ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নারী নেত্রী মমতার পতন, এরপরে কী?

জে জয়ললিতা, কুমারী মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জে জয়ললিতা, কুমারী মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জী।
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

এক সময় ভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে যে তিনজন ডাকসাইটে নারী নেত্রীর নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতো তারা হলেন জে জয়ললিতা, কুমারী মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জী।

চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের সূত্র ধরে এই সেই ত্রয়ীর রাজনৈতিক প্রভাব আজ আবার আলোচনার কেন্দ্রে।

বিরোধী নেত্রী হিসেবে 'লড়াকু' ইমেজকে সামনে রেখে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মিজ ব্যানার্জী। তারপর থেকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্যের দায়িত্ব সামলেছেন। কিন্তু চলতি নির্বাচনের রায়ে সেই ধারাবাহিকতায় 'ছন্দপতন' ঘটেছে।

বিজেপি জিতেছে ২০৭টা আসন, তৃণমূলের ঝুলিতে ৮০টা আসন। বিশেষত 'ঘরের মাঠ' ভবানীপুর কেন্দ্রে একদা তারই ঘনিষ্ঠ এবং অধুনা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পরাজয় একাধিক জল্পনাকে উস্কে দিয়েছে।

কিন্তু তার দলের এই ভরাডুবি, কেন ভবানীপুরে নিজের কেন্দ্রেই হারলেন তিনি এবং যে 'ক্যারিশমা' জন্য পরিচিত, সেটাই বা কেন কাজ করল না সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।

প্রশ্ন উঠেছে জয়ললিতার মৃত্যু এবং মায়াবতীর 'প্রভাব' ক্রমশ কমে আসার পর মমতা ব্যানার্জী যে রাজনৈতিক অধ্যায়কে কার্যত 'একাই' এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন সেখানে কি ছেদ পড়বে? না কি রাজনীতির ময়দানে প্রত্যাবর্তনের বার্তা দেবেন তিনি।

প্রসঙ্গত, মিজ ব্যানার্জী অবশ্য এই ফল মানতে নারাজ। সে কথা তিনি মঙ্গলবার আরো একবার স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি হারিনি। অফিসিয়ালি ওরা নির্বাচন কমিশনের সাহায্যে জিতেছে কিন্তু আমি বলছি মরালি আমরা জিতেছি।"

"আমি ইস্তফা দেব না।"

তামিলনাড়ুতে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন জে জয়ললিতা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তামিলনাড়ুতে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন জে জয়ললিতা

আম্মা-বহেনজি- দিদি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় নারী নেতৃত্বরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ ছিলেন-তা সে দেশের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হোক বা স্বাধীনতা আন্দোলনে সামিল সুচেতা কৃপালনী যিনি পরে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধী মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও খাদ্য সংকটের মতো সমস্যা এবং বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার শাসনকালে চীনের সঙ্গে সংঘাত, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং বিতর্কিত জরুরি অবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিকূলতার মাঝেও শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দৃঢ় সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন সুচেতা কৃপালনী। শ্রমিক আন্দোলন ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান তাকে একজন প্রভাবশালী ও সক্ষম রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নারী ব্যক্তিত্বদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এখনো পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতি এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদে একাধিক নারীকে দেখা গিয়েছে কিন্তু এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে যে তিনজনের কথা না বললেই নয় তারা হলেন জে জয়ললিতা, কুমারী মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জী।

ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তারা। ভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসে নিজের রাজ্যে শক্তিশালী নেতৃত্বও গড়ে তুলেছিলেন। আঞ্চলিক স্তরে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তেমনই দাপুটে নেত্রী হিসাবে জাতীয়স্তরেও পরিচিতি গড়েছেন।

প্রাথমিকভাবে জয়ললিতার সফর শুরু হয়েছিল রাজনীতি থেকে বহু দূরে। অল্প বয়সে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের নায়িকা ছিলেন তিনি। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও কম 'ক্যারিশমাটিক' ছিল না। চারবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে মায়াবতী নিজের পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আঞ্চলিক রাজনীতিতে মায়াবতী নিজের পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন

একাধারে যেমন কঠোর প্রশাসক ছিলেন তেমনই জননেত্রীর ভূমিকাও পালন করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে আম্মা নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।

তার কর্মজীবনে চড়াই উতরাইও প্রত্যক্ষ করেছেন। কার্যকালে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালে মৃত্যু হয় জয়ললিতার।

