আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইসরায়েলে আজ নির্বাচন, নেতানিয়াহুকে হটানোই বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য
- Author, টম বেনেট
- Reporting from, জেরুজালেম
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ইসরায়েলের আজ জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে যাচ্ছেন, যেটিকে অনেকেই দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখছেন।
বলা হচ্ছে, এ নির্বাচনে পাঁচ লাখ মানুষ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, এবং অভাবনীয়ভাবে দেশটির ৭০ হাজার মানুষ কেবল ভোট দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।
শুক্রবার প্রকাশিত জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট প্রায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছেন।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন এ দুইজনের কোন রাজনৈতিক জোটই পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না।
এর অর্থ হচ্ছে, সামনে কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলতে পারে দেশটিতে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার কারণে দেশটির সরকার বরাবরই জোট সরকার হয়ে থাকে - এবং ক্ষমতা দখলের এ দৌড় অপ্রত্যাশিত ও নতুন জোট তৈরি করতে পারে, যা অতীতে করেওছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
কিন্তু এ নির্বাচনটি বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে - এবং পক্ষগুলোর মধ্যে সীমারেখা ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।
নবগঠিত ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকোট তথাকথিত 'পরিবর্তন জোট' - এর প্রধান মুখ। এ জোটটি এমন কয়েকটি দলের সমষ্টি যাদের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের লক্ষ্য।
এ জোটের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও আভিগডর লিবারম্যান, দুইজনই ডানপন্থী এবং নিরাপত্তা বিষয়ে কট্টরপন্থী। এছাড়াও এ জোটে আছেন বামপন্থী সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান।
ইসরায়েলি রাজনীতির দিকপাল এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, যিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন, এবার তার ক্ষমতায় ফেরা নির্ভর করবে উগ্র-ডানপন্থী এবং অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর সাথে আরেকটি জোট গঠনের ওপর, যে দলগুলো নিয়ে তার বর্তমান শাসক জোট গঠিত।
বলা হয়ে থাকে, এটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী জোট।
দুটি আরব দলীয় জোটও রয়েছে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, কারণ ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব, যাদের অনেকেই নিজেদেরকে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
তাত্ত্বিকভাবে, তারাই নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে।
যদিও প্রধান ইহুদি দলগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সবাই তাদের সাথে একত্রে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় (জিএমটি রাতে আটটায়) ইসরায়েলি সম্প্রচার মাধ্যমগুলো এক্সিট পোল প্রকাশ করবে।
এগুলো ভোটের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেবে, কিন্তু এতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে।
সারাদেশে ইসরায়েলিরা ফলাফল আসতে দেখার জন্য জড়ো হবে। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জেরুজালেমে এবং মাত্র গত বছর গঠিত আইজেনকোটের ইয়াশার তেল আবিবে সমাবেশ করবে।
নিরাপত্তার বিষয়টিই এ নির্বাচনে প্রচারণার মূল ইস্যু হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে।
বিরোধী জোট সাতই অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের নেতৃত্বে চালানো নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করছে, যে হামলায় প্রায় ১,২০০ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছিলেন, এবং ২৫১ জনকে জিম্মি হিসেবে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
বিরোধীরা ওই হামলার তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যার বিরোধিতা করে আসছেন এ কারণে যে সেটি তার বিরুদ্ধে যেতে পারে।
বিরোধী জোট নেতানিয়াহুর অধীনে দেশটির গণতন্ত্র হুমকির মুখে বলে মনে করে।
এছাড়া নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একটি মামলা চলমান রয়েছে, যদিও তিনি সে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, নেতানিয়াহু এখনও বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন, যা নিয়ে সাতই অক্টোবরের হামলার আগে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।
তবে, বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও, নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলিতে কৌশলগত বিজয় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে আবারও নিজেকে "নিরাপত্তার রাজা" হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রবিবার, ইসরায়েলের চ্যানেল টুয়েলভ জানায় যে, নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তে এমন সামরিক পদক্ষেপের জন্য চাপ দিয়েছিলেন যা ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারতো।
কিন্তু তার নিজের সামরিক প্রধান ইয়াল জামির এর বিরোধিতা করেন। পরদিন, সিএনএন জানায় যে তিনি ট্রাম্পকেও ইরানের ওপর নতুন হামলা চালানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।
নেতানিয়াহু উভয় প্রতিবেদনই অস্বীকার করেছেন।
তিনি তার প্রচারণার শেষ সময়ে তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা বর্ষণের একটি এআই-নির্মিত ছবি পোস্ট করে এবং এ বলে সতর্ক করে দিয়ে শিরোনামে আসেন যে, 'যদি ইরানিরা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে' তবে তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ইসরায়েলকে রক্ষা করতে পারেন।
আইজেনকোট তাকে "উন্মাদ" বলে অভিহিত করেছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা। নেতানিয়াহুর সরকার সুপ্রিম কোর্টের সেই রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে পূর্ণকালীন ধর্মীয় অধ্যয়নে নিয়োজিত অতি-গোঁড়া ইহুদি পুরুষদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ করতে হবে।
এটি একটি অত্যন্ত বিভাজনমূলক পদক্ষেপ, কারণ সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে আরও হাজার হাজার মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে লড়াই করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে।
গাজার বিষয়ে আইজেনকোট নেতানিয়াহুর প্রায় অনুরূপ অবস্থান নিয়েছেন এবং একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে সামরিক উপায়ে ১৮ মাসের মধ্যে ওই অঞ্চলে হামাস শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গত বছর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই ওই অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং বলছে যে তারা হামাস কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করছে।
আইজেনকোট অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে মূলত সমর্থন করেন—যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ—কিন্তু তিনি উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চান, যাদের হামলা জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য চূড়ান্ত ইসরায়েলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে "স্বায়ত্তশাসন বা রাষ্ট্র-বিহীন" পরিস্থিতি তৈরির কথাও বলেছেন।
দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান—অর্থাৎ ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতি থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে।
যদিও কেউ কেউ অনুমান করছেন যে আরব দলগুলো শেষ পর্যন্ত আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জোগাতে পারে, কিন্তু দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সদস্য লিবারম্যান এই ধরনের কোনো ব্যবস্থার অংশ হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
এই ধরনের রেডলাইনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল – তবে ফলাফল হাতে আসার পর কী ধরনের ছাড়, সমঝোতা এবং মত পরিবর্তন হতে পারে, তা এখনও দেখার বিষয়।
লক্ষ লক্ষ ইসরায়েলি সৈন্য এবং রিজার্ভ সেনাও ভোট দেবেন, কিন্তু সে ভোটগুলোর বেশির ভাগেরই গণনা বুধবারের আগে শুরু হবে না, যার অর্থ হলো, ডানপন্থী দলগুলোর জন্য শেষ মুহূর্তে একটি সুফল আসতে পারে।
কারণ মনে করা হয় যে এই জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
যদিও এটিকে প্রায়শই আইজেনকোট এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি দ্বিতীয় দফা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়, তবে অন্য কোনো নেতার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাও রয়েছে, যদি তিনি শীর্ষ পদটি না পাওয়া পর্যন্ত জোট সরকারের প্রতি তাঁর দলের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন।
অনেকের কাছেই একটি ভীতিকর পরিণতি হলো রাজনৈতিক অচলাবস্থা, যেখানে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না এবং সংখ্যালঘু সরকারও গঠন করা যাবে না।
সেই পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচন আহ্বান করা হবে এবং নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকবেন।
ইসরায়েলে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি পৃথক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কারণ দলগুলো বারবার সহযোগিতা করতে হিমশিম খেয়েছে।