ওমান উপকূলে ভারতের পতাকাবাহী দ্বিতীয় জাহাজের উপর হামলা

    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছে ওমান উপকূলে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের উপর হামলার ঘটনায় নতুনভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সোমালিয়া থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া এই জাহাজটি হামলার পর ডুবে যায় বলে অভিযোগ।

জাহাজে থাকা ১৪ জন ভারতীয় নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করেছে ওমানের উপকূল রক্ষাবাহিনী।

হামলার এই ঘটনাকে 'অগ্রহণযোগ্য' আখ্যা দিয়ে হামলার তীব্র নিন্দা করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে হামলার জন্য কে দায়ী, সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। এই অঞ্চলে সম্প্রতি একাধিক ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় গত আটই মে গুজরাটের এক পণ্যবাহী জাহাজ আক্রান্ত হয় বলে অভিযোগ।

দুবাই থেকে ইয়েমেনের আল মাকাল্লা বন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিল ওই জাহাজটি । কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে পৌঁছানোর পর ওই জাহাজ আক্রান্ত হয় এবং পরে ডুবে যায় বলে অভিযোগ। জাহাজে থাকা ১৮ জন নাবিকের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

ওমান উপকূলে জাহাজডুবির এই ঘটনা এমন এক সময় ঘটেছে, যখন ইরান সহ ব্রিকস-এ অন্তর্গত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা দিল্লিতে সমবেত হয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার মাঝেই সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছেন তারা।

কী ঘটেছিল?

সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে, এমন এক সংস্থা 'ভ্যানগার্ড'-এর তথ্য অনুযায়ী বুধবার ১৩ই মে ভোরে ওমান উপকূলে আক্রান্ত হয় 'এমএলএনআই হাজি আলী' নামে কাঠের তৈরি ওই জাহাজ। হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে ওমানের লিমা উপকূলের কাছে একটা বিস্ফোরণের পর সেটা ডুবে যায়। গুজরাটের সালায়া বন্দরে নিবন্ধিত ছিল ওই জাহাজ।

ভ্যানগার্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই বিস্ফোরণ ঘটে। পাশাপাশি জানানো হয়েছে ওই জাহাজ সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের বারবেরা থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহতে গবাদি পশু নিয়ে যাচ্ছিল।

ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুকেশ মঙ্গল এই প্রসঙ্গে বলেছেন, "আমি একটা মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কেও জানাতে চাই। হাজি আলী নামের কাঠের তৈরি, মোটরচালিত একটা জাহাজ সোমালিয়া থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ যাচ্ছিল।

"১৩ই মে সকালে ওমানের জলসীমায় এই জাহাজ কথিতভাবে আক্রান্ত হয়। এর ফলে জাহাজে আগুন লেগে যায় এবং পরে সেটা ডুবে যায়," জানিয়েছেন মি. মঙ্গল।

তার কথায়, "জাহাজে সওয়ার থাকা ১৪ জন নাবিককেই ওমান কোস্ট গার্ড নিরাপদে উদ্ধার করে ওমানের দিব্বা বন্দরে নিয়ে গেছে। সকলেই নিরাপদে রয়েছেন।"

'অগ্রহণযোগ্য', বলছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

এই ঘটনার নিন্দা করে বিবৃতি প্রকাশ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "গতকাল ওমানের উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের ওপর হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং আমরা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করছি যে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকদের ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।"

"জাহাজের সকল ভারতীয় নাবিক নিরাপদে আছেন এবং তাদের উদ্ধার করার জন্য আমরা ওমানের কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।"

ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, "ভারত আরো একবার জোর দিয়ে বলছে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের বিপদে ফেলা অথবা অন্য কোনোভাবে নৌচলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।"

যে আবহে ঘটনা ঘটেছে

ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং জবাবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপকে ঘিরে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকেই বিশ্বজুড়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা এখনো বিরাজমান। এর প্রভাব হরমুজ প্রণালির উপর পড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষত অপরিশোধিত তেল সরবরাহের দিক থেকে এই প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং এলএনজি এই জলপথের মাধ্যমেই পরিবহন করা হয়। ভারত তার পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে এবং এর একটা বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। একইসঙ্গে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভোক্তাও বটে।

সংঘাতের আবহে থাকা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর উপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। যে কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতও সেই তালিকায় আছে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর জোর দিয়ে এসেছে ভারত এবং ইরান- দুই দেশই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ভারতের তেলবাহী জাহাজের কোনো সমস্যা হবে না বলে আশ্বস্তও করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে একদিকে যেমন একাধিক তেলবাহী জাহাজ নির্বিঘ্নে এসে ভারতে পৌঁছেছে তেমনই ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের উপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। এর আগে গত মাসে ভারত দিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই ঘটনাগুলোতে 'গভীর উদ্বেগ' প্রকাশ করা হয়েছিল।

এরই মাঝে চলতি মাসে পরপর দু'টো জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সময়টা বেশ 'উল্লেখযোগ্য' বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে ১৪ ও ১৫ই মে অনুষ্ঠিত হওয়া ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি এসেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস ২০২৪ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে হামলার বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি সেইসব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা, যারা ইরানের নৌবাহিনীকে 'সহযোগিতা' করবে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খলিফা বিন শাহীন আল মারারও ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছেন।

ইরানের উপর চালানো সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরাসরি যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মি. আরাঘচি। এর ঠিক আগেই ইসরায়েল দাবি করেছিল যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু না কি গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করে।

ব্রিকস সম্মেলনের মাঝেই মি. আরাঘচি ও মি. মারারের মধ্যে 'মতবিরোধ' দেখা দেয় বলে জানা গিয়েছে। শেষমেশ রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে হস্তক্ষেপ করেন। এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড এস জয়শঙ্করকে ব্রিকস সম্মেলনে বলতে শোনা গিয়েছে, "পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। চলমান উত্তেজনা, সামুদ্রিক চলাচলের ঝুঁকি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর বিঘ্ন পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকেই তুলে ধরে।"

অন্যদিকে, ১৫ই মে থেকে পাঁচ দেশের সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং এই তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতও রয়েছে।

এই সমস্ত বিষয়কে মাথায় রেখে ওমান উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের উপর আক্রমণের ঘটনার 'টাইমিং' বেশ উল্লেখযোগ্য বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দিল্লির পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কমার আঘা বলেছেন, "যে অংশে ওই জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে, সেখানে একাধিক অপারেটিভ সক্রিয়। কে আক্রমণ করেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলে ভারত মন্তব্য করতে চায়নি।"

"কে আক্রমণ করেছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই বলা সম্ভব যে এর নেপথ্যে কারণ কী। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে সময় এই ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার ঠিক আগে আগেই এই ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।"

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর ড. গীতাঞ্জলি সিন্‌হা রায়ের মতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্তা 'স্পষ্ট।'

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কাউকে দোষারোপ না করেই এই বিষয়টা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে নিরীহ নাবিকদের নিশানা করা যেমন চলবে না, তেমনই নৌচলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করাও কাম্য নয়।"

"ওমান ওই নাবিকদের উদ্ধার করেছে বলে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেও কে দায়ী সে বিষয়ে কিছুই মন্তব্য করা হয়নি এবং পরিস্থিতির সংবেদনশীলতাকে বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।"

মি. আঘার মতে, সমগ্র চিত্রের কথা মাথায় রেখে ভারতের পক্ষে এখন 'ব্যালেন্স' করে চলাই শ্রেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ভারতের দিক থেকে ইরানের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক ভাল রাখা দরকার তেমনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও সম্পর্ক ভাল রাখতে হবে।

"ভারতের কাছে এখন বিষয়টা ভারসাম্য বজায় রাখার। কোনো পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ করা চলবে না, আবার নিজের স্বার্থের কথাও ভাবতে হবে। তবে এর আগেও এমন পরিস্থিতি সামলেছে ভারত। আশা করা যায় ভবিষ্যতেও পারবে," বলেছেন তিনি।

ড. গীতাঞ্জলি সিন্‌হা রায় আবার বলেছেন, "পুরো পরিস্থিতির কথা ভেবেই ভারতকে চলতে হবে। ইরান বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না ভারত। তাছাড়া ব্রিকস সম্মেলন চলছে। আবার ব্রিকসের অন্তর্গত দেশ চীন সফরে গিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সমস্ত সমীকরণের কথা মাথায় রাখতে হবে ভারতকে।"

"আবার ভারতের মেরিটাইম সেফটির কথাও ভুললে চলবে না। এই জলপথ বিশ্ব তো বটেই ভারতের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"