ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পাল্টা আক্রমণের দাবি তেহরানের

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরী বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এই ঘটনার জবাবে একটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে তেহরান।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি বলেছে, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার পর তারা ওই অঞ্চলে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

আইআরজিসি ঘাঁটিটির অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানায়নি, তবে কুয়েত বলেছে যে তারা "শত্রুতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি" প্রতিহত করেছে, যদিও সেগুলো কোথা থেকে এসেছে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশেপাশে হুমকি সৃষ্টি করা ইরানের চারটি 'ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক' ড্রোনও ভূপাতিত করেছে।

সেন্টকমের ভাষ্যমতে, পঞ্চম ড্রোনটি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির সময়ই বন্দর আব্বাসের ওই সামরিক স্থাপনায় আঘাত করা হয়। শহরের পূর্বাঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের গণমাধ্যমও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটল। যা তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য চলমান দীর্ঘ আলোচনার মাঝে নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই যুদ্ধের ফলে অনেকদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায়, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ।

তিন দিনের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ইরানে হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাহিনী বলছে, 'আত্মরক্ষার্থেই' এসব হামলা চালানো হয়েছে। নতুন করে শত্রুতার এই ঘটনা চলমান যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সেন্টকম তাদের এই কর্মকাণ্ডকে "পরিমিত, সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার লক্ষ্যে পরিচালিত" বলে অভিহিত করেছে।

এর আগে চলতি সপ্তাহেই, গত সোমবার দক্ষিণ ইরানে আরও একটি হামলার কথা নিশ্চিত করেছিল সেন্টকম এবং সেটিকে "আত্মরক্ষামূলক" বলে উল্লেখ করেছিল।

সেই হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের চেষ্টাকারী নৌযানগুলো লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছিল।

চলমান সংঘাতের কারণে ওই এলাকায় হাজার হাজার বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজ আটকা পড়ে আছে।

সেন্টকম দাবি করেছে, এই হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল "ইরানি বাহিনীর তরফ থেকে আসা হুমকি থেকে আমাদের সেনাদের রক্ষা করা"।

ইরান এই হামলাকে "যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন" হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের সরকার "কোনো শত্রুতার জবাব না দিয়ে ছাড়বে না"।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি মঙ্গলবার দাবি করেছিল যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের ওপর গুলি চালিয়েছে। যদিও এর সময়সীমা নির্দিষ্ট করে বলেনি তারা।

বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান "শেষ সম্বল দিয়ে আলোচনা করছে"।

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে তার যুদ্ধকৌশলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

"হয়তো আমাদের ফিরে গিয়ে কাজটা শেষ করতে হবে, আবার হয়তো হবে না," বলেন তিনি।

ওই বৈঠকেই প্রেসিডেন্ট উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানান।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে ইরান-বিরোধী যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। এছাড়া লেবাননে ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর সাথেও যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে ইসরায়েল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি তার শর্তে সম্মত না হয়, তাহলে তিনি বড় আকারের বোমা হামলা পুনরায় শুরু করবেন।

গত সপ্তাহের শেষ দিকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, ইরানের সাথে শান্তি চুক্তি "মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে"। কিন্তু বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি উল্টো মন্তব্য করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এই অবস্থায় "সন্তুষ্ট নয়"।

তিনি বলেন, সংঘাত অবসানের জন্য তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে "খুবই আগ্রহী", তবে তিনি যোগ করেন যে, "এখন পর্যন্ত তারা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি"।

ট্রাম্প এটাও উল্লেখ করেন, যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে ওয়াশিংটন পুনরায় হামলা চালাতে প্রস্তুত।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন যে, আলোচনায় "কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং কিছুটা আগ্রহ দেখা গেছে"।

"আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে আমরা দেখব যে আরও অগ্রগতি সম্ভব কি না," যোগ করেন তিনি।

ট্রাম্প এবং রুবিও দুজনেই আলোচনার অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও, উভয় পক্ষের মধ্যে ঠিক কোন বিষয়গুলো নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে, সে সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি খসড়া চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ ছিল।

যদিও হোয়াইট হাউস এই খসড়াটিকে "সম্পূর্ণ মিথ্যা" বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

গত সপ্তাহের শেষের দিকে উভয় পক্ষই চুক্তির দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিল, যার ফলে ধারণা করা হচ্ছিল যে একটি ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসছে।

তবে তেহরান সতর্ক করে দেয় যে, চুক্তিটি "এখনই হচ্ছে না"। অন্যদিকে ট্রাম্প জানান, তিনি তার আলোচকদের বলেছেন যেন তারা কোনো চুক্তির জন্য "তাড়াহুড়ো না করে"।

বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "তারা কেবল একটি চুক্তি করতে চায়- আমি মনে করি না যে তাদের অন্য কোনো উপায় আছে।"

ট্রাম্প আরও বলেন, "ইরান খুব আগ্রহী, তারা সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায়। এখন পর্যন্ত তারা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি এবং আমরা এতে সন্তুষ্ট নই, তবে আমরা সন্তুষ্ট হবো। হয় এটা হবে, নয়তো আমাদের কাজটা শেষ করতে হবে"।

হরমুজ প্রণালিতে অর্থ দিলেই নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র 'পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি'র ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এটি হলো এমন একটি ইরানি প্রতিষ্ঠান, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যে কোনো জাহাজ এই কর্তৃপক্ষকে অর্থ প্রদান করলে সেটিও "নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে"।

বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয় এবং এর বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এটিকে "বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ইরানি সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ চেষ্টা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এটি প্রমাণ করে যে ইরান "অর্থের জন্য মরিয়া"।