ফিলিস্তিনি শরণার্থীর গোলে ভারতসেরা হল কলকাতার 'উদ্বাস্তুদের ক্লাব'

ইস্টবেঙ্গল জেতার পর গ্যালারিতে একজন সমর্থকের উল্লাস

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times vis Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইস্টবেঙ্গল জেতার পর গ্যালারিতে একজন সমর্থকের উল্লাস
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু ও ছিন্নমূল মানুষের ক্লাব বলে পরিচিত কলকাতার ইস্টবেঙ্গল যখন বৃহস্পতিবার রাতে আইএসএল টুর্নামেন্ট জিতে ভারতসেরা ক্লাবের খেতাব পেল, তখন সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস স্টেডিয়ামে যেভাবে আছড়ে পড়ে তাতে প্রায় ঘন্টাখানেক ফুটবলারদের হাতে বিজয়ীর ট্রফি তুলে দেওয়া যায়নি।

ইস্টবেঙ্গল এই জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর পর জাতীয় স্তরের কোনো টুর্নামেন্টই শুধু জিতল না – একটানা ব্যর্থতা ও হতাশার গ্লানি কাটিয়ে সমর্থকরাও প্রিয় ক্লাবকে ঘিরে একটা নতুন আশায় বুক বাঁধতে পারলেন।

তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের নাগরিক অধিকার নিয়ে বারবার যে সব প্রশ্ন উঠছে – কখনো এনআরসি, কখনো সিএএ বা কখনো এসআইআরের হাত ধরে – সেই পটভূমিতেও ইস্টবেঙ্গলের এই জয় একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

কারণ ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা সাম্প্রতিক অতীতে যেভাবে বারে বারে তাদের গ্যালারি থেকে নাগরিক অধিকারের পক্ষে সরব হয়েছেন, তাতে এই জয় তাদের সেই স্লোগানকে এখন অনেক জোরালো করে তুলছে।

ফলে কলকাতার কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে গত রাতে ও অত:পর সোশ্যাল মিডিয়াতে যে আবেগের বিস্ফোরণ ও আনন্দাশ্রুর ধারা বইতে দেখা যাচ্ছে – তা বোধহয় একেবারেই অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত ছিল না।

আইএসএল ট্রফি নিয়ে ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা। ফিলিস্তিনের পতাকা জড়িয়ে মুহাম্মদ রশিদ

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times vis Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আইএসএল ট্রফি নিয়ে ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা। ফিলিস্তিনের পতাকা জড়িয়ে মুহাম্মদ রশিদ

ইস্টবেঙ্গলের এই সাফল্যে আরও একটা অভিনব ব্যাপার হলো, 'ইন্টার কাশী' দলের বিরুদ্ধে যে জয়সূচক গোলটি ক্লাবকে এই শিরোপা এনে দিল – সেটিও এসেছে ফিলিস্তিনের শরণার্থী ফুটবলার মুহাম্মদ রশিদের পা থেকে।

সাংবাদিক ও ভাষ্যকার অর্ক ভাদুড়ী সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখেছেন, "এখনও ঘোর কাটছে না৷ তার মধ্যেই মনে হচ্ছে, এটা কি নেহাতই সমাপতন যে ইস্টবেঙ্গলের ২২ বছরের শাপমুক্তির গোল এল ফিলিস্তিনের পতাকা শরীরে জড়িয়ে নেওয়া মুহাম্মদ রশিদের পা থেকে?"

"রশিদের হাতে ট্রফি, শরীরে জড়ানো ফিলিস্তিনের পতাকা - শুধু এই দৃশ্যটুকু দেখার জন্য বেঁচে থাকা যায়!", মন্তব্য করেছেন তিনি।

কলকাতা শহরে শরণার্থীদের ফুটবল ক্লাব হিসেবে পরিচিত ইস্টবেঙ্গল তাদের ১০৬ বছরের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একটি ট্রফি জিতল বিশ্বের অন্য প্রান্তের আর এক শরণার্থীর বুট দিয়ে, এই মেটাফোর বা রূপকটাও সমর্থকদের নজর এড়াচ্ছে না – এবং যথারীতি সেটা তাদের আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাতে ইস্টবেঙ্গলের গ্যালারিতে জয়ের লাল মশাল

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times vis Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতিবার রাতে ইস্টবেঙ্গলের গ্যালারিতে জয়ের লাল মশাল

এসআইআর, 'অনুপ্রবেশ' ইস্যু আর ইস্টবেঙ্গলের জয়

গুয়াহাটি আইআইটি-র অধ্যাপক ও ইস্টবেঙ্গলের গোঁড়া সমর্থক শুভ্রদীপ ঘোষ ক্লাবের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর লিখেছেন :

"কলকাতা আজ ঘুসপেটিয়াদের।

কলকাতা আজ ছারপোকাদের।

কলকাতা আজ উদ্বাস্তুদের!"

ভারতের শাসক দল বিজেপির সর্বোচ্চ নেতারা যে তাদের ভাষায় কথিত অনুপ্রবেশকারীদের 'ঘুসপেটিয়া' বলে সম্বোধন করেন সেটা কোনো নতুন কথা নয়।

পশ্চিমবঙ্গে জেতার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ঘোষণা করেছেন, 'ঘুসপেটিয়া'দের ঠেকানোই হবে নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষজনকে 'টার্মাইট' বা উইপোকার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এরাই এদেশের সম্পদে ভাগ বসাচ্ছে এবং এবং ভারতকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

শুভ্রদীপ ঘোষ বলতে চেয়েছেন, ইস্টবেঙ্গলের এই জয় উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের প্রতি বিজেপি নেতাদের সেই অপমানেরই জবাব।

২০২০-তে কলকাতা ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে টিফো

ছবির উৎস, EB

ছবির ক্যাপশান, ২০২০-তে কলকাতা ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে টিফো

পশ্চিমবঙ্গে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে 'এসআইআর' বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এবং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যের ২৭ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দার নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

এই বাদ-পড়াদের মধ্যে মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলোর বহু বাসিন্দা যেমন আছেন – তেমনি নদীয়া বা উত্তর ২৪ পরগণার হিন্দু ধর্মাবলম্বী মতুয়া সম্প্রদায়েরও বহু মানুষ আছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বহু পর্যবেক্ষকই মনে করেন, এসআইআর সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার থেকেই শুধু বঞ্চিত করেনি - তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকারকেও খর্ব করেছে।

বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করেছে, যাদের নাম এসআইআর প্রকল্প থেকে বাদ পড়েছে তারা আপাতত সরকারের বিভিন্ন ভাতা বা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।

এই গোটা বিতর্কের পটভূমিতে উদ্বাস্তুদের দল হিসেবে পরিচিত একটি ফুটবল ক্লাবের সাফল্যকে দলটির অনেক সমর্থকই সেই অবিচার বা বঞ্চনার একটি প্রতিবাদ হিসেবেই দেখছেন।

যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সিএএ-র বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের প্রতিবাদ

ছবির উৎস, EB

ছবির ক্যাপশান, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সিএএ-র বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের প্রতিবাদ

গ্যালারি উত্তাল ছিল নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধেও

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রায় সাড়ে ছ'বছর আগে সারা ভারত যখন বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উত্তাল, তখন সেই বিক্ষোভের রেশ আছড়ে পড়েছিল ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতেও।

২০২০ সালের ২০শে জানুয়ারি কলকাতার আইকনিক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে মুখোমুখি হয়েছিল শহরের দুই জনপ্রিয় ক্লাব মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল।

শহরের এই ফুটবল ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে হঠাৎই দেখা যায় পেল্লায় প্ল্যাকার্ড বা টিফো : "রক্ত দিয়ে কেনা মাটি, কাগজ দিয়ে নয়!"

পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা 'বাঙাল'দের দল হিসেবে পরিচিত ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা কার্টুন চরিত্র 'বাঁটুল দ্য গ্রেটে'র আদলে নিজেদের 'বাঙাল দ্য গ্রেট' বলেও তুলে ধরেন বিশালাকার পোস্টারে।

এনআরসি নিয়ে ভয় দেখাতে এলে কীভাবে "সজোরে লাথি মেরে বাঙালরা তাদের এলাকা-ছাড়া করবে", তুলে ধরা হয় সেই ছবিও।

যে কট্টর ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা এই সব পোস্টারের পেছনে ছিলেন তারা পরে জানান, "গত কয়েকমাস ধরে যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে বা তার বাইরেও আমাদের এবার দেশছাড়া করা হবে বলে টিটকিরি দিয়ে আসছে - এই সব পোস্টার তারই জবাব!"

সমাজ বিশ্লেষকরাও তখন বলেছিলেন, দেশভাগের পর যে সব পরিবার আজকের ভারতে চলে এসেছিলেন, সিএএ-এনআরসি নতুন করে তাদের মধ্যে ছিন্নমূল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল বলেই ফুটবল স্টেডিয়ামেও তা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছিল।

দল জেতার পর ড্রেসিংরুমে কোচ অস্কার ব্রুজো ও ফুটবলারদের উল্লাস

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times vis Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দল জেতার পর ড্রেসিংরুমে কোচ অস্কার ব্রুজো ও ফুটবলারদের উল্লাস

'ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাসই প্রতিবাদের'

ইস্টবেঙ্গল আসলে এমন একটি দল যা ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষদের পশ্চিমবঙ্গে একটি স্বকীয় পরিচিতি দিয়েছিল।

কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল অবশ্য ১৯২০ সালে। তখনো দেশভাগ অনেক দূরের ব্যাপার, তবু ক্লাবের ওই নামকরণ হয়েছিল - কারণ এর প্রতিষ্ঠাতারা পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন।

ইস্টবেঙ্গলে ক্লাবের প্রধান কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার কিছুদিন আগেই বিবিসিকে বলেছিলেন, প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই এই ক্লাবটির সঙ্গে প্রতিবাদের নাম জড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, "১৯৪৫ সাল থেকেই পূর্ববঙ্গীয় মানুষরা আসতে শুরু করেছিলেন কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে। ততদিনে ১৯৪৩ সালের শিল্ড জিতে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে ইস্টবেঙ্গল।"

"১৯১১ সালে ব্রিটিশদের হারিয়ে শিল্ড জয় করে মোহনবাগান তার আগেই হয়ে উঠেছিল এক কিংবদন্তি, ৪৩-এ শিল্ড জিতে ইস্টবেঙ্গলও সেই কাতারে উঠে আসে।"

ইস্টবেঙ্গলের প্রধান কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার
ছবির ক্যাপশান, ইস্টবেঙ্গলের প্রধান কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার

তিনি আরও জানাচ্ছেন, সেই শিল্ড জেতার দিনেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে চলা 'ভারত ছাড়ো আন্দোলনে' সংহতি প্রকাশ করে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরাও কলকাতা ময়দানে 'ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো' স্লোগান দিয়েছিলেন।

আসলে পূর্ববঙ্গ থেকে যখন দলে দলে মানুষ এসে ছিন্নমূল পরিচয় ঘোচানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাদের নতুন করে পরিচয় গড়ার ক্ষেত্রে এক বড় সম্বল হয়ে উঠেছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব।

কলকাতার মাঠে তখন থেকেই মোহনবাগানের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে এসেছিল ইস্টবেঙ্গল, পাশাপাশি দেশভাগের যন্ত্রণার শিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন ওই ক্লাবটির খেলার মধ্যে দিয়ে।

গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলেছে, ২০২৬ সালে এসে আইএসএল ট্রফি জেতাকে সেভাবেই দেখতে ভালবাসছেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা।