শিক্ষকের মারধরের শিকার কিশোরী এক সপ্তাহ ধরে কথা বলতে পারছে না

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"স্কুলের স্যার আমার মেয়েটারে এমনভাবে মারছে যে, ওর কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ হয়ে গেলো মেয়েটা একটা কথাও বলেনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাসিন্দা শামসুন্নাহার আখতার জোছনা।

মিজ জোছনার কিশোরী মেয়েকে স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে।

পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ায় গত ২৮শে এপ্রিল বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ওই ছাত্রীকে বেত দিয়ে পেটান বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

ওই ঘটনার পর থেকে মেয়েটি আর কথা বলতে পারছে না বলে জানিয়েছে পরিবার।

"ও কথা বলার চেষ্টা করতেছে, কিন্তু কথা বের হচ্ছে না। খালি গোঙানির মতো শব্দ করতেছে," বলেন কিশোরীর মা মিজ জোছনা।

এখানেই শেষ নয়। মারধরের ঘটনার পর থেকে মেয়েটি ঠিকমত খেতেও করতে পারছে না। এতে শরীর দুর্বল হয়ে বার বার খিঁচুনি হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

"প্রথমে আমরা স্থানীয় একটা প্রাইভেট হাসপাতালে নিছিলাম। কিন্তু সেখানকার ডাক্তাররা ঢাকায় পাঠায় দিছে। এখন আমার মেয়ে পিজি হাসপাতালে (বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি রয়েছে," বলেন মিজ জোছনা।

মারধরের ঘটনায় মানসিকভাবে আঘাত পাওয়ার কারণে মেয়েটি কথা বলতে পারছে না বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সমালোচনা ও এলাকাবাসীর ক্ষোভের মুখে অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, সরকার নীতিমালা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করলেও তদারকির অভাবে অনেক স্কুল ও মাদ্রাসা, বিশেষ করে বেসরকারিগুলো সেটি মানছে না। ফলে এটি ঘিরে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে।

কী ঘটেছিল স্কুলে?

পনেরো বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন, সেটির নাম আলহেরা আইডিয়াল একাডেমি।

এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানে প্রতিমাসেই বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মিজ আখতার।

গত মঙ্গলবার সেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

সেখানে কম নাম্বার পাওয়ায় শাস্তি হিসেবে ওই কিশোরীকে স্কুলের গণিত শিক্ষক ফাইজ উদ্দিন বেত দিয়ে পেটান বলে অভিযোগ পরিবারের।

"পরীক্ষায় নাম্বার কম পাওয়ায় ওই স্যারে আমার মেয়ের ঘাড়ে ও পিঠে জোরে জোরে ১২টা বাড়ি দিছে। এরপর ও আর ক্লাস করতে পারেনি। কোনোমতে বাড়ি পর্যন্ত আসছে," বলছিলেন ছাত্রীর মা শামসুন্নাহার আখতার জোছনা।

তিনি আরও বলছিলেন যে, স্কুল থেকে ফেরার পর তার মেয়ে সাধারণত হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে।

"কিন্তু সেদিন বাড়িতে এসে ও দুই-তিন মিনিট মাথা নিচু করে ঝিম ধরে বসে ছিল। এরপর হঠাৎ একটা চিৎকারের মতো শব্দ শুনলাম," বলছিলেন ভুক্তভোগীর ছাত্রীর মা।

এ ঘটনার সময় পাশেই সংসারের কাজ করছিলেন মিজ জোছনা। মেয়ের চিৎকার শুনে দ্রুত ছুটে আসেন তিনি।

"এসে দেখি মেয়ে কাঁপতেছে, আর মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের হচ্ছে," বলেন মিজ জোছনা।

কাঁপতে থাকায় মেয়ের শরীর কম্বল দিয়ে ঢেকে দেন মা। সেইসঙ্গে, মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছে, সেটি জানার চেষ্টা করেন।

"আমি জানতে চাচ্ছি, কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছিল না। খালি কাঁদতেছিল আর গোঙানির শব্দ করতেছিল," বলেন মিজ জোছনা।

পরে বিদ্যালয়টির অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মারধরের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।

এদিকে, কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে খিঁচুনি শুরু হয় ওই কিশোরীর। এতে আতঙ্কিত বাবা-মা প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

কিন্তু সেখানে ওই শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় গত ২৯শে এপ্রিল ঢাকায় এনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।

"এখানেও পাঁচদিন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু আমার মেয়েটা এখনও কথা বলতে পারছে না। খাওয়া-দাওয়াই ঠিকমত করতে পারে না। একটু পর পর বুকে-গলায় চাপ দিয়ে ধরে- এগুলো করতেছে," বলছিলেন মা মিজ জোছনা।

চিকিৎসকরা কী বলছেন?