অন্যদিকে, ভারতে দলিত রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ কুুমারী মায়াবতীও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে 'বহেনজি' নামেই পরিচিত ছিলেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন অল্প বয়সে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমহা রাও যাকে 'গণতন্ত্রের মিরাকল' বলে সম্বোধন করেছিলেন, সেই মায়াবতী চারবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ২০০১ সালে এক সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময়, বহুজন সমাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাঁসিরাম মায়াবতীকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন।

মায়াবতীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ভোটব্যাঙ্ক এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি।

কার্যকালে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৩ সালে আকাশ আনন্দকে তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন।

তবে ভারতীয় জনতা পার্টি নিয়ে মন্তব্যের জেরে তাকে এর পরপরই বরখাস্ত করা হয় । বিএসপি-র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দলত্যাগ এবং নির্বাচনের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তার দলের প্রভাব কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে 'রাজনৈতিক গুরুত্ব' হারাচ্ছে তার দল।

জনপ্রিয়তা এবং ক্যারিশ্মাটিক নেতৃত্বের দিক থেকে একই সারিতে রাখা হয় মমতা ব্যানার্জীকেও।

জয়ললিতা এবং মায়াবতীর মতোই দাপুটে রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব তিনি। জনসাধারণের কাছে 'দিদি' নামেই পরিচিত। তবে মায়াবতী ও জয়ললিতার সঙ্গে তার একদিকে যেমন মিল রয়েছে তেমন অমিলও আছে।

মমতা ব্যানার্জী।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ১৫ বছর আগে ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা ব্যানার্জী

মিল ও অমিল

জয়ললিতা, মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জী নিজ নিজ দলকে ব্যক্তিনির্ভর শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তারাই ক্রমে দলের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন।

পুরুষ প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। জনমুখী প্রকল্প, শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা এবং তৃণমূল স্তরে সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

তবে জয়ললিতা ও মায়াবতীকে রাজনীতিতে এনেছিলেন এমজি রামচন্দ্রন ও কাঁসিরাম। মমতা ব্যানার্জীর সে অর্থে কোনো 'গড ফাদার' ছিল না। মায়াবতীর রাজনীতি মূলত কাস্ট-ভিত্তিক, জয়ললিতার রাজনীতির নেপথ্যে ছিল তার কারিশমা ও জনকল্যাণমূলক নীতি।

মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক সাফল্য আবার আন্দোলন এবং পপুলিস্ট ওয়েলফেয়ারের রাজনীতির উপর ভর দিয়ে।

সেই মমতা ব্যানার্জীই এইবার নির্বাচনে হেরেছেন।

এই প্রসঙ্গে ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. উমেশ কুমার বলেছেন, "জে জয়ললিতা, মায়াবতী এবং মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে ভারতীয় রাজনীতির অর্থ ও অনুশীলনকে বদলেছে। শুধুমাত্র নারী নেত্রী হিসাবেই নয় সংগঠনকে মজবুত করা, নির্বাচনী সংহতি বজায় রাখা এবং যেভাবে তারা নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।"

"টেকসই রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে, প্রতিষ্ঠিত বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং জনপ্রিয় জনকল্যাণমূলক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা ভারতীয় রাজনীতির ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ-শাসিত প্রকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।"

তবে এই দুই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর অমিলও রয়েছে। তার লড়াকু মনোভাব, তৃণমূল স্তরে সংযোগ এবং বাড়ির মেয়ের ইমেজ একসময় সাফল্যের চাবিকাঠি হিসাবে কাজ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছন্দপতনও ঘটেছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে ও পৌরসভায় নিয়োগে দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতিসহ তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তার দলের বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতিরও অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা।

পাশাপাশি রাজ্যে একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনা আইন শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

একে কেন্দ্র করে শাসকদলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের 'ক্ষোভ'ও দেখা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে এমন অনেক ফ্যাক্টর কাজ করেছে এই ভোটে।

মমতা ব্যানার্জী।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চলতি বিধানসভা নির্বাচনের ফল মানতে নারাজ মমতা ব্যানার্জী

মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কোনদিকে?

