পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোটে নারী ভোটারের উচ্চ উপস্থিতি কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ছবির উৎস, Chief Electoral Officer West Bengal /Facebook
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটে নারীদের ভোটের হার পুরুষদের ছাপিয়ে গেছে। ২৩শে এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফা ভোট গ্রহণে ভোটের হার ছিল ৯১.৭৮ শতাংশ।
প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো বা পিআইবির তথ্য অনুযায়ী, এতে পুরুষ ভোটারদের হার ছিল ৯০.৯২%, নারী ভোটারদের হার ৯২.৬৯% এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের হার ছিল ৫৬.৭৯%। নির্বাচন কমিশনের তরফে মোট ভোটের সংখ্যা এবং লিঙ্গভিত্তিক ভোটদান সংক্রান্ত অন্য কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায় নি।
তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি- দুই দলই রাজ্যে রেকর্ড সংখ্যক ভোট দান এবং সেখানে নারীদের ভোটের অংশীদারিত্বকে 'ইতিবাচক' বলে মনে করছে। এই নিয়ে দু'দলের যুক্তি এবং ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও তাদের দাবি মোটের উপর এক। পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা, বিশেষত নারীরা না কি তাদের পক্ষেই ভোট দিয়েছেন।
তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার রাজ্যে আরো একদফা ভোট গ্রহণ বাকি আছে। কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি-সহ ১৪২টা কেন্দ্রে আগামী ২৯শে এপ্রিল ভোট গ্রহণ করা হবে। ফল ঘোষণা হওয়ার কথা চৌঠা মে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে নারী ভোটাররা যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনীতিবিদ থেকে বিশেষজ্ঞ সকলেই এই বিষয়ে এক মত যে নারী এবং মুসলিম ভোটব্যাংক জেতার ক্ষেত্রে 'নির্ধারক ভূমিকা' পালন করতে পারে।
ঠিক এই কারণেই ভোটারদের মন জিততে মরিয়া সব দলই।

ছবির উৎস, Chief Electoral Officer West Bengal /Facebook
তথ্য কী বলছে?
ভারতের সর্বশেষ (২০১১ সালের)আদমশুমারী অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পুরুষ ও নারীর অনুপাত প্রতি ১০০০জনে ৯৫০ জন নারী।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলার ভোটার তালিকার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ফলে গত দেড় দশকে পুরুষ ভোটারের তুলনায় মহিলা ভোটারের সংখ্যায় যে আনুপাতিক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, সেই ধারা ব্যহত হয়েছে।
এসআইআর-এর ঠিক আগে প্রতি ১,০০০ জন পুরুষ ভোটারে নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল ৯৭০ জন। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ই ডিসেম্বর এসআইআর-এর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সেই অনুপাত কমে প্রতি ১০০০ পুরুষ ভোটারে নারী ভোটার দাঁড়ায় ৯৫৬ জন। এরপর ২৮শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় সেই অনুপাত আবার বেড়ে প্রতি ১০০০ পুরুষে ৯৬৪জন নারী ভোটারে দাঁড়ায়।
তারপর ২২শে এপ্রিল অব্দি একাধিক তালিকা প্রকাশ হয়েছে। বহু নাম যোগ হয়েছে এবং নাম বাদও পড়েছে। তাই নারী ও পুরুষ ভোটারের সঠিক অনুপাতের হিসাব করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটের হার একটু একটু করে বাড়ছিল। গতবারের বিধানসভা ভোটে পুরুষ ভোটের হার ছিল ৮১.৩৭% এবং নারী ভোটের হার ছিল ৮১.৭৫%।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পুরুষ ভোটারদের হার ছিল ৭৮.২০% এবং নারী ভোটারদের হার ছিল ৮০.১৬।
