আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ব্যাঙ্কসি কে? রহস্যময় এক শিল্পীর পরিচয় উন্মোচন
- Author, বি সোয়ালো
- Role, ব্রিস্টল, বিবিসি
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
তিন দশক ধরে কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, ভোগবাদকে বিদ্রূপ করেছেন এবং জনসমক্ষে থাকা স্থানগুলোকে বেদনাবিধুর ক্যানভাসে রূপান্তর করেছেন ব্যাঙ্কসি। আর এই সবকিছুই করেছেন নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখার মাধ্যমে।
তার স্বতন্ত্র শিল্পকর্মগুলো প্রায়ই কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই আবির্ভূত হয়, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়; তবে শিল্পী নিজে নীরবে আড়ালেই থাকেন।
গণমাধ্যমে তাকে প্রায়ই 'ধরাছোঁয়ার বাইরে' ও 'গোপনীয়' বলে বর্ণনা করা হয়।
এই 'গেরিলা স্ট্রিট আর্টিস্ট' কারও কাছে নায়ক, আবার কারও কাছে ধ্বংসাত্মক বা অসভ্য আচরণকারী ব্যক্তি। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা মানুষটি আসলে কে?
রয়টার্সের একটি তদন্তে দাবি করা হয়েছে—বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান এই শিল্পীর মুখোশ তারা উম্মোচন করেছে। কিন্তু অনেক ভক্ত মনে করেন, সংবাদ সংস্থাটি ভুল করেছে, আর তাই জল্পনা চলছেই।
ক্যারিয়ারের শুরু
রয়টার্সের তদন্তে শিল্পীর প্রকৃত নামের সূত্র অনুসরণ করার দাবি করা হয়েছে—যে তত্ত্বটি তার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে অনেকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লন্ডন ও তার বাইরেও ধারাবাহিকভাবে নতুন ম্যুরালের আবির্ভাব। ফলে আবারও ঘুরে ফিরে আসছে সেই পরিচিত প্রশ্ন–– ব্যাঙ্কসি আসলে কে?
ধারণা করা হয়, ব্যাঙ্কসির জন্ম ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে ব্রিস্টল ম্যাটার্নিটি হাসপাতালে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ব্রিস্টলের বিভিন্ন জায়গায় তার বিখ্যাত স্টেন্সিলকৃত নকশাগুলো (কোনো নকশা বা প্যাটার্নের রেপ্লিকা তৈরির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা চিত্র) স্প্রে-পেইন্ট করার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান।
১৯৯৯ সালে স্টোকস ক্রফটে তার বিখ্যাত 'মাইল্ড, মাইল্ড ওয়েস্ট' ম্যুরাল আঁকার সেই বছরেই তিনি লরেন্স ওয়েস্টনে কিশোরদের জন্য শিল্পকর্মের ক্লাসও নিয়েছিলেন।
এই সেশনগুলোর যেসব ছবি বিবিসি এককভাবে সংগ্রহ করেছে, সেগুলো ব্যাঙ্কসির সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে।
শহরটির প্রভাবশালী সঙ্গীত ও শিল্প-সংস্কৃতি তার কাজকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে ধারণা করা হয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন-
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাঙ্কসির কাজ আরও উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে নানা শহরে দেখা যেতে শুরু করে-যা গণমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
মুখোশধারী শিল্পী হিসেবে কর্তৃত্বকে বিদ্রূপ করার তার পৌরাণিক ভাবমূর্তি তাকে বা অন্তত তার ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
লস অ্যাঞ্জেলেস ও লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে তার কাজের প্রদর্শনীগুলো দর্শকপূর্ণ ছিল।
রাজনৈতিক বার্তাসম্পন্ন তার শিল্পকর্ম বিপুল দামে বিক্রি হতে থাকে, যার ক্রেতাদের মধ্যে ছিলেন ব্র্যাড পিট, পল স্মিথ ও ক্রিস্টিনা আগুইলেরার মতো এ-লিস্ট তারকারা।
২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র 'এক্সিট থ্রু দ্য গিফট শপ' যেখানে ব্যাঙ্কসিকে কাজ করতে দেখা যায়। সেটি অস্কার ও বাফটা মনোনয়ন পায়।
২০১৫ সালে শৈশবে দেখা ওয়েস্টন-সুপার-মেয়ারের জীর্ণ ট্রপিকানা লাইডোকে তিনি রূপ দেন ব্যঙ্গাত্মক পর্যটন আকর্ষণ ডিজমাল্যান্ড-এ।
এর তিন বছর পর, পারফরম্যান্স আর্টের এক নাটকীয় মুহূর্তে তিনি সোথেবির নিলামে তার গার্ল উইথ বেলুন বিক্রি হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটিকে সরাসরি কুচি কুচি করে দেন, যার দাম উঠেছিল ১০ লাখ পাউন্ড।
ব্যাঙ্কসির শিল্পকর্ম কীভাবে যাচাই করা হয়?
ব্যাঙ্কসির কাজের সত্যতা নিশ্চিত করে 'পেস্ট কন্ট্রোল অফিস'। সত্যতা যাচাই, বিক্রি ও কপিরাইট বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শিল্পী নিজেই এই সংস্থাটি গড়ে তুলেছেন।
পেস্ট কন্ট্রোল কোনো কাজকে স্বীকৃতি না দিলে, সেটি যতই বিশ্বাসযোগ্য মনে হোক না কেন, আনুষ্ঠানিক ব্যাঙ্কসি হিসেবে গণ্য হয় না।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন-
ব্যাঙ্কসির পরিচয় সম্পর্কে আমরা আসলে কী জানি?
অতীতে বিভিন্ন নাম ব্যাঙ্কসির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রবার্ট ডেল নাজা, রবিন গানিংহ্যাম, আর্ট অ্যাটাক-এর নীল বুকানন কিংবা ব্রিস্টলের কোনো শিল্পী গোষ্ঠী।
২০০৮ সালে গানিংহ্যাম নামটি সামনে এসেছিল দ্য মেইল এবং তাকে বর্ণনা করা হয়েছিল 'মধ্যবিত্ত উপনগরে বেড়ে ওঠা এক সাবেক পাবলিক স্কুল শিক্ষার্থী' হিসেবে।
এই তত্ত্বকে আরও জোরালো করে, ২০২৩ সালে বিবিসি উদ্ধার করে এমন একটি সাক্ষাৎকারে যেখানে শিল্পী নিজের প্রথম নাম 'রবি' বলে নিশ্চিত করছেন বলে মনে হয়।
২০২৬ সালের মার্চে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো আইনি নথির ভিত্তিতে তারা ব্যাঙ্কসিকে রবিন গানিংহ্যাম হিসেবে শনাক্ত করেছে। সংবাদ সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে গ্রাফিতির অভিযোগে গ্রেফতারের একটি ঘটনাকে ওই শিল্পীর সঙ্গে যুক্ত করা যায় কারণ পুলিশি নথিতে তার প্রকৃত নাম ছিল।
রয়টার্সের দাবি, পরিচয় গোপনের এই অসাধারণ প্রচেষ্টা ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরের পর ভেঙে পড়তে শুরু করে যখন নিউইয়র্কে একটি বিলবোর্ড বিকৃত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
সংস্থাটি আরও জানায়, ব্যাঙ্কসির জন্ম রবিন গানিংহ্যাম নামে হলেও পরে তিনি ডেভিড জোন্স নাম নেন যদিও তিনি এখনো এই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ব্যাঙ্কসির ঘনিষ্ঠরা এ ব্যাখ্যাকে জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তার সাবেক ম্যানেজার স্টিভ লাজারাইডেস বলেন, সংস্থাটি "একটি ভূত অনুসরণ করছে"।
তিনি যোগ করেন, শিল্পী কয়েক দশক আগে আইনগতভাবে নাম বদলেছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আগের পরিচয়গুলো মুছে ফেলেছেন।
"রবিন গানিংহ্যাম বলে কেউ নেই," তিনি বলেন। "আপনারা যে নামটি পেয়েছেন, সেটাকে আমি বহু বছর আগে মেরে ফেলেছি। তাকে আপনারা কখনো খুঁজে পাবেন না।"
আজকের ব্যাঙ্কসি
এখন তার বয়স পঞ্চাশের কোঠায় বলে মনে করা হয় এবং ব্যাঙ্কসি এখনো সমানভাবে সৃজনশীল। মধ্যবয়সে পৌঁছেও তার কাজের গতি কমেনি বরং আগের চেয়ে আরও উচ্চকণ্ঠ ও রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার কাজ ইউক্রেনের যুদ্ধ, প্রতিবাদের অধিকার, অভিবাসন, বন্যপ্রাণীর ক্ষয় এবং পুলিশি ক্ষমতা নিয়ে কথা বলেছে।
তার ম্যুরালগুলো প্রায়ই কয়েক দিনের মধ্যে হারিয়ে যায়, চুরি হয়ে, বিকৃত হয়ে বা সরিয়ে ফেলা হয় যা একটি দিকে তাদের ভঙ্গুরতা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক মূল্য আরও জোরালো করে।
তার সব কাজ অবশ্য প্রকাশ্যভাবে রাজনৈতিক নয়। অনেক শিল্পকর্মেই সমাজ নিয়ে কৌতুকপূর্ণ বা বিদ্রুপাত্মক বার্তা থাকে।
২০২১ সালে 'দ্য গ্রেট ব্রিটিশ স্প্রেকেশন' নামে ১০টি স্ট্রিট আর্টে দেখা যায় যেখানে চিপসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে গাংচিল, বালু ও নৌকায় খেলছে শিশু, আর একটি ইঁদুর ডেকচেয়ারে হেলান দিয়ে ককটেল উপভোগ করছে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে লন্ডনে বন্যপ্রাণী বিষয়ক শিল্পকর্মগুলো প্রকাশ পায় টানা আট দিনে আটটি কাজ। প্রায়শই যেমন হয়, সব শিল্পকর্ম অক্ষত থাকেনি।
ব্যাঙ্কসি বলে নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাতিগুলোর ওপর দ্রুত ডোরাকাটা দাগ আঁকা হয়, নেকড়েটিকে চুরি করা হয়, বিড়ালটি প্রকাশের দিনই সরিয়ে ফেলা হয়, আর এক মুখোশধারী ব্যক্তি গন্ডারের ওপর গ্রাফিতি ট্যাগ এঁকে দেয়।
গত বছর রয়্যাল কোর্টস অফ জাস্টিস ভবনের পাশে উন্মোচিত প্রতিবাদকারীর ওপর হাতুড়ি উঁচিয়ে ধরা বিচারকের ম্যুরালটিও দ্রুত মুছে ফেলা হয়।
২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, ব্যাঙ্কসি নিশ্চিত করেন লন্ডনের সেন্ট জেমস এলাকায় একটি বড় ভাস্কর্য তারই কাজ। সেখানে দেখা যায়, স্যুট পরা এক ব্যক্তি একটি পতাকা বহন করে প্লিন্থ বা স্তম্ভ থেকে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, পতাকাটি তার মুখ ঢেকে রেখেছে।
'মুখোশধারী যোদ্ধা'
ব্র্যান্ডলার আর্ট গ্যালারির পরিচালক জন ব্র্যান্ডলার মনে করেন, ব্যাঙ্কসির জন্য বেনামে থাকা সুবিধাজনক "যাতে তিনি রাস্তায় হেঁটে যেতে পারেন" পরিচিতি ছাড়াই।
তবে তার মতে, যত যাই হোক, ব্যাঙ্কসি ব্র্যান্ড টিকে থাকবে।
"শিল্পজগতের কাছে এখন আর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়," তিনি বলেন।
"শুরুতে বেনামি থাকা, মুখোশধারী যোদ্ধা, তাকে আলাদা করে তুলেছিল। কিন্তু এখন তা আর বিষয় না। তার টিম ব্যাঙ্কসি ব্র্যান্ডকে এতটাই শক্তিশালী করেছে যে এতে কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি খুব চালাক। এটা দারুণ মার্কেটিং।"