আকাশ কি সবসময়ই নীল থাকবে?

নীল আকাশ

ছবির উৎস, jmsilva/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আকাশ তো নীলই হবে, এটি এমন একটি বিষয় যা আমরা অনেকেই চিরন্তন বলেই ধরে নেই।
    • Author, ক্যাথরিন হিথউড
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

আকাশ তো নীলই হবে, এটি এমন একটি বিষয়, যা আমরা অনেকেই চিরন্তন বলেই ধরে নেই।

কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস জুড়ে আকাশের রঙ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে এবং বিজ্ঞানীরা বলছেন, আকাশের রং আবারও পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনউইচের বিজ্ঞানী ফিন বারেজের মতে, দিনের বেলা আকাশকে নীল দেখানোর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, "প্রথমত, সূর্য রয়েছে। সাধারণ সূর্যালোক সাদা, এতে রংধনুর সব রঙ যেমন, লাল, হলুদ, সবুজ এবং নীল রয়েছে।"

দ্বিতীয় কারণটি হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপাদান।

বিজ্ঞানী বারেজের মতে, আকাশে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্পের মতো বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র কণা রয়েছে, যা আলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়।

নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অন্য বেশিরভাগ রঙের চেয়ে কম(ছোট), তাই এই রঙই বেশি ছড়িয়ে পড়ে এবং আকাশকে নীল রঙে ভরিয়ে দেয়।

১৮৭০ এর দশকে এই থিওরিটি আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ লর্ড রেইলি।

তার সম্মানেই এই প্রক্রিয়াটিকে 'রেইলি স্ক্যাটারিং বা রেইলি বিক্ষেপণ বলা হয়।

সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্যালোককে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে অনেক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। কারণ সূর্য তখন দিগন্তের নিচে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে নীল আলো এতোটাই বেশি ছড়িয়ে পড়ে যে, তা আমাদের দৃষ্টিরেখা থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।

এর ফলে, লাল এবং কমলা রঙ, যা কি না কম ছড়িয়ে পড়ে, সেটি আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় এবং সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

মঙ্গলগ্রহের আকাশ

ছবির উৎস, NASA/JPL-Caltech/MSSS/Texas A&M Univ via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলগ্রহের আকাশ দিনের বেলায় সাধারণত হলুদ থাকে এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যের সবচেয়ে কাছের এলাকাগুলো নীল হয়ে যায়

অন্যান্য গ্রহ

বিজ্ঞানী ফিন বারেজের মতে, পৃথিবীর উজ্জ্বল নীল আকাশ সৌরজগতে একটি অনন্য ঘটনা।

যদিও বৃহস্পতির মতো কিছু গ্রহের উপরের স্তরে একটি হালকা নীল রঙের স্তর রয়েছে বলে মনে করা হয়।

যেটি কিছুটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মতো, তবে এই রঙটি বেশি অস্পষ্ট।

সূর্য থেকে আরো দূরে অবস্থিত বৃহস্পতি, পৃথিবীতে পৌঁছানো আলোর মাত্র চার শতাংশ পেয়ে থাকে।

বিজ্ঞানী বারেজ বলেন, "তাই আপনি সেখানে পৃথিবীর মতো সুন্দর, পরিষ্কার নীল আকাশ পাবেন না।"

অন্যদিকে, কিছু গ্রহে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মার্স বা মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল খুবই পাতলা, তাই সেখানে রেইলি স্ক্যাটারিং বা বিক্ষেপণ খুব একটা ঘটে না।

এর পরিবর্তে, সেখানকার প্রচুর ধূলিকণা, যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণুর চেয়ে আকারে বড়। এই ধূলিকণাগুলো আলোকে ভিন্নভাবে ছড়িয়ে দেয়।

এই প্রক্রিয়াটিকে "মে স্ক্যাটারিং বা বিক্ষেপণ" বলা হয়।

এর ফলে সেখানে লাল বা হলুদ আকাশের সাথে নীল রঙের সূর্যাস্ত দেখা যায়।

আকাশ কী সবসময়ই নীল ছিল?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এখন আমরা যে নীল আকাশ দেখছি এবং চিনি, সেটি এই গ্রহের দীর্ঘ ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে একটি নতুন ঘটনা।

যদিও অতীতের আকাশ কেমন ছিল সেটি নিশ্চিতভাবে জানার কোনো উপায় না থাকলেও, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত গ্যাসের ওপর ভিত্তি করে সময়ের সাথে সাথে আকাশের রঙ পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।