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু সেখানে শারীরিক বড় কোনো সমস্যা ধরে পড়েনি বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছে।

"এখনও সেভাবে কিছু ধরে পড়েনি। তবে স্কুলের মারধরের ঘটনা শোনার পর ডাক্তাররা বলছে, মানসিক আঘাতের কারণে মনে কষ্ট পেয়ে এরকম হইতেছে," বলেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা মিজ জোছনা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও একই কথা জানিয়েছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও বেশকিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে, এক সপ্তাহ পরেও সাইমা আখতারের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে পরিবার।

"এখন ও কবে সুস্থ হবে বা বড় কোনো ক্ষতি হলো কি-না, এগুলো নিয়েই পরিবারের সবাই দুচিন্তার মধ্যে আছি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন কিশোরীর ভাই রায়হান তালুকদার।

এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেজন্য অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে কিশোরীর পরিবার।

কী বলছেন অভিযুক্ত শিক্ষক?

গণিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ায় বেত্রাঘাত করার কথা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষক ফাইজ উদ্দিন।

"ঘটনা জানার পরেই আমরা ওই শিক্ষককে ডেকে নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলি এবং তিনি বেত্রাঘাত করার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি এটাও দাবি করেছেন যে, ১২টা নয়, বরং তিন-চারটা বেতের বাড়ি দিয়েছিলেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন আলহেরা আইডিয়াল একাডেমির প্রধান শিক্ষক পনির হোসেন।

ঘটনার পর স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছেও একই দাবি করেছেন অভিযুক্ত গণিতের শিক্ষক।

"বেশি মারছি নাতো, আমি চারটা বাড়ি দিছি। আমি এত জোরেও বাড়ি দিই নাই। শরীরে দাগ হয় নাই, কাঁনছেও না," গত ৩০শে এপ্রিল সাংবাদিকদের বলেন মি. উদ্দিন।

যারা পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছে, তাদের সবাইকে ওই একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

"নাম্বার কম পাইছে দেইখা, সবাইরে বাড়ি দিছি। তবে জোরে বাড়ি দিই নাই," বলেন মি. উদ্দিন।

হাসপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে পরে সেখানে গিয়ে ছাত্রীর খোঁজ-খবর নিয়েছেন বলেও দাবি করেন অভিযুক্ত এই শিক্ষক।

তবে বিষয়টি নিয়ে বিবিসি'র পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা জানার পর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নিদের্শ দেন রায়পুরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা।

তার ওই নির্দেশনার পর গণিতের ওই শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

"ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর চিকিৎসার সব ব্যয় স্কুল কর্তৃপক্ষে বহন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে, ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই থানার ওসিকে বলা হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. রানা।

আইনে কী আছে?

বাংলাদেশে ২০১১ সালে নীতিমালা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নীতিমালাটিতে ছাত্র-ছাত্রীদের শরীরে কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত করা, চক বা ডাস্টার ছুড়ে মারা, আছাড় দেয়া, চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা, চুল কেটে দেওয়া, কান টানা, কানে ধরে ওঠবস করানো, রোদে দাঁড় করিয়ে রাখাসহ অন্যান্য শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সেইসঙ্গে, মানসিক শাস্তি যেমন: শিক্ষার্থীদের মা-বাবা, বংশ পরিচয়, গোত্র, বর্ণ, ও ধর্ম সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা, অশোভন অঙ্গভঙ্গি বা শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব শাস্তি দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার পরও সেটি অমান্য করলে বা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষকদের কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের অসদাচরণের জন্য বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে বলে জানানো হয়েছে।

প্রাথমিক স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতিমালাটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নজরদারি চালায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

কিন্তু বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেভাবে নজরদারি চালানো হয় না।

"সেই কারণে প্রাইভেট স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী প্রহারের ঘটনা এখনও ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে এখন সরকারি স্কুলের মতো বেসরকারি স্কুলগুলোতেও আমরা শিক্ষকদের নিয়ে আলাদা সভা-সেমিনার করে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন রায়পুরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা।