কুষ্টিয়ায় 'পীর' হত্যার ঘটনায় নেই কোনো গ্রেফতার

হামলার দিন 'শামীম বাবার দরবার শরিফ'

ছবির উৎস, Tamim Adnan

ছবির ক্যাপশান, শনিবার কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা চলে কুষ্টিয়ার 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' নামে পরিচিত ওই স্থাপনায়
    • Author, তানহা তাসনিম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দেওয়া আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হওয়ার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

মামলা দায়ের হওয়ার পরও একজন আসামিকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা; যদিও পুলিশ বলছে, আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না বলে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে, গত শনিবার কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' এ হামলা চালিয়ে আব্দুর রহমানকে হত্যা করা হয়, যিনি নিজেকে ওই দরগার প্রধান পীর বলে পরিচয় দিতেন।

ঘটনার পর আব্দুর রহমানের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বড় ভাই মো. ফজলুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, তারা কোনো মামলা করতে চাচ্ছেন না। তবে ঘটনার তিন দিন পর মঙ্গলবার ফজলুর রহমান নিজে বাদী হয়ে চারজন আসামির নাম উল্লেখ করাসহ ১৮০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

আসামিদের মধ্যে দুইজনের জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এদিকে, আসামিদের "কাউকে খুঁজে না পাওয়ায়" গ্রেফতার করা যায়নি বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।

যদিও বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন মামলার এক নম্বর আসামি মুহাম্মদ খাজা আহমেদ। তিনি জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে স্থানীয় জামায়াতের সাথে যুক্ত।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ঘটনার দিন থেকেই খাজা আহমেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একের পর এক পোস্ট করতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মামলার পরদিনও দুই নম্বর আসামি আসাদুজ্জামানকে স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতে দেখা গেছে। তিনি দৌলতপুর উপজেলা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে আছেন।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডে তাদের কারও সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস।

মামলার এজাহারে যা আছে

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এক নম্বর আসামি খাজা আহমেদের নির্দেশে অন্যান্য আসামিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দরবারে প্রবেশ করে ভাংচুর চালায়।

তিন নম্বর আসামিসহ অন্যরা দোতলায় উঠে আব্দুর রহমানসহ দুইজনের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

এতে আরো বলা হয়েছে, আসামিরা দরবারে ভাংচুর ও আগুন দিয়ে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি করে।

এছাড়া দরবারের ভেতরে থাকা নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও আট লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের আনুমানিক চার ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে নিয়ে যায় অজ্ঞাতনামা আসামিরা।

আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে থানায় গিয়ে মামলা করতে দেরি হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করেছেন বাদী।

বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার বিকেলে পীরের ভক্ত ও গ্রামবাসীর মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Collected

ছবির ক্যাপশান, বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার বিকেলে পীরের ভক্ত ও গ্রামবাসীর মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

জামায়াতে ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের বিবৃতি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এদিকে, আব্দুর রহমান হত্যার ঘটনায় মামলা করার পর সংবাদ সম্মেলন করে ও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস।

বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়া জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন।

ওই ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা এর কোনো নেতাকর্মীর ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠ করেন তিনি।

এতে বলা হয়, "সম্প্রতি ফিলিপনগরে সংঘটিত মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সাবেক জেলা সভাপতি জনাব মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে প্রধান আসামি হিসেবে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি দলের আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতাকেও এ ঘটনায় সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে"।

এমন অভিযোগকে দলের পক্ষ থেকে "সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ" দাবি করা হয়।

এমনকি হামলার দিন "ঘটনাস্থলে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি ছিল - যা এ ঘটনাকে ঘিরে জনমনে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে" বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে মামলার দুই নম্বর আসামি আসাদুজ্জামানের সমর্থনে মঙ্গলবারই একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা শাখা।

এতে আব্দুর রহমান হত্যাকাণ্ডে আসাদুজ্জামানকে "পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা আসামি" করায় দলটির পক্ষ থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, "আমরা যতটুকু জানি, ফিলিপনগরের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ নয়"।

"স্থানীয়ভাবে আকস্মিকভাবে" ঘটা এই ঘটনায় "পরিকল্পিতভাবে আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে" বলেও দাবি করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ঘটনার দিনের ভিডিও ফুটেজে আসাদুজ্জামানকে দরবারের দোতলা থেকে হাতে কিছু একটা নিয়ে নেমে আসতে দেখা গেছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঘটনার দিন মাজারটির সামনে স্থানীয়রা

ছবির উৎস, AHMED RAJU

ছবির ক্যাপশান, ঘটনার দিন মাজারটির সামনে স্থানীয়দের ভিড় দেখা যায়

বাদী ও পুলিশ যা বলছে

আব্দুর রহমান হত্যার ঘটনায় তিন দিনেও কাউকে গ্রেফতার কেন করা যায়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আসামিদের খুঁজে পাচ্ছি না, চেষ্টা করতেছি। অভিযান অব্যাহত আছে আমাদের"।

মামলার পরদিনও আসামিদের একজনকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, "না, এলাকায় নাই। পাচ্ছি না"।

এ নিয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই ঘটনার সাথে অনেক মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে 'আইডেন্টিফিকেশন' বা শনাক্তকরণের কাজ চলছে।

"ওই বাসায় তো নিজস্ব কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না। সো পাবলিক যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে সেগুলো কালেকশন (সংগ্রহ) করতে হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি," বলেন তিনি।

এছাড়া এক নম্বর আসামির ফেসবুকে সক্রিয় থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মি. জসীম উদ্দিন বলেন, "আমাদের তো অনেক লোক বিদেশে থেকেও ফেসবুকে অ্যাক্টিভ। এখন সে কোথা থেকে অ্যাক্টিভ হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি"।

অন্যদিকে মামলার বাদী ফজলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, 'শোকাহত' হওয়ায় এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না এখন।

তবে প্রথমে মামলা করবেন না বললেও পরবর্তী সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে আলোচনা করে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মি. রহমান।

এছাড়া আসামিদের গ্রেফতার না করার বিষয়েও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পীর পরিচয় দেওয়া আব্দুর রহমানের তিন বছর আগের একটি ভিডিও'র কাটছাঁট অংশ ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে।

তারই সূত্র ধরে কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে শনিবার দুপুরের দিকে স্থানীয় একদল লোক একত্রিত হয়ে 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' এ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়।

পরে আহত অবস্থায় তিনজনকে দৌলতপুরের থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মি. রহমান মারা যান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোটা নিয়ে কয়েকশ লোক ওই দরবারে প্রথমে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগে, নিহত আব্দুর রহমান ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিন মাস কারাগারে ছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।