প্রায় চার দশমিক পাঁচ বিলিয়ন(৪৫০ কোটি) বছর আগে যখন পৃথিবী গঠিত হয়েছিল, তখন আকাশের উপরিভাগ মূলত গলিত ছিল।

একটি থিওরি অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাথমিক বায়ুমণ্ডলটি মূলত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্যাস, যেমন: কার্বন ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত হয়েছিল, যার সাথে সামান্য পরিমাণে মিথেন এবং খুবই সামান্য অক্সিজেন ছিল।

সময়ের সাথে সাথে, আদি ব্যাকটেরিয়ার আকারে পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটে, যেটি বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন যুক্ত করে।

এই মিথেনের ওপর সূর্যালোক পড়ার ফলে এটি আরো জটিল জৈব যৌগে রূপান্তরিত হয়।

যেটি আকাশে ধোঁয়াশার মতো একটি কমলা রঙের কুয়াশা তৈরি করেছিল।

প্রায় দুই দশমিক চার বিলিয়ন(২৪০ কোটি) বছর আগে বড় ধরনের টার্নিং পয়েন্টটি আসে, যেটি "গ্রেট অক্সিজেন ইভেন্ট বা মহাজাগতিক অক্সিজেন ঘটনার" সাথে মিলে যায়।

যখন সায়ানো ব্যাকটেরিয়া নামক আদিম জীব ফটো-সিনথেসিস বা সালোক সংশ্লেষণের মাধ্যমে সূর্যালোককে শক্তিতে রূপান্তর করে এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন নির্গত করে।

ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন জমা হতে থাকে এবং মিথেনের কুয়াশা দূর করে দেয়।

বর্তমান সময়ের বায়ুমণ্ডল গঠিত হওয়ার সাথে সাথে আকাশ আজকের পরিচিত নীল রঙ ধারণ করে।

বায়ু দূষণ থেকে সৃষ্ট কণা পদার্থের কারণে আকাশ সাদা দেখাতে পারে

ছবির উৎস, Subaas Shrestha/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অল্প কথায় বলা যায়, আকাশের এই নীল রঙ পরিবর্তিত হবে না
প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর পর, সূর্য এই ছবির মতো একটি বিশাল লাল তারায় পরিণত হবে

ছবির উৎস, QAI Publishing/Universal Images Group via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর পর, সূর্য এই ছবির মতো একটি বিশাল লাল তারায় পরিণত হবে

আকাশের এই নীল রঙ কী থাকবে চিরকাল?

অল্প কথায় বলা যায়, আকাশের এই নীল রঙ পরিবর্তিত হবে না।

যদিও দূষণ, দাবানল, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং ধূলিঝড় সাময়িকভাবে আকাশের রঙ পরিবর্তন করতে পারে, তবে এই প্রভাবগুলো ক্ষণস্থায়ী।

১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পর, চোখ ধাঁধানো লাল সূর্যাস্ত এবং এমনকি সবুজ সূর্যাস্ত এবং "ব্লু মুন বা নীল চাঁদ" দেখা গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো সম্ভবত বায়ুমণ্ডলে সালফেট এবং ছাইয়ের মতো কণার কারণে ঘটেছিল যেটি স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নভাবে আলোকে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির মিটিওরোলোজি বা আবহাওয়া বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ক্লেয়ার রাইডার বলেন, বায়ুমণ্ডলে থাকা কঠিন বা আধা-কঠিন কণাসহ বাতাসে ভেসে থাকা কণার(অ্যারোসল) সামগ্রিক প্রভাব তাদের আপেক্ষিক আকারের ওপর নির্ভর করে।

তিনি বলেন, এই ভেসে থাকা কণাগুলো যদি সবগুলো প্রায় একই আকারের হয়, তাহলে আমরা খুব তীব্র রঙের প্রভাব দেখতে পাই, বিশেষ করে গোধূলির সময়।

কারণ এই কণাগুলো একই রকম এবং সুবিন্যস্ত উপায়ে আলোর বিক্ষেপণকে বাড়িয়ে দেয়।

সহযোগী অধ্যাপক রেইডার বলেন, "যখন আপনার কাছে বিভিন্ন আকারের কণা থাকে, তখন প্রতিটি কণা তার আকারের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং বিভিন্ন রঙের সৃষ্টি করে।"

