রিপাবলিকানরা এত বাজেভাবে হারার পাঁচটি কারণ

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জেইক লাফাম
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বিপুল বিজয় পেয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
যদিও মধ্যবর্তী এই নির্বাচনগুলোয় বরাবরই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের খারাপ সময় যায়, তবে এবার রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়কে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের একটি জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ ভোটার থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে আসা পর্যন্ত- এখানে পাঁচটি কারণ তুলে ধরা হলো, যার জন্য রিপাবলিকানরা এতগুলো আসনে হেরেছে।
১. বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়
যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ভোটাররা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোয় মাঠ পর্যায়ে সেই ক্ষোভ ছিল সুস্পষ্ট।
"গ্যাসের দাম, মুদিপণ্যের দাম, সবকিছুরই দাম বাড়ছে," নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার একজন ভোটার বিবিসিকে বলেন। তিনি আরও জানান যে, এই নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকানদের বদলে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।
সব ধরনের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দাম ৩.৭ শতাংশ বেড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য সেপ্টেম্বরে রেকর্ড করা প্রতি গ্যালন ৬.৫২ ডলার (৪.৮৩ পাউন্ড)-এর সামান্য নিচে ছিল।
ভোটার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দশজনের মধ্যে আটজন ভোটার (৭৯ শতাংশ) বলেছেন যে গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতির কারণে তারা ও তাদের পরিবার গুরুতর বা মাঝারি ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
আর দশজনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি উত্তরদাতা এর জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন এবং বলেছেন যে, তাদের মতে প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দাম বেড়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
২. অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ।
এর প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, যা বিশ্বের তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
সেই সময় থেকেই মার্কিন ভোটারদের পেট্রোল পাম্পে এর মূল্য দিতে হচ্ছে।
যুদ্ধটি অধিকাংশ আমেরিকানদের কাছে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাগা রিপাবলিকানদের কাছেও এটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নির্বাচনী কর্মসূচির একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মতো মনে হয়েছে, যেখানে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে আর কোনো যুদ্ধ হবে না।
একটি ভোটার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় দশজনের মধ্যে ছয়জন (৬৩%) বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে, তিন-চতুর্থাংশ ভোটার (৭৪%) বলেছেন যে, কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সংঘাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান কারণ ছিল।
নির্বাচনের পরের দিন সকালে ট্রাম্প পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করলেও ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

ছবির উৎস, Getty Images
৩. ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে সুশৃঙ্খল বার্তা
ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এই ঢেউয়ের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে কিছু শক্তিশালী প্রার্থীর কারণে, যারা বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোয় নিজেদের খাঁটি ও আন্তরিক প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
তারা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ সম্পর্কে একটি সুশৃঙ্খল বার্তা বজায় রেখেছিলেন।
প্রাক্তন শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টনও তাদের বিশ্বাস নিয়ে এমনভাবে কথা বলেছেন যা যথাক্রমে টেক্সাস ও কানসাসে মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুস অপ্রত্যাশিতভাবে জয়লাভ করেছেন। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ভার বহনযোগ্য করার যেসব আশ্বাস দিয়েছেন তা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, কারণ দেশটির অনেকেই এই ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করে।
সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদ, যিনি মিশিগানে সেনেটর হিসেবে জয়ী হয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রেখেছিলেন, তিনি "রাজনীতি থেকে অর্থ দূর করুন, অর্থ আপনার পকেটে আনুন"- এই স্লোগানটিকে মূল ভিত্তি করেছিলেন।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর জন অসফ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দুর্নীতিকে তার মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। যে রাজ্যে ট্রাম্প দুবার জয়ী হয়েছেন, সেখানে ৩৯ বছর বয়সী এই নেতার সহজ জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুজবকে আরও উসকে দেবে।
এমনকি ট্রাম্প নিজেও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করে ফক্স নিউজকে বলেছেন যে তারা "ভালো কাজ করেছে"।
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী দুর্বল প্রচারণার জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন, যেগুলোতে ভোটারদের উদ্বেগের ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
৪. ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা রিপাবলিকানদের জন্য একটি বোঝা
যেসব বিষয় নিয়ে ভোটাররা সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন, যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ, তার মধ্যে দুটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল, যার ফলে ২০২৪ সালে তাকে সমর্থনকারী কয়েকটি রাজ্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
তিনি তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় ভোটারদের কল্পনা করতে অনুরোধ করেন যে, ব্যালটে তিনিই আছেন।
কিন্তু মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এক দশকেরও বেশি সময় থাকার পর, কেউ কেউ এই ফলাফলকে ট্রাম্পের পরিচিতির জৌলুস কমে আসার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে, নিজেকে রিপাবলিকান প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং মনে হচ্ছে তা হিতে বিপরীত হয়েছে।
ভোটের আগের মাসগুলোতে জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, অনেক আমেরিকান চেয়েছিলেন ট্রাম্প যেন আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দেন।
সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে তার শেষ নির্বাচনী ভাষণে তিনি তার পেছনের রিফ্লেক্টিং পুলের বিতর্কিত সংস্কার প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিতভাবে কথা বলেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মত পরিবর্তন আবার
দুই বছর আগে কিছু হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া ট্রাম্পকে একটি নির্ণায়ক জয় পেতে সাহায্য করেছিল। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরিস্থিতিটা উল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর অবস্থিত প্রধানত হিস্পানিক অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় ডিসট্রিক্টগুলোয় ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের তিনটি আসনেই জয়লাভ করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলো রিপাবলিকান সেনেট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ২২ শতাংশেরও বেশি ভোট দিয়েছে।
দেশের অন্য যেকোনো প্রধান জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর তুলনায় এই পরিবর্তন বেশি, বলেছেন তথ্য প্রতিবেদক জেফ অ্যাডেলসন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের মধ্যেই এই পরিবর্তনটি এসেছে, যেখানে অধিকাংশ (৫৬ শতাংশ) আমেরিকান আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।
কৃষ্ণাঙ্গ-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোও সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকেছে।
মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচন অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো রাজ্যের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সংখ্যা সর্বাধিক, প্রায় ৩৭ শতাংশ।
যদি স্কট কলোম জিততে পারেন, তাহলে তিনি ১৯৮২ সালের পর মিসিসিপি থেকে সেনেটে নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাট হবেন।









