুর জানান, তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের একজন বিজ্ঞানী ফিলিপাইনে পিএইচডি করে ফিরে আসার সময় আখের এই জাতটি নিয়ে আসেন ও গাজীপুরের একটি নার্সারিকে দেন।

মূলত সেখান থেকেই এটি ছড়ায় ও পরে সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট বা বিএসআরআই এর বিজ্ঞানীদের কাছে আসে।