এটা একটা ট্রেন্ডের দিকে ইঙ্গিত করছিল বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ছবির উৎস, Narendra Modi & Mamata Banerjee/Facebook
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির ব্যাখ্যা
পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণ এবং দুই দফা মিলিয়ে তার ফলাফল চৌঠা মে প্রকাশ করার কথা হলেও তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি দুই দলই নিজেদের 'জয়' সম্পর্কে 'নিশ্চিত'।
নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বলতে শোনা গিয়েছে যে, "আমি পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর জনগণকে অভিনন্দন জানাই। বাংলায় নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করেছে যে বাংলায় পরিবর্তনের ঢেউ আসতে চলেছে।"
প্রথম দফায় ভোট গ্রহণের ট্রেন্ড দেখে গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, রাজ্যে নারী নিরাপত্তা, দুর্নীতি, জীবিকা সংক্রান্ত সমস্যা ইত্যাদি ইস্যুর কথা মাথায় রেখে প্রথম দফায় পশ্চিমবঙ্গের নারীরা তাদের পক্ষে ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন।
প্রথম দফার ভোট দেখে তার দলের জয় সম্পর্কে সমানভাবে নিশ্চিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও। এক জনসভায় তিনি বলেছেন, "এত ভোট কাটার পরেও এত ভোট কেন পড়ছে জানেন? কারণ আমার মনে হয়, মানুষ জানে তৃণমূলকে ভোট না দিলে তার আমও যাবে, ছালাও যাবে। এরপর এনআরসি করার প্ল্যান করবে।"
"মহিলা বিল পাশ হয়ে গিয়েছিল ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। আমরা সবাই ভোট দিয়েছিলাম। ২০২৩-২০২৬ সাল, নোটিফিকেশন করলেন না কেন? আসলে প্ল্যান এ, সামনে মহিলার নাম রাখা আর পেছনে ডিলিমিটেশন করা নিজেদের জেতার স্বার্থে।"

ছবির উৎস, Chief Electoral Officer West Bengal /Facebook
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
প্রথম দফা ভোট গ্রহণে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ঘটনাকে অন্য চোখে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভোটার তালিকার সংশোধনের কারণে মৃত, ডুপ্লিকেট বা অন্যত্র চলে গিয়েছেন, এমন ভোটারের নাম ইতিমধ্যে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই ভোট এমনিতেও পড়ত না কিন্তু মোট ভোটারের সংখ্যা এতদিন এই অঙ্কের উপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হতো। এখন মোট সংখ্যা কমায় ভোটের হারও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
তবে নারী ভোটারদের এই অংশীদারিত্বকেও বিশেষভাবে ইঙ্গিতবহ বলেই মনে করছেন তারা।
প্রবীণ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জীর কথায়, "নারী ভোটারদের সংখ্যা যে বেড়েছে, তার পিছনে দু'টো কারণ থাকতে পারে বলে আমি মনে করি। এর মধ্যে একটা কারণ ভোটার তালিকা থেকে যেভাবে নারীদের নাম ছেঁটে ফেলা হয়েছে তাদের পরিচয় প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে বাবার পদবী এক, বিয়ের পর তার এখন অন্য পদবী। (এই পার্থক্যের কারণে) এসআইআর-এর সময় তাদের ভীষণ হ্যারাস হতে হয়েছে।"
"একজন নারী যদি দেখেন তার পরিবারের সদস্যদের, আশপাশের মানুষকে কোনোভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাহলে তার একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।"
"দ্বিতীয় হলো এই চিন্তা যে- আমি যদি এবার ভোট না দিই তাহলে ভবিষ্যতে আমার ছেলে-মেয়েদের কী হবে?"
তার মতে, এই পরিমাণ ভোট আরো একটা বিষয়কে ইঙ্গিত করে। এবং সেটা হলো, মমতা ব্যানার্জীকে রাজ্যের নারীদের অনেকেই "নিজেদের কাছের লোক বলে মনে করেন যিনি তাদের কথা ভাবেন। সমস্যা সমাধানের বিষয়ে চিন্তা করেন। একইসঙ্গে লক্ষ্মীর ভান্ডার, মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসাথীর মতো সুবিধাও কিন্তু মমতা ব্যানার্জী দিয়েছে।"
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তার প্রতি নারী ভোটাররা 'আস্থা' দেখিয়েছেন। শিখা মুখার্জীর কথায়, "এটা কিন্তু আজ নয়, ২০০৯ সাল থেকেই নারী ভোটাররা তার প্রতি আস্থা এবং আনুগত্য দেখিয়েছেন। এবং আমার ব্যক্তিগত ধারণা সেটা এখনো ভেঙে যায়নি বা পাল্টে যায়নি।"
কলকাতার 'সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস'-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন মইদুল ইসলাম। তার মতে, "গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটারদের সংখ্যা কিন্তু একটু একটু করে বাড়ছিল। এই ট্রেন্ড পশ্চিমবঙ্গ শুধু নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের সময় নারী ভোটারদের হার পুরুষদের ছাপিয়ে যাওয়াটা বেশ অর্থবহ।"

ছবির উৎস, Chief Electoral Officer West Bengal /Facebook
এর অর্থ কী জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, "আমার মনে হয় নারী ভোটারদের পুরুষ ভোটারদের ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টা তৃণমূলের পক্ষে যাবে। কারণ প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তৃণমূল (লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাধ্যমে) সরাসরি ক্যাশ ট্রান্সফার করেছে। টাকার পরিমাণও বেড়েছে ইতিমধ্যে। তাছাড়া নারীদের কথা ভেবে অন্যান্য স্কিমও আছে।
"দ্বিতীয়ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজের জন্য অন্যত্র গিয়েছেন তাদের অনেকেই প্রথম দফার ভোট দিতে এলেও সকলেই যে আসতে পেরেছেন তা নয়। পশ্চিমবঙ্গে লিঙ্গ অনুপাতে ছেলেরা এগিয়ে। সেদিক থেকে পুরুষ ভোটারদের সংখ্যা বেশি হওয়া উচিত ছিল কিন্তু তা হয়নি। মেল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কাররা সকলে আসতে পারেননি," বলছিলেন মি.ইসলাম।
এর ফল ভোটযন্ত্রে দেখা যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞের কথায়, "গতবার নারী ভোটের নিরিখে বিজেপির তুলনায় তৃণমূল ১০% এগিয়ে ছিল এবং পুরুষ ভোটের তুলনায় নিরিখে ৪% এগিয়ে ছিল। তাই প্রথম দফায় নারী ভোটের হার বৃদ্ধি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌম্য গাঙ্গুলি বলেছেন, "প্রথম দফায় ভোট গ্রহণে নারীদের ভোট পুরুষদের ছাপিয়ে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভোটও রেকর্ড পরিমানে পড়েছে। কারণ এসআইআর নিয়ে নারী-পুরুষ সকলের মনেই চাপা উদ্বেগ আছে।"
তার কথায়, "নারীরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছে মানে তারা লক্ষ্মীর ভান্ডারের কথা মাথায় রেখে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে তেমন ভাবার এখনই কোনো কারণ নেই। কারণ এই রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়েও বারবার প্রশ্ন উঠেছে।"
"আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে নারীরা রাস্তায় নেমেছিলেন প্রতিবাদ জানাতে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে রাজ্য যেভাবে চলছে, যে সমস্যা রয়েছে সেগুলোও বড় বিষয়।"
এক্ষেত্রে প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন এমন তরুণীদের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কথায়, "এই নারী ভোটারদের মধ্যে অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। তারা কার পক্ষে ভোট দেন সেটাও দেখার।"
"মজার বিষয় হলো এই রেকর্ড সংখ্যক ভোট এবং এর মধ্যে নারী ভোটারদের আধিক্য নিয়ে দুই দলই দাবি করছে, যে ভোটাররা তাদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কার পক্ষে ভোট পড়ল সেটা বোঝা যাবে চৌঠা মে।"