যদি এই প্রক্রিয়াগুলো একসাথে ঘটে, তাহলে এর সংমিশ্রণ "সাদা বা বাদামী রঙের ধুলো" তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনাটি কখনো কখনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ধূলিঝড় এবং বায়ু দূষণের সময় ঘটে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে আকাশের রঙকে কীভাবে প্রভাবিত করবে সেটি আমাদের ভাবা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সহযোগী অধ্যাপক রেইডার বলেন, "তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে আমরা বায়ুমণ্ডলে আরো বেশি জলীয় বাষ্প যুক্ত করবো।"

যার ফলে আর্দ্রতার কারণে কণাগুলো স্ফীত (বড়) হয়ে উঠতে পারে, তাদের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় এবং আকাশের সাদাটে হয়ে যাওয়ার প্রভাবকে আরো তীব্র করে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, "বিপরীতভাবে, ভবিষ্যতে যদি নির্গমন হ্রাস পায়, তাহলে আমরা আরো বেশি নীল আকাশ পেতে পারি।"

কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের সময়ের মাপকাঠিতে এই সমস্ত পরিবর্তন খুব একটা লক্ষণীয় নয়।

নীল আকাশ

ছবির উৎস, Chuchart duangdaw via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিন বারেজের মতে, নীল আকাশের যুগ শেষ হওয়ার আগে অন্তত আরো এক বিলিয়ন(১০০ কোটি) বছর বাকি আছে

এক বিলিয়ন বছর

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিন বারেজের মতে, আকাশের রঙ স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হতে হলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপাদানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে হবে।

তিনি বলেন, "যদি না আমরা চরম মাত্রায় দুর্ভাগা এবং কোনো বিশাল উল্কাপিণ্ড আমাদের আঘাত করে, যার সম্ভাবনা খুবই কম, তবে অদূর ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটছে না।"

তিনি অনুমান করেন, নীল আকাশের যুগ শেষ হওয়ার আগে অন্তত আরো এক বিলিয়ন(১০০ কোটি) বছর বাকি আছে।

যেহেতু সূর্যের বয়স বাড়ছে অর্থাৎ ধীরে ধীরে সূর্য উজ্জ্বল হচ্ছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী বারেজ বলেন, প্রায় এক বিলিয়ন বছরের মধ্যে সূর্য আজকের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি আলো বিকিরণ(ছড়াবে) করবে।

তিনি বিশ্বাস করেন, "এই প্রক্রিয়াটি পৃথিবীকে উত্তপ্ত করবে, বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড হারিয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত মহাসাগরগুলো ফুটতে শুরু করবে।"

তার মতে, এই প্রক্রিয়াটি বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন ছাড়তে পারে এবং এমনকি কিছুক্ষণের জন্য হলেও আকাশের নীল রঙকে আরো গাঢ় ও উজ্জ্বল করে তুলতে পারে।

তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী বারেজ বলেন, যদি ওই অক্সিজেন অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে আকাশ পরিবর্তিত হয়ে "একটি সাদা, হলদেটে বায়ুমণ্ডলে পরিণত হবে, যা হবে অত্যন্ত উত্তপ্ত, অনেকটাই শুক্র গ্রহের মতো।"

আরো সুদূর ভবিষ্যতে, এখন থেকে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন(৫০০ কোটি) বছর পর, সূর্যের জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে এবং প্রসারিত হয়ে একটি 'রেড জায়ান্ট বা লাল দানব' এ পরিণত হবে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী বারেজ বলেন, "পৃথিবীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনি প্রথম প্রধান উপাদানটি হারাবেন। আর সেটি হলো সূর্যের নীল আলো।"

"সূর্য যখন মরে যাবে এবং একটি অত্যন্ত বিশাল লাল তারা বা নক্ষত্রে পরিণত হবে, তখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে, সেটি একটি গাঢ় লাল রঙ ধারণ করবে" বলেন এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনউইচের বিজ্ঞানী ফিন বারেজ বলেন, "কিন্তু ততদিনে সেই দৃশ্য দেখার মতো কোনো প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে না। আমি আশা করি, ততদিনে মানুষ অন্য কোথাও নতুন কোনো নীল আকাশের সন্ধানে নক্ষত্রগুলোর গভীরে চলে যাবে।"