পশ্চিমবঙ্গে 'রেকর্ড ভোটদানের' পেছনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়, নাকি অন্য সমীকরণ?

দার্জিলিং জেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে মানুষের লাইন

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, দার্জিলিং জেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে মানুষের লাইন
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী ও প্রত্যুষ রায়
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা ও দিল্লি
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ভারতের নির্বাচন কমিশন যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের ভোটদানের ইতিহাসে আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় যে পরিমাণে মানুষ ভোট দিয়েছেন তা নজিরবিহীন বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সমাজের সব স্তরের বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছেন।

এবারের ভোটে জাল ভোট বা কারচুপিরতেমন গুরুতর অভিযোগ আসেনি কোনো দলের তরফ থেকেই।

এর আগে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে রেকর্ড ভোটিং হয়েছিল ২০১১ সালে। সেই বছর ভোটদানের হার ছিল ৮৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। সেই নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে ছিল এক মাইলফলক।

ওই নির্বাচনেই ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা ব্যানার্জী শুরু করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন ইনিংস।

ভোটদানের এই হার দেখে একটি শুনানির সময়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, "দেশের মানুষ ভোটদানে এগিয়ে এলে গণতন্ত্র মজবুত হয়।"

ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত নারী ভোটাররা

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত নারী ভোটাররা

কোথায় কত ভোট পড়ল?

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯২ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।

মুসলমান অধ্যুষিত আসনগুলোতে ভোটদানের হার বেশি বলে দেখা যাচ্ছে।

যেমন, উত্তরাঞ্চলীয় কোচবিহার জেলার শীতলকুচিতে ভোট পড়েছে ৯৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, মালদা জেলার মোথাবাড়িতে ৯৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় ৯৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ, জঙ্গিপুরে ৯৫ দশমিক ৭২ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ায় ৯৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, হেমতাবাদে ৯৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার, প্রথম দফায় ভোট গ্রহণের দিন সকাল থেকে যে সব আসনে গণ্ডগোলের খবর আসছিল, সেখানেও বিপুল হারে ভোট পড়েছে। যেমন ডোমকলে ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, রেজিনগরে ৯২ দশমিক ১৭ শতাংশ, কুমারগঞ্জে ৯৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

তবে মুসলিম সংখ্যালঘু ও হিন্দু অধ্যুষিত বেশিরভাগ আসনেও দেখা যাচ্ছে ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, জলপাইগুড়ি, পুরুলিয়া জেলার বেশিরভাগ আসনে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের বেশি।

মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান, না এসআইআর আতঙ্ক?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদে কর্মসূত্রে রাজ্যের বাইরে থাকা বহু মানুষ ভোটের আগে বাড়িতে ফিরেছেন।

নির্বাচনের আগে নিজের বাড়ি ফেরার ট্রেন্ড পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়, তবে এই বার উচ্চপদস্থ চাকরিজীবি থেকে পরিযায়ী শ্রমিক, সবারই নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার তাগিদ ছিল চোখে পড়ার মতো।

নির্বাচনের ১০ দিন আগে থেকে ট্রেন, বাস ও প্লেনে টিকিট ছিল কার্যত অমিল। হাওড়া, শিয়ালদহ, নিউ জলপাইগুড়ি, মালদা টাউন, বর্ধমান জংশন স্টেশনগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়।

এমনকি বিজেপির তরফ থেকে একাধিক বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানো হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের কাছে আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

প্রথম দফার ভোট গ্রহণের দিন গ্রামাঞ্চলের ভোটদান যারা দেখছেন, তারা জানাচ্ছেন যে এদিন সকাল থেকেই ভোট দানের হার উল্লেখযোগ্য রকমের বেশি ছিল।

প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য।

প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিন তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এত বছর ধরে ভোট দেখছি, সবসময়েই দেখেছি যে গরমের কারণে হয় খুব সকালে, নয়তো রোদ পড়ে আসার পরে – আড়াইটে-তিনটে থেকে ভোটারদের লাইন বড় হতে থাকে। কিন্তু এবার দেখছি সকাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে ভোট দানের হার বেড়ে চলেছে।"

২৩শে এপ্রিল বৃহস্পতিবার, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের যখন প্রথম দফার ভোটগ্রহণ পর্ব চলছিল, তখন অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছিল।

প্রথম দফার ভোট গ্রহণের দিন নন্দীগ্রাম আসনে স্বাভাবিক ভোটদানের চিত্র দেখতে পেয়েছে বিবিসি নিউজ বাংলা।

এই কেন্দ্রটি রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষের কারণে বহুবার অতীতে শিরোনামে এসেছে। এবার অবশ্য এমন কোনো খবর নেই। ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহী হয়ে বুথে আসতে দেখা গেছে।

নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ভোট গ্রহণ পশ্চিমবঙ্গে

ছবির উৎস, Rupak De Chowdhuri/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ভোট গ্রহণ পশ্চিমবঙ্গে
মুর্শিদাবাদে তৃণমূল কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে পথে পুলিশ বাহিনী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, মুর্শিদাবাদে তৃণমূল কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে পথে পুলিশ বাহিনী

'বারের ভোটটা দিতেই হবে'

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর এবং এর কারণে প্রায় ৯১ লাখের মতো নাম বাদ যাওয়া নিয়ে সরগরম ছিল এই রাজ্যের রাজনীতি। বহু সাধারণ ভোটার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তাদের মনে ভয় ছিল যে এবার ভোট না দিলে তারা হয়তো পরবর্তী ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন না, যার ফলে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বহু পরিযায়ী শ্রমিকও নিজের কর্মস্থান থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এই ভয় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যেই। যদিও আধিকারিক স্তরে এমন কোনো বিবৃতি আসেনি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য দেখাচ্ছে, যেসব বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটারদের নাম বাদ পড়ার হার বেশি, সেই সব কেন্দ্রে ভোটদানের হারও বেশি।

মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা, ডোমকল, বেলডাঙা, ভগবানগোলা, জঙ্গিপুর; মালদা জেলার হাবিবপুর, বীরভূমের হাসন, উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া ইত্যাদি সব কেন্দ্রেই ভোটদানের হার গত বছরের থেকে বেশি।

এই অঞ্চলগুলো থেকে বহু মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে কাজে যান। কিন্তু এবার অনেকেই ভোট দেওয়ার জন্য ফিরেছেন।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলেন যে, "এসআইআরের পরে যাদের নাম ভোটার তালিকায় থেকে গেছে, তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে এবারের ভোটটা দিতেই হবে। একটা প্রমাণ রাখার তাগিদ আমরা দেখছি মালদা – মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে"।

"কখনও দেখিনি যে ভোটার স্লিপের ফটোকপি করে রাখছেন মানুষ। এবারে সেটাও করেছেন তারা – যাতে পরবর্তীতে প্রমাণ করা যায় যে এসআইআরের পরে তার নাম ভোটার তালিকায় ছিল এবং তিনি ভোট দিয়েছেন," বলেন তিনি।

কলকাতার সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সবর ইনস্টিটিউট'এর গবেষক সাবির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলমান অধ্যুষিত আসনগুলোতে প্রচুর সংখ্যক ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রচুর ক্ষোভ জমা হয়েছিল। কিন্তু তারা এবার সেই ক্ষোভ উপেক্ষা করে এসআইআরে হয়রানির বিরুদ্ধে ভোট দিতে একজোট হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।

"ভোটদানের এই হার দেখে মনে হচ্ছে মানুষ এবার নিশ্চিত করতে চাইছেন যাতে তারা ভবিষ্যতেও ভোট দিতে পারেন," বলছিলেন মি. আহমেদ।

মুর্শিদাবাদে একটি ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটারদের লাইন

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুর্শিদাবাদে একটি ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটারদের লাইন

কী বলছে অঙ্কের হিসাব?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এই রেকর্ড ভোটদানের হারকে 'হাইলি ইনফ্লেটেড' বলে ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি।

বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলার সময়ে তিনি জানান, "পশ্চিমবঙ্গ চিরকালই একটি 'হাই টার্নআউট' স্টেট বলে পরিচিত। কিন্তু ভোটার তালিকার ৯১ লাখ মানুষ যদি বাদই চলে যান, তবে সেই পরিমার্জিত তালিকার ভিত্তিতে সংখ্যার হিসাব হলে অঙ্কের উত্তর স্বাভাবিকভাবেই বেশি বের হবে।"

"যদিও এটা অস্বীকার করা যায় না যে অনেক মানুষ আতঙ্কের জেরে ভোট দিতে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু আগের ভোটার তালিকায় ভোট হলে সেটা দুই শতাংশের বেশি বাড়তো না," মনে করেন মি. কুরেশি।

ভারতের ইতিহাসে দেখা যায়, শাসকদলের উপর ক্ষোভ থাকলে বহু রাজ্যে ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের মনোভাব থাকলেও এটাই যে ভোটদানের হার বৃদ্ধির পেছনের মূল কারণ - এমনটা বিশ্বাস করেন না মি. কুরেশি।

পুরুলিয়া, কালিম্পং ও ঝাড়গ্রাম জেলায় এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবথেকে কম মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য দেখাচ্ছে, সেই জেলাগুলোতে ভোটদানের হারও রাজ্যের প্রথম দফায় ভোটদানের সার্বিক হারের থেকে কম। সবথেকে কম কালিম্পং জেলায়। সেখানে ভোটদানের হার ৮৩ শতাংশের সামান্য বেশি।

কলকাতায় অমিত শাহ ও মমতা ব্যানার্জীর ভিন্ন দুটি সভা

ছবির উৎস, Debajyoti Chakraborty/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় অমিত শাহ ও মমতা ব্যানার্জীর ভিন্ন দুটি সভা

ভোটদানের হারে আশাবাদী শাসক এবং বিরোধীরা

নির্বাচনের পরে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল ও বিরোধী দল বিজেপি দুই শিবিরই আশা প্রকাশ করেছে যে এই রেকর্ড পরিমাণ ভোট যাবে তাদের ঝুলিতেই। কিন্তু মুখে বলেই আশ্বস্ত হচ্ছে না কোনো পক্ষই। তৃণমূল ও বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, দুই দলই আসন ভিত্তিতে এই রেকর্ড ভোটদানের ময়নাতদন্ত করছে।

ভোটদান পর্ব শেষ হওয়ার পরে কলকাতার চৌরঙ্গীতে একটি সভা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। তার বক্তব্য, "মানুষ মনে করছেন এটা তাদের অধিকার রক্ষার লড়াই। ডিলিমিটেশন, এনআরসি প্রভৃতি বিষয়ে মানুষ ভয় পেয়েছিল।"

বৃহস্পতিবার কলকাতায় একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানে তিনি বলেন, "তৃণমূলের দুর্নীতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বহু মানুষ আমাদের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন। বহু মানুষ, যারা তৃণমূলের অত্যাচারে ভীত, তারা আমাদের প্রার্থীদের সমর্থনে আসছেন।"

রেকর্ড ভোটদান নিয়ে তিনি বলেন, "এই নির্বাচনে ভুয়া ভোটার ও অনুপ্রবেশকারীদের নাম কেটে যাওয়া, প্রশাসনের তৎপরতা ও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে বের হতে পেরেছেন।"

এই ভোট বিজেপির বাক্সেই পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।