মমতা ব্যানার্জীর এই পরাজয়, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবে কি না সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কলকাতার 'সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস'-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম বলেছেন, "নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতার এই পরাজয় অবশ্যই রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক অতীতে আমরা ন্যাশানাল পার্টিগুলোর মধ্যে শীলা দিক্ষিত, বসুন্ধরা রাজের মতো মুখ্যমন্ত্রীদের দেখেছি।''

''কিন্তু আঞ্চলিকস্তরে ক্ষমতাশালী নেত্রী হিসাবে জয়ললিতা, মায়াবতী এবং মমতাকেই ধরা হয়েছে। এদের মধ্যে জয়ললিতার মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচনে হারের সম্মুখীন হওয়ার পর মায়াবতীর পুনরুত্থান হয়নি। মমতার ক্ষেত্রে কী হয় সেটাই দেখার," তিনি বলেন।

এই প্রসঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় উল্লেখ করেছেন দিল্লির পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট ড. রোহিত জ্যোতিষ। তার কথায়, "আমরা যদি মমতাকে জয়ললিতা ও মায়াবতীর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বলা দরকার এরা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক নেতৃত্বের অংশ ছিলেন যেখানে তাদের কর্তৃত্ব গড়ে উঠেছিল দলের সংগঠন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।"

"মমতা ব্যানার্জীর ক্ষেত্রে যা বদলেছে তা হলো তিনি যে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন তার কাঠামো। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি মূলত স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যেগুলি স্টেট রিসোর্সের ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের বিষয়ে মধ্যস্থতা করত। এই নেটওয়ার্কগুলি যতদিন স্থিতিশীল থেকেছে, ততদিন তিনি বা তার আগের বামপন্থী নেতারা তাঁদের দৃঢ় রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।"

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমীকরণে বদল এসেছে।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ড. জ্যোতিষ বলেছেন, "এখন আমরা সেই ভারসাম্যের এক ধরনের বিচ্যুতি দেখছি। এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে জাতীয় স্তরে সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান ঘটেছে, যা এই প্রতিযোগিতাকে অনেক বেশি উন্মুক্ত ও তীব্র করে তুলেছে। এটা তামিলনাড়ুতে জয়ললিতা যে বিরোধী দলের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার থেকে অনেকটাই আলাদা। মায়াবতীর ক্ষেত্রে আবার বিরোধিতা সর্বদাই স্থিতিশীল স্থানীয় জোটকে কেন্দ্র করে দেখা গিয়েছে।"

"আমার মনে হয় মমতার এই পরাজয় তার ব্যক্তিগত পতন নয়। আমার মনে হয় সেন্ট্রালাইজড লোকাল লিডারশিপকে এখন আরও অনেক বেশি পরিমাণে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।"

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ড. কুমার বলছেন, "বর্তমান ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে কাঠামোগত এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাকেই দর্শায়। গভীর সরকার-বিরোধী মনোভাব, মমতা ব্যানার্জীর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলাকালীন ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নির্বাচনী পরিবেশকে রূপ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।"

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি মমতা ব্যানার্জী ও দলের অন্যান্যরা

ছবির উৎস, MAMATA BANERJEE/FACEBOOK

ছবির ক্যাপশান, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি মমতা ব্যানার্জী ও দলের অন্যান্যরা

"তাছাড়া বিজেপি তাদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করেছে। তারা স্থানীয়স্তরে প্রচার, নির্বাচনী এলাকা-স্তরের বিষয়গুলিতে আরও বেশি মনোযোগ দিয়েছে এবং শক্তিশালী বুথ-স্তরের ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকেছে, যা সম্মিলিতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।"

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে মমতা ব্যানার্জীর ক্যারিয়ারে ইতি হবে কি না এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মইদুল ইসলাম বলেছেন, "এর আগে ২০০৪-২০০৬ সালে সেটব্যাকের পর অনেকেই মনে করেছিলেন তার পলিটিক্যাল অবিচ্যুয়ারি লেখার সময় হয়েছে। উনি আর ফিরবেন না। কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে আন্দলনের হাত ধরে আবার তার রাজনৈতিক পুনরুত্থান হয়।"

"সেই মমতাই আবার ২০২৬ সালে হারলেন। তার কাছে এখন অবকাশ রয়েছে, সরকার চালাতে হচ্ছে না। এই সময়কে তিনি কীভাবে ব্যবহার করবেন, সাংগঠনিক ভিতকে আবার পোক্ত করবেন, না কি রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেবেন না কি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন সেটা দেখার। তবে উনি লড়াই করে বারবার ফেরত এসেছেন কাজেই কী হয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে," তিনি বলছেন।

একই মত পোষণ করেন ড. রোহিত জ্যোতিষ, "জয়ললিতা, মায়াবতীর সঙ্গে তুলনা করলে আমার মনে হয় না মমতার এই পতন পার্মানেন্ট। এখনই তার ক্যারিয়ারে ইতি হবে ভাবারও কারণ নেই।"

মমতা ব্যানার্জীও অবশ্য হার মানছেন না বলে জানিয়েছেন। এই ফল কে না মেনে তিনি বলেছেন, "উই উইল ফাইট ইট আউট।"