ঘুমের মধ্যে ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি হয় কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শান্মুগা প্রিয়া সেলভারাজ
- Role, বিবিসি নিউজ তামিল
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
গভীর ঘুমের সময় হঠাৎই উঁচু থেকে পড়ে যাচ্ছি- এমন মনে হওয়ায় ধড়ফড়িয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আমাদের অল্পবিস্তর সকলেরই আছে। ঘুমের মধ্যে পায়ে বা গোটা শরীর জুড়ে ঝাঁকুনির অনুভূতিতেও অনেকেরই ঘুম ভেঙে যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর একটা নাম আছে - হিপনিক জার্ক।
হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘনঘন শ্বাস নেওয়া, ঘাম হওয়া, আচমকা ঝাঁকুনি বা শূন্যে পড়ে যাওয়ার মতো এক অদ্ভুত সংবেদনশীল অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত এই হিপনিক জার্ক।
এটা কী? কেন হয়, এটা কি স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণ? কাদের সতর্ক থাকতে হবে- এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে বুঝতে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজার সঙ্গে বিশদে কথা বলেছে বিবিসি তামিল।

ছবির উৎস, Getty Images
হিপনিক জার্ক কী?
ঘুমের মধ্যে উঁচু একটা জায়গা থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি নিয়ে মাঝরাতে জেগে ওঠার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজা।
তার কথায়, "এটা যে শুধু আপনারই হচ্ছে তা নয়। দশজনের মধ্যে সাতজনই কোনো না কোনো সময় এমনটা অনুভব করেছেন।"
তিনি জানিয়েছেন, হিপনিক জার্ক বা এই আচমকা ঝাঁকুনির তীব্রতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কেউ কেউ অনুভব করতে পারেন, কেউ আবার সেভাবে অনুভব করেন না।
ডা. সিন্ধুজা বলেছেন, "ব্যক্তি বিশেষে এর তীব্রতা নির্ভর করে। কারো কারো কাছে এটা এতটাই হালকা যে তারা নিজেরা এটা অনুভব করতে পারেন না। পাশে ঘুমিয়ে থাকা কেউ বা পরিবারের লোক সেটা লক্ষ্য করে।"
"কারো ক্ষেত্রে আবার এটা খুব গুরুতরও হতে পারে। এর তীব্রতা এতটাই বেশি যে তারা ঘুম ভেঙে উঠে বসেন।"
হিপনিক জার্ক আসলে অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন যা ঘুমের সময় ঘটে।
ডা. সিন্ধুজা ব্যাখ্যা করেছেন, "যখন কোনো ব্যক্তি জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় যান, সেই সময়, অর্থাৎ ঘুমের প্রথম পর্যায়ে বা দ্বিতীয় পর্যায়ে এটা ঘটে।"
আমাদের ঘুম সাধারণভাবে দু'টো প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত- নন র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা এনআরইএম এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম।
আর আমাদের ঘুমের চক্র চারটে পর্যায়ে বিভক্ত। এই চারটে পর্যায় ৯০ থেকে ১১০ মিনিট অন্তর পরিবর্তিত হয়।
- এন ১- (হালকা ঘুম): এই পর্যায়টা জেগে থাকা এবং ঘুমের মধ্যবর্তী অবস্থা। এই সময় আমাদের পেশী রিল্যাক্স বা শিথিল হতে শুরু করে।
- এন ২ (মাঝারি ঘুম): এটা এমন একটা অবস্থা যেখানে হার্টের বিটের হার এবং শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পায়।
- এন ৩ (গভীর ঘুম): ঘুমের এই অবস্থাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় যা শরীরকে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
- আরইএম (ড্রিম পোজিশন): এই সময় চোখের তারার ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ের সঙ্গে আমাদের স্বপ্ন দেখারও সম্পর্ক রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ডা. সিন্ধুজা জানিয়েছেন যে এই ঝাঁকুনি প্রথম দু'টো পর্যায়ে ঘটে। এই সময় যে অনুভূতিগুলো সাধারণত অনুভূত হয় তা হলো-
- হঠাৎ পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
- হঠাৎ শক বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো একটা অনুভূতি।
- পড়ে যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত স্বপ্ন দেখা বা হ্যালুসিনেশন হওয়া।
- অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়া।
- মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে কথা বলে ওঠা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশানাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বলছে, এটা মাংস পেশীর আকস্মিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত ঝাঁকুনি। আমরা যখন জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমের অবস্থায় যাই তখনই এটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
ডা. সিন্ধুজা বলেন, "এটাকে সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায় না।"
তার মতে, "পেশীর এই ঝাঁকুনি যে কোনো বয়সেই ঘটতে পারে, তবে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়।"
২০১৬ সালে পরিচালিত একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে "হিপনিক জার্ক যে কোনো বয়সের মানুষ অনুভব করতে পারেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এটা অনুভব করেছেন।"
মার্কিন ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফর্মেশন (এনসিবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, "প্রতিবারই যে ঘুমের মধ্যে এটা হয় তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কোনো রোগের লক্ষণ নয়। কিন্তু পুনরাবৃত্তিক কাঁপুনি স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।"
"মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করা স্বাভাবিক হলেও, গুরুতর ক্ষেত্রে তা মৃগীরোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজ বা স্নায়ুক্ষয়ী রোগকে কিংবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মতো অন্তর্নিহিত কারণকেও প্রতিফলিত করতে পারে এবং তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন," এনসিবিআই ব্যাখ্যা করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
এর কারণ কী?
বেশিরভাগ সময়, এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। তবে ডা. সিন্ধুজা ব্যাখ্যা করেছেন কয়েকটা ফ্যাক্টর হিপনিক জার্কের সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যেমন-
- চরম ক্লান্তি এবং অনিদ্রা: হিপনিক জার্কের কমন কারণ হলো চরম ক্লান্তি বা বিছানায় সঠিকভাবে শুয়ে না থাকা।
- ট্রিগার ফ্যাক্টর: অতিরিক্ত কফি বা ক্যাফেইন, নিকোটিন গ্রহণ ইত্যাদি ট্রিগার ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে এবং পেশীতে কাঁপুনি সৃষ্টি করতে পারে।
- স্ট্রেস: খুব বেশি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ থাকলে শরীর রিল্যাক্স করতে পারে না। মস্তিষ্ক যখন সতর্ক থাকে তখন তা সহজেই চমকে উঠতে পারে। চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে ডিপ্রেশন পেশীতে এই ধরনের ঝাঁকুনির অনুভূতির কারণ হতে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির গবেষণামূলক প্রতিবেদনেও এই তথ্যকে নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন সেন্টারে তালিকাভুক্ত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, "অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ এবং ক্লান্তি ঘুমের সময় ঘটে যাওয়া এই স্বতঃস্ফূর্ত পেশী স্পন্দনের ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।"
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ সিস্টেমের মতে, "স্ট্রেস ও উদ্বেগ মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এটা জেগে থাকা অবস্থা থেকে গভীর ঘুমে যাওয়ার মসৃণ ট্রান্সিশান (বা পর্বান্তর)কে কঠিন করে তোলে।"
"দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা, স্লিপ ডিজঅর্ডার, রাতে পাতলা ঘুম হওয়া সামগ্রিকভাবে অনিয়মিত ঘুমের কারণে ঘুমে বড়সড় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এই বিষয়গুলো ঘুমের সময় হঠাৎ ঝাঁকুনির আশঙ্কাও বাড়িয়ে তুলতে পারে," বলে জানিয়েছেন ডা. সিন্ধুজা।

ছবির উৎস, Getty Images
কখন এটা সমস্যার কারণ?
ডা. সিন্ধুজা জানিয়েছেন যে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এটা এমন একটা অনুভূতি যা ঘুমের সময় তারা অনুভব করেছেন। কিন্তু যদি কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখা যায় তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন-
- যদি পেশীর ঝাঁকুনি টানা, ঘন ঘন বা প্রতিদিন দেখা যায়
- ঘুমের সময় খিঁচুনির মতো পরিস্থিতি হয়
- ঘুমের সময় নাক ডাকার সমস্যা
- ঘুমের সময় মুখ থেকে ফেনা বেরোনো
- ঘুমের সময় পেশী শক্ত হয়ে যাওয়া
- ঘুমের মধ্যে অজান্তেই প্রস্রাব করে ফেলা
যদি এই সমস্ত লক্ষণগুলো ঘন ঘন দেখা যায় তাহলে অবিলম্বে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে তিনি জানিয়েছেন।
ডা. সিন্ধুজার কথায়, "এগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এগুলো ডিমেনশিয়া বা মৃগী রোগের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে।"








