আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
অতিরিক্ত বড় স্তন কীভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
- Author, রেবেকা থর্ন
- Role, গ্লোবাল হেলথ, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বড় আকৃতির স্তনকে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হলেও বাস্তবতা হতে পারে ভিন্ন, কখনো বা কঠিন। এটি নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
"এক সময়ে আমি কুজো হয়ে হাটটাম। আমার স্তন অতিরিক্ত বড়-এটি যাতে বোঝা না যায় সেজন্য। আমার বিষয়টি পরিস্কার মনে আছে, কারণ তখন খুব লজ্জা লাগতো। "
কথাগুলো আর্জেন্টিনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাকেলের। তিনি ২০১০ সালে অস্ত্রোপচার করে স্তনের আকৃতি ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে রাকেলের বয়স ৫২। তিনি বলেন, ওই সিন্ধান্তের ফলে তিনি পান এক ধরনের 'মুক্তির অনুভূতি' যা আগে তার ছিলো না।
অতিরিক্ত বড় স্তনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথা, ঘন ঘন মাথাব্যথা, দেহভঙ্গির সমস্যা, অবশতা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে স্তন ছোট করার অস্ত্রোপচার হয়েছে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৬টি। সবচেয়ে বেশি অস্ত্রোপচার হয়েছে ব্রাজিলে (১ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৭টি)। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (৬৭ হাজার ৪৭৮টি), ফ্রান্স (৩৮ হাজার ৭৮০টি), জার্মানি (৩২ হাজার ৬৮টি), তুরস্ক (২৫ হাজার ৩৩৪টি) ও ভারতের অবস্থান (২২ হাজার ৪০০টি)।
রাকেল বলেন, যখন কৈশোরে ছিলেন তখন থেকে ভারী বুকের কারণে তীব্র পিঠ ব্যথায় ভুগতেন তিনি।
কিন্তু আর্জেন্টিনায় বড় স্তন থাকাকে আশীর্বাদ বলেই মনে করা হয়। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাকেল বলেন, "অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা বলতেন 'তুমি খুব ভাগ্যবান।'"
"আমি ভাগ্যবান ছিলাম না। আমি অনেক কষ্টে ভুগেছি। কিশোরী হিসেবে, নারী হিসেবে ও মা হিসেবে ভুগেছি।"
আসলে তিনি এখনো পিঠের ব্যাথায় ভুগছেন, এর কারণ মূলত শরীরকে লোকচক্ষু থেকে আড়ালের চেষ্টা করতে গিয়ে হাঁটার ধরনেই পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি।
কর্মঠ মানুষ হিসেবে রাকেল ইয়োগা, পাইলেটস ও জিমে যাওয়া পছন্দ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত বড় স্তনের চাপ তার চলাফেরায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে তিনি পছন্দের এসব কার্যকলাপ থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসথেটিক প্লাস্টিক সার্জনসের প্রেসিডেন্ট ডা. নোরা নুজেন্ট বলেন, যারা স্তন ছোট করতে চান তাদের কাছ থেকে দুটি অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়- ব্যায়াম করতে অসুবিধা ও চলাফেরা করতে সমস্যা।
তার মতে, বড় স্তন স্বাভাবিকভাবে ভারী হয়। এর ফলে শরীর সামনে দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং পিঠ ও ঘাড়ে সারাক্ষণ চাপ তৈরি হয়।
"বুক ভারী হলে ব্যায়াম করা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং ঠিকমতো সাপোর্ট দেয় এমন ব্রা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।"
রাকেল বলেন, স্তন ঠিকভাবে ধরে রাখার জন্য তাকে একসঙ্গে "দুই বা তিনটি" ব্রা পরতে হতো। বড় মাপের ব্রার দাম বেশি যা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
"আর্জেন্টিনায় বড় মাপের ব্রা খুবই দামি," বলেন তিনি।
"আমি মুক্ত অনুভব করি"
ডা. নোরা নুজেন্ট বলেন, যুক্তরাজ্যে সাধারণত স্তন ছোট করার অস্ত্রোপচারে একেকটি স্তন থেকে ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত কমানো হয়। যদিও তিনি এর থেকেও বেশি গ্রাম কমাতে দেখেছেন।
বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে তিনি বলেন, শরীরের মোট ওজনের তুলনায় এটি খুব বেশি মনে নাও হতে পারে, কিন্তু শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য এটি পরিমাণে বেশি হয়ে যেতে পারে।
রাকেলের স্তন থেকে মোট আড়াই কেজি অপসারণ করেছিলেন ডাক্তাররা।
"আমার মনে আছে-অস্ত্রোপচারের পর একদিন মেঝে থেকে কিছু তুলতে গিয়ে কেমন অনুভব করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, শরীরটা যেন একেবারে আলাদা। নিজেকে খুব মুক্ত অনুভব করেছিলাম।"
ভালো ব্রা কী পরিবর্তন আনতে পারে?
অনেক দিন ধরে স্তনের ব্যথায় ভুগছিলেন অধ্যাপক জোয়েনা ওয়েকফিল্ড। তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে তার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে যান, তখন তাকে শুধু একটি ভালো মাপের ব্রা পরার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বায়োমেকানিক্সের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভালো ব্রা আসলে কোনটিকে বলে সেটি নিয়ে গবেষণা করবেন।
তিনি বলেন,"আমি বুঝতে পারলাম, কেন আমাদের ব্রা দরকার, ব্রার উপকারিতা কী, ব্রার কার্যকারিতা কেমন হওয়া উচিত-এসব বিষয়ে আমরা আসলে খুব কমই জানি।"
"ব্রা কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করে বা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী- এমন কোনো কার্যকর জিনিস হিসেবে মূল্যায়িত হতো না নয়। বরঞ্চ এটি মূলত ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতো। আর আমি এ বিষয়ে সত্যিই হতাশ ছিলাম।"
বিষয়টি তাকে অনুপ্রাণিত করে। ২০০৫ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথে-এ স্তনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি গবেষণা দল গঠন করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঠিক মাপের ব্রা না পরার কারণে ব্যথা বাড়তে পারে, ত্বক ও টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে, শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে দিতে পারে এবং শারীরিক কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আসলে ভারী স্তনের প্রভাব পুরো শরীরের কার্যকারিতার ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বছরের পর বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ওই দল আরও খুঁজে পেয়েছে যে সব ধরনের ব্যায়ামের সময় স্তন আট সংখ্যার প্যাটার্নের মতো নড়াচড়া করে।
গবেষণা করে তারা বের করে করেছেন, স্তনের ব্যথা কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো ধীরে চলাচল বা নড়াচড়া করা। বেশি নড়াচড়া বা কম নড়াচড়া করার সাথে স্তন ব্যথা বেশি বা কম হওয়ার সম্পর্ক কম।
গবেষক দলটি এখন এলিট খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করছে। যেমন ইংল্যান্ডের নারী ফুটবল দল- লায়েনেসিজ এবং বিশ্বের খ্যাতনামা কয়েকজন গলফারদের জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো ব্রা তৈরি করতে কাজ করছে দলটি।
ওয়েকফিল্ড বলেন, "আমরা দেখছি যে এফএ, ওয়ার্ল্ড রাগবি'র মতো সংস্থাগুলো নারী খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বিনিয়োগ করছে। এটি সম্ভবত কেবল গত পাঁচ বছরে শুরু হয়েছে।"
"এটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও দারুণ যে আমরা পরিবর্তনটি দেখতে পাচ্ছি।"
'রোগীরা ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চায়'
বড় স্তনের বোঝা সমাজ কীভাবে দেখছে এবং কী ভাবছে, সেটা রাকেলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, স্তন হ্রাসের অস্ত্রোপচারের জন্য সমবয়সীরা তাকে তার মানসিকতার জন্য বিচার করেছেন এবং এটি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটি ভুল ধারণা ছিল।
"আমার মনে হয় অধিকাংশ মানুষ ভাবত, এটি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ইস্যু নয়, শুধুই সৌন্দর্য সংক্রান্ত ব্যাপার," তিনি বলেন।
"আমার মনে আছে, যখন আমি এটি করেছিলাম, তখন একজন নারী আমাকে বলেছিলেন, 'এবার তোমার পেটের চর্বিও কমাতে হবে।'"
এই ধরনের প্রতিক্রিয়া শোনার পরও কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা অনুভব করেন না, এমনটাই জানান রাকেল।
"আমি খুব খুশি। ইতিমধ্যে আমার রজোনিবৃত্তি হয়েছে। কাজেই বড় স্তন নিয়ে কীভাবে বাকী জীবনটা আমি কাটাতাম সেটি কল্পনাও করতে পারি না। এমনকি আমি এখন কল্পনাও করতে পারি না নিজেকে সেই পুরোনো শরীরে মানিয়ে নেয়ার কথা।"
নুজেন্ট বলেন, স্তন ছোট করার সার্জারি করতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এটি নিজের যত্নে নারীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন হতে পারে।
"নিসন্দেহে কেবল নারীরাই নয়, সব রোগীর মধ্যে ভালোভাবে জীবনযাপন করার আগ্রহ বেড়েছে," তিনি বলেন।
"এটি অবশ্যই নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা নয়, বরং এটি স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য প্রচেষ্টা।"