রেকর্ড ২৫০ দিন সমুদ্রে থাকার পর থাইল্যান্ডের পাতায়ায় ভিড়ল মার্কিন বিমানবাহী রণতরী

    • Author, জোনাথন হেড
    • Role, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সংবাদদাতা
    • Reporting from, Pattaya, Thailand
  • Published
  • পড়ার সময়: ৩ মিনিট

কোনও বন্দরে না থেমে রেকর্ড ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থাইল্যান্ডে নোঙর করেছে, ফলে এর প্রায় পাঁচ হাজার নাবিকের জন্য মিলেছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সুযোগ।

জাহাজটি নোঙর করেছে সমুদ্রসৈকত-নগরী পাতায়ার কাছাকাছি, যা তার উচ্ছৃঙ্খল রাত্রিজীবন ও যৌন পর্যটনের জন্য পরিচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শক্তিশালী ঐতিহাসিক স্মৃতিও।

ক্লান্ত নাবিকরা যখন শহরের বার ও রেস্টুরেন্টগুলোতে প্রবেশ করবেন, তখন তারা আক্ষরিক অর্থেই সেই পথেই হাঁটবেন যেদিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্রাম ও অবকাশ যাপন (R&R) করতে আসা লক্ষাধিক মার্কিন সেনা হেঁটেছিলেন।

তাদের হাত ধরেই একটি শান্ত জেলেপল্লি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও ব্যস্ততম পার্টি শহরগুলোর একটিতে রূপ নেয়।

আজ সমুদ্রসৈকতের দিকে নেমে যাওয়া নিয়ন আলোয় আলোকিত গলিগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক শান্ত।

শহরের বিখ্যাত ওয়াকিং স্ট্রিটের বারগুলো এখনও দেয়ালে পোল ড্যান্স করা নারীদের ভিডিও দেখাচ্ছে, গ্রাহকদের ভেতরে টানার চেষ্টায়।

কিন্তু সেই গ্রাহকের সংখ্যা খুব বেশি নয়, আর তাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা পারিবারিক দল, যারা গো-গো বারের চেয়ে তুর্কি আইসক্রিম বিক্রেতার প্রতি বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়।

ইরান যুদ্ধ, যা পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয়ে প্রভাব ফেলেছে, এখানকার ব্যবসাগুলোকে কঠিনভাবে আঘাত করেছে।

সমুদ্রে থাকার কারণে টানা নয় মাসের বেতন খরচ না করা হাজার হাজার মার্কিন নাবিকের আগমন স্থানীয় ব্যবসাগুলোর জন্য একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।

গত নভেম্বরে মার্কিন রণতরীটি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে ছয় মাসের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে।

তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর জাহাজটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়।

সম্প্রতি কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য নাবিকদের মধ্যে খাবারের ঘাটতি, নষ্ট শৌচাগার এবং মানসিক চাপ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে যে কাজের পরিবেশ কঠিন ছিল, তবে তারা বলেছে নাবিকরা পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছেন।

তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে পাতায়ায় রণতরীটির নোঙর করা নিয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাব দিতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত মিত্র এবং মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের বন্দর সফর এখানে পরিচিত ঘটনা।

তবে ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর সম্ভবত এই প্রথম কোনও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি এত বড় সংখ্যক মার্কিন সামরিক সদস্য পাতায়ায় এলেন।

"এই সফরই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় আশা," বলেন ওয়াকিং স্ট্রিটের কাছে রত্ন বিক্রি করা দোকান মালিক অনন সাইতির।

তার দোকানে মার্কিন নাবিক ও মেরিনদের স্বাগত জানিয়ে বড় একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে এবং তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

"হারানোর কিছু নেই আমাদের। আমরা শুধু আশা করছি তারা এখানে কিছু অর্থ ব্যয় করবেন।"

তবে মার্কিন ও থাই কর্মকর্তারা চেষ্টা করছেন যাতে এই সফরটি এমনভাবে সম্পন্ন হয়, যাতে পাতায়াকে ঘিরে পরিচিত কুরুচিপূর্ণ শিরোনাম তৈরি না হয়।

থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকটি স্থানে মার্কিন নারী ও পুরুষ সেনাসদস্যদের যেতে দেওয়া হবে না।

এর একটি হলো সোই ৬, যা প্রধান সমুদ্রসৈকতের দিকে নেমে গেছে এবং উসকানিমূলক গো-গো বারের ঘনত্বের জন্য পরিচিত।

থাই পুলিশ মার্কিন অতিথিদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে থাইল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি আইনত অবৈধ।

তবে ধারণা করা হয়, শহরটিতে প্রকৃতপক্ষে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার যৌনকর্মী রয়েছেন।

তাদের অনেকেই সোই ৬ এলাকায় কাজ করেন, যেখানে তারা বারের বাইরে দাঁড়িয়ে পুরুষদের ভেতরে আসার অনুরোধ জানান।

পাতায়ার অসংখ্য গাঁজার দোকানও মার্কিন নাবিকদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। একই সঙ্গে প্যারাগ্লাইডিং ও জেট-স্কির মতো সমুদ্রভিত্তিক বিনোদন কার্যক্রমও তাদের জন্য নিষিদ্ধ।

"এটা তাদের সিদ্ধান্ত," বিবিসিকে বলেন মেয়র পরামাসে নগামপিচেতস।

"মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।"

রণতরীটি থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বন্দর থেকে পাতায়া শহরে যাতায়াতের জন্য শাটল বাসের ব্যবস্থা করেছে মার্কিন নৌবাহিনী।

যেসব মার্কিন নাবিক স্থলে এক রাত কাটিয়ে কিছুটা বিলাসিতা করতে চান, তাদের জন্য দুটি হোটেল নির্ধারণ করা হয়েছে।

থাই কর্তৃপক্ষ শহরের বিনোদন এলাকাগুলোতে নজরদারির জন্য শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে মার্কিন অতিথিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ না নিতে সতর্ক করেছে।

"৫০ থেকে ৬০ বছর আগে মার্কিন সামরিক সদস্যদের সফরই পাতায়াকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তোলে এবং এটিকে একটি পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করে," বলেন মেয়র পরামাসে।

"খোলাখুলি বলতে হবে, বারকর্মী নারীদের জন্য শহরটির একটি সুনাম বা পরিচিতি আছে। আমরা এই ধারণাগুলো বুঝি। আমরা তা থামাতে পারি না।

"তবে আমরা যা করতে পারি, তা হলো দেখানো যে পাতায়া বদলেছে। এখন আমাদের কাছে খেলাধুলা, সেমিনার, সুস্থতা-ভিত্তিক আয়োজন এবং পরিবারবান্ধব নানা কার্যক্রম আছে।

"এখানে সবকিছুরই একটি মিশ্রণ রয়েছে।"

দুই দেশই আশা করছে, ৬ই সেপ্টেম্বর ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার সময় এর নাবিকরা হবে আরও সতেজ ও বিশ্রামপ্রাপ্ত।