রামিসা হত্যার ১৯ দিনে ৬ কার্যদিবসে রায় হলো, এরপর কী হবে

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ঢাকার একটি আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর রায়টি কোন প্রক্রিয়ায় কবে কিভাবে কার্যকর হবে সেই আলোচনা সামনে এসেছে।

আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, উচ্চ আদালতে এই মামলার নিষ্পত্তি যাতে দ্রুততম সময়ে করা যায় সেজন্য তিনি ও অ্যাটর্নি জেনারেল মিলে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন যে, রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স যাতে শুনানির জন্য এগিয়ে আনা যায় সেজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিতে আনার উদ্যোগ নেবে সরকার।

ওদিকে মামলার রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছাড়াও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবীও।

মামলার বাদী রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেছেন, রায়ে তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন, তবে রায় কার্যকর হলেই তাদের প্রত্যাশা শতভাগ পূরণ হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১৯শে মে সকালে পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় নিজেদের বাসার পাশের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে রক্তাক্ত ও খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশু রামিসার মৃতদেহ।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার রায়ে আজ ঢাকার একটি আদালত দুজনকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড দিয়েছেন।

আদালতের এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের আইনজীবী ছাড়াও, রামিসার বাবা, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মামলাটির ডেথ রেফারেন্স এখন উচ্চ আদালতে যাবে।

রায় কার্যকর কবে হবে

সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, কার্যত ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রামিসা হত্যার মতো বেদনাদায়ক একটি ঘটনার বিচার করতে সক্ষম হয়েছেন তারা।

"এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। আমরা আইনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ৬ কার্যদিবসে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছি। এ রায়ে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি উচ্চ আদালতে গেলেও এ রায় কার্যকর থাকবে," বলেছেন তিনি।

মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স কনফার্মেশনের জন্য হাইকোর্ট ডিভিশনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে।

"এসব মামলায় পেপারবুক প্রস্তুত করতে হয়। পেপার বুক সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্ট সিরিয়ালি মৃত্যুদণ্ডগুলোর মামলা নিষ্পত্তি করেন। রামিসার বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন সব ডেথ রেফারেন্স খুব দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আরও বেশি ফোকাসড সিদ্ধান্ত নিবেন," বলেছেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যাসহ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা এ ধরনের অন্য মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন তিনি।

"আমি লেগে থাকবো। যাতে করে রামিসাসহ এমন ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যায়। আমরা আদালতের কাছে নিবেদন করবো সবগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির"।

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, বিচারিক আদালত ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর পর তারা দ্রুততম সময়ে মামলার শুনানির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন।

"সেক্ষেত্রে পেপার বুক করতে হতে পারে। এজন্য প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশনার প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত সময়ে সম্ভব আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করবো। সেটা দ্রুততম সময়ে করবো," বলছিলেন তিনি।

রায়ে যত প্রতিক্রিয়া

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রামিসা হত্যা মামলায় জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে ডিএনএ টেস্ট ও পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট সংগ্রহ করে দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচারে তারা সহযোগিতা করেছেন।

"আমরা সহযোগিতা করেছি। আদালত ন্যায়বিচার করেছে। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটা মাইলফলক। আমরা সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনবো ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে বলবো যাতে রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স একটু এগিয়ে আনা যায়। তাহলে আর রায় বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে না," সাংবাদিকদের বলছিলেন তিনি।

এর আগে আদালতের রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, "আদালত পরিষ্কারভাবে বলেছে অটোপসি রিপোর্টে চিকিৎসক বলেছেন ভিকটিম রামিসার দেহে ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। ট্রাইব্যুনাল অতি দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণা করেছেন"।

তিনি বলেন, "অপরাধ হলে কোনো দয়া দাক্ষিণ্য না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তারই নিমিত্তে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন"।

মামলায় আসামি পক্ষ কোনো আইনজীবী নিযুক্ত করেনি। সে কারণে এই মামলায় আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন মুসা কালিমুল্যাহ।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "এ মামলার বিচার একটি নজির হয়ে থাকবে। সবার জন্য শিক্ষণীয় হবে ও সচেতনতা তৈরি হবে। মানুষ মনে করবে এমন অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না"।

রামিসার বাবার প্রতিক্রিয়া

রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।

রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এখন রায়টি কার্যকর হলে তার প্রত্যাশা পূরণ হবে।

"আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট। এ রায় যখন বাস্তবায়ন হবে তখন আমি একশ পার্সেন্ট সন্তুষ্ট হবো। প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি, পুলিশ প্রশাসন, জনগণ, মিডিয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমি পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দ্রুত থেকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর হোক। বাংলাদেশের রামিসার মতো এমন ঘটনা আর না ঘটুক," বলছিলেন মি. মোল্লা।