মাগুরার আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

Published
পড়ার সময়: ৩ মিনিট

বহুল আলোচিত মাগুরার আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রেখেছে আদালত।

মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি নিয়ে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

হিটু শেখ ধর্ষণের শিকার আট বছর বয়সী শিশুটির বোনের শ্বশুর।

২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে শিশুটি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

গুরুতর আহত এবং অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আটদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল সিএমএইচে ১৩ই মার্চ শিশুটি মারা যায়।

এ ঘটনায় দেশব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সেসময়।

শিশুটির মায়ের দায়ের করা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখকে ২০২৫ সালের ১৭ই মে মৃত্যুদণ্ড দেয় মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

সে রায়ে মামলার বাকি তিন আসামি শিশুটির বোনের জামাতা, জামাতার ভাই এবং তাদের মাকে খালাস দেওয়া হয়।

চলতি বছরের ১০ই জুন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় হাইকোর্টে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি।

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনতে গঠিত ওই বেঞ্চে মাগুরার আলোচিত শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ১১ই অগাস্ট।

কী হয়েছিলো তখন

২০২৫ সালের মার্চ মাসে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বোনের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় আট বছরের শিশু আছিয়া।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ছয়ই মার্চ শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় মাগুরা আড়াইশ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে আসেন এক নারী।

হাসপাতালে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে শিশুটির গলায় দাগ ও শরীরে বেশ কিছু জায়গায় আঁচড় দেখতে পান।

চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে পুলিশ তখন জানায়, শিশুটির যৌনাঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো।

গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে ঢাকায় আনার পর চিকিৎসকরা জানান যে, তার শারীরিক অবস্থা 'ক্রিটিক্যাল'।

সাতই মার্চ রাত থেকে শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়। প্রায় আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ১৩ই মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল সিএমএইচে তার মৃত্যু হয়।

ওইদিন সন্ধ্যায় তার মরদেহ সামরিক হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সিএমএইচ থেকে সরাসরি মাগুরায় নেওয়া হয়।

এ ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

সেসময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোসহ নানা মতের মানুষ শিশুটির বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো, কেউ কেউ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো।

'ধর্ষকের' ফাঁসির দাবি ছিল এলাকাবাসীর

ওই ঘটনায় গত বছরের আটই মার্চ আট বছরের শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় চার জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন।

মামলায় শিশুটির বোনের স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভাশুরকে আসামি করা হয়েছিলো। তবে তারা আগে থেকেই পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। কিন্তু মামলার পর তাদেরকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তুলে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

মামলার অগ্রগতি বিষয়ে মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী তখন বিবিসিকে বলেন, "গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।"

নিহত শিশুটির বাবা মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগছেন। নিহত শিশুটি ছাড়া তার আরো দুইটি মেয়ে আর এক ছেলে রয়েছে।

শিশুটির বড় বোনকেই শুধু বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, বাকিরা ছোট। পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় এখন তাদের মা-ই কোনোভাবে সংসারের খরচ চালান।

শিশুটির মৃত্যুর পর ২০২৫ সালের ১৩ই মার্চ রাতেই ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার আসামিদের বাড়িতে, যা তার বোনেরও শ্বশুর বাড়ি, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায় এলাকাবাসী।

এ সময় তারা "আমাদের এলাকায়, ধর্ষকের ঠাঁই নাই" স্লোগান দিয়ে ধর্ষকদের ফাঁসি দাবি করে।

স্থানীয়রা সেসময় বলেছিলেন, "এ এলাকায় অতীতে এমন ঘটনা ঘটেনি। এটি আমাদের অসম্মানিত করেছে। এখানে ধর্ষকের কোনো ঠাঁই হবে না।"

পরে ২০২৫ সালের ১৭ই মে এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামী শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আদালত।

কিন্তু রায় ঘোষণার পর এক বছর পার হওয়ার পরেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আটকে ছিল অপরাধীর শাস্